কাজী নজরুলের কীর্তন : শ্রীচৈতন্যদেবকে কীর্তন গানের প্রবর্তক বলা হয়। যে গানের বিষয়বস্তুতে রয়েছে সনাতন ধর্ম তথা রাধাকৃষ্ণ, রামসীতা, লক্ষ্মী-নারায়ণ, চৈতন্যদেব-বিষ্ণুপ্রিয়া- রামায়ণ ও মহাভারতের বিবিধ প্রসঙ্গ। বাংলা কীর্তনের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, আমি শুধু নজরুলের কীর্তনকে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছি মাত্র। ছোটবেলা হতেই নজরুলের মধ্যে সুফি বাউল ও বিভিন্ন ধর্মের আবেশ লক্ষ করা যায়। তাই নজরুল নিজেকে অসাম্প্রদায়িক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

কাজী নজরুলের কীর্তন । নজরুলের ভাবনা
যে-কোনো ধর্মকাহিনীর সঠিক বিন্যাসের সাথে নজরুলের ছিল সম্পৃক্ততা। সনাতন ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে নজরুলের গানের সংখ্যা অনেক। যার মধ্যে রয়েছে ভজন, কীৰ্ত্তন, শ্যামা, ভক্তিগীতি, আগমনী প্রভৃতি। নজরুলের কীর্তনের সাঙ্গীতিক যে বৈশিষ্ট্য তা হলো রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক, রাধাকৃষ্ণের মিলন-বিরহের আবেগ অনুভূতিগুলি সুন্দর ছন্দবন্ধ বাণীর মাধ্যমে প্রচলিত কীর্তনের সুরেই নজরুল উপস্থাপন করেছেন।
সনাতন ধর্ম সম্পর্কে নজরুলের জানার পরিধি ছিল বেশ ব্যাপক। তাইতো গীতরচনায় রয়েছে তার স্পষ্ট প্রমাণ। নজরুলের কীর্তনের শব্দবিন্যাসে রয়েছে রাধাকৃষ্ণের কথোপকথনের প্রত্যক্ষরূপ। বাংলাকীর্তনের যে সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য তা নজরুলের কীর্তনে রয়েছে। নজরুলের কীর্তনে কৃষ্ণের চেয়ে রাধার কথা বেশি বলে অনেক নজরুল গবেষক মত প্রকাশ করেন।

কখনো অভিমানী রাধা, কখনও প্রেমীকা রাধা, আবার কখনও বা ভক্ত বাধিকা প্রচুর দর্শনে নিজেকে উজার করে দিয়েছিল’ তাইতো কবি রচনা করেছে-নবকিশলয় রাঙা শয্যাপাতিয়া, আমি কি সুখে লো গৃহে, বাজে মঞ্জিল মঞ্জুর প্রভৃতি কীর্তন। যেখানে রাধাবিরহের করুণ আর্তি বর্নিত আছে। নজরুলের কীর্তনের রাগের কোনো পরিচয় মেলেনি বটে তবে প্রায় প্রত্যেকটি কীর্তনে ফেরতা তালের প্রয়োগ রয়েছে।
ছন্দ পরিবর্তনের ফলে গানগুলো সুর বিহারে আরও পরিপূর্ণতা পেয়েছে। নজরুলের কীর্তনের গায়কী একটি মূল বিষয়, পরিপক্ক শিল্পী না হলে এ পর্যায়ের গানের মূল বিষয়টির বাহ্যিক প্রকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। অবয়ব প্রসঙ্গটি এ গানে সমস্যাযুক্ত: অনেক ক্ষেত্রে অবয়ব নির্বাচন করা কঠিক হয়ে যায়। তবুও শিল্পা লঘুসঙ্গীতের বিভাগগুলো মেনে এ গান পরিবেশন করে থাকেন।

শব্দালংকার ও অর্থাংলকার বিষয়টি খুব স্বচ্ছতা পেয়েছে নজরুলের কীর্তনে। কারণ সহজ ভাষায় নন্দনতত্ত্বের সংজ্ঞাকে চিত্রায়িত করেছেন কাজী নজরুল রাধা ও কৃষ্ণের মনের মাধুরী মেশানো সংলাপের মাধ্যমে। সুর প্রসঙ্গটির ক্ষেত্রে নিখুঁত পদচারনা রয়েছে নজরুলের। তিনি কীর্তনের বাণীর শব্দগত রূপকে সঠিক মূল্যায়ন করেছেন সুর সৃষ্টিতে। যাতে করে গানগুলো সর্বশ্রেণীর সাঙ্গীতিক জনমানষে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
বাংলাগানের বিবর্তনে চর্যাগীতি হতে এ পর্যন্ত বাংলা কীর্তন একটি অধ্যায় বটে। সেই কীর্তন গানকে আরও প্রাণ দিয়েছেন কাজী নজরুল। বাংলা কীর্তন রচনার ক্ষেত্রে যারা নাম কিনেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম কাজী নজরুল। বাংলা কথায় ফেরতা তালে মনোমুগ্ধকর পরিবেশনার জন্য কীর্তন সর্বক্ষেত্রেই শ্রবণের অনুভূতি জাগায়।
তাই সাঙ্গীতিক মূল্যবোধে নজরুলের রচিত কীর্তন বাংলাগানের একটি প্রাণবন্ত অধ্যায় হিসাবে সংযুক্ত হয়েছে। গানগুলো নজরুলসঙ্গীত বা নজরুলের কীর্তন হিসাবেই পরিবেশিত হয়।

