রাগপ্রধান গান হলো রাগাশ্রীয় কাব্যগীতি; যা কাব্যসঙ্গীতের মতো ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও গীতিময়। রাগপ্রধানের সুর মূলত এক বা একাধিক রাগের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আদলে নজরুলের গানের বৈচিত্র্য অনেক। পরিশিলিত ধারার মধ্যে রয়েছে ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, ঠুমরী, টপ্পা। কাজী নজরুল নিজে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাইতো তার রেখাপাত ঘটেছে তার রচিত সঙ্গীতে।

নজরুলের রাগপ্রধান গান । নজরুলের ভাবনা
নজরুল তাঁর গানের বৈচিত্র্য প্রশ্নে অপ্রচলিত রাগকে প্রচলিত করেছেন। গীতরচনার মাধ্যমে। নজরুলের সর্বপর্যায়ের গানে প্রায় শস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব লক্ষ করা যায়। নজরুলের রাগ প্রধান গানে শুদ্ধ, শালংক ও সংকীর্ণ রাগের ব্যবহার রয়েছে। নজরুল তার রাগপ্রধান গানগুলোর বাণী রচনা করেছেন রাগের আবেদন হিসাবে শব্দচয়ন, কাব্য সমন্বয়ের নান্দনিকতার কারণে গানগুলো বেশ প্রাণবন্ত।
বাণীর গতিপ্রকৃতি শাস্ত্রীয় নিয়মের সুর সংযোগের ফলে সুর মাধুর্য্য এবং বাহ্যিক সাঙ্গীতিক অবকাঠামো সবদিক থেকে পরিপূর্ণ। নজরুল রাগপ্রধান গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঋতুভিত্তিক পর্যায়ের রাগপ্রধান গান। এ ধরনের গানগুলোর বাণী। রচনায় নজরুল প্রকৃতিগত রূপকে নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন। কখনো খরবৈশাখের কথা, কখনো বর্ষার কথা, কখনো-বা হেমন্ত, শীত, বসন্তের সৌন্দর্যকে মোহনীয় রূপ বাংলাগানকে নতুনত্ব দিয়েছে।

পর্যায়ভিত্তিক রাগপ্রধান গান রচনায় তিনি রাগ নির্বাচন করেছেন বাণীর বাহ্যিক উপস্থাপনের দিক লক্ষ রেখে। লঘুসঙ্গীতের অবয়বের মতোই নজরুলের রাগপ্রধান গানের ৪টি বিভাগ রয়েছে। স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ। এ পর্যায়ের গানে যে-সব তালের ব্যবহার রয়েছে। তা হলো, ত্রিতাল, ঝাঁপতাল, একতাল, সুরফাঁকা, চৌতাল, দাদরা, কাহারবা, তেওড়া ইত্যাদি ।
গীতিশৈলীর ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রথমে রাগের পরিচয় হিসাবে সামান্য আলাপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে স্থায়ী পর্যায়ক্রমে বিভাগগুলো পরিবেশিত হয়। রাগপ্রধান গানে গায়কের যোগ্যতা অনুসারে অনেক ক্ষেত্রে বিস্তার ও তানের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
এখানেই নজরুলের রাগপ্রধান গানগুলো সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ যা আমাদেরকে দিয়েছে মনের মাধুরী মিশিয়ে নজরুলের সুর ও বাণী সঠিক রেখে গাইবার সুযোগ তাই নজরুলের রাগপ্রধান গান মহিয়সী ও সুরলালিত্যে অন্যতম ।
নজরুলের রাগপ্রধান গানের বৈশিষ্ট্যসমূহ
- রাগের ব্যবহার: নজরুল মূলত উত্তর ভারতীয় ক্লাসিক্যাল রাগগুলোকে ব্যবহার করেন তার গানগুলোতে।
- ছন্দ ও তাল: তিনি বিভিন্ন ছন্দ ও তাল ব্যবহার করে গানকে প্রাণবন্ত করেন, যেমন একতাল, ঝাপতাল, দাদরা ইত্যাদি।
- আলাপন ও বলনের মিশ্রণ: তার গানগুলোতে প্রায়শই রাগের আলাপনী অংশ (আলাপন) এবং বলনের অংশ সুন্দরভাবে মিশ্রিত থাকে।
- গান ও কবিতার সমন্বয়: নজরুলের গানের কথা ও সুরের মিলিত প্রভাব শ্রোতাকে আবেগময় এক অভিজ্ঞতা দেয়।
নজরুলের কিছু বিখ্যাত রাগপ্রধান গান ও তাদের রাগ
| গান শিরোনাম | রাগ | মন্তব্য |
| বিরহের নিশি কিছুতে আর চাহে না পোহাতে ওগো প্রিয় | একতাল (রাগ নির্দিষ্ট না) | নজরুল নিজেই গেয়েছিলেন, ১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘সুর-সাকী’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত। |
| মোর বউ রে খলিল আলম | কেফালি | প্রথাগত রাগ কেফালিতে রচিত, লোকগানের ছোঁয়া। |
| নূপুর পায় বাঁধি | যয় | প্রেম ও বেদনার মিশ্রণে রচিত, রাগ যয় ব্যবহৃত। |
| চল ঝুমুর ঝুমুর | দরবারি কান্দর | গভীর ভঙ্গিমার রাগ দরবারি কান্দর ব্যবহার। |
| শঙ্খবাজে আমার প্রানের গান | ভৈরব | ভৈরব রাগের গুরুগম্ভীরতা ও মর্মস্পর্শী সুর এখানে স্পষ্ট। গানটির মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও বিপ্লবী ভাব ফুটে উঠেছে। |
| মেঘের মাঝে আকাশের বুকে | কুন্মন্ডলী | কুন্মন্ডলী রাগের কোমলতা ও মাধুর্য গানটিকে এক মনোমুগ্ধকর আবহ দেয়। এটি প্রেম ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনুভূতি প্রকাশ করে। |
| হৃদয় আমার ডাকে তোকে | হামির | হামির রাগের সুরেলা ও মধুর স্বর মিশে আছে এই গানে, যা গভীর ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। |
| আজি বিকেল হেমন্ত ফাগুনের | ধ্রুপদী রাগ ম্যালাভ | এই গানটি শাস্ত্রীয় ধ্রুপদী রাগের মেলবন্ধনে রচিত, যেখানে ঋতুর সৌন্দর্য এবং মানুষের মনের সুক্ষ্ম অনুভূতি ধরা পড়েছে। |
রাগপ্রধান গানে নজরুলের অনন্যত্ব
- নজরুল শুধু রাগের সঠিক প্রয়োগ করেননি, বরং রাগের সঙ্গে বাংলা ভাষার ছন্দ এবং লোকসঙ্গীতের সরলতাও মিশিয়েছেন।
- তার গানগুলোতে বিপ্লবী চেতনাও স্পষ্ট, যা সঙ্গীতকে শুধু সুরের জাদু নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিও করেছে।
- নজরুলের রাগপ্রধান গানগুলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়ম মেনে রচিত হলেও সহজ বোধগম্য হওয়ায় সাধারণ মানুষও তা সানন্দে গ্রহণ করেছেন।

