বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার নজরুল চর্চা । নজরুলের ভাবনা

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার নজরুল চর্চাঃ ১৯১৮-২০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এই সময়টাকে নজরুলের জীবনের সর্বাপেক্ষ কর্মবহুল সময় বলা হয়। তৎকালীণ সময়ে নজরুলকে নিয়ে চলছিল খ্যাতিনিন্দার চর্চা। দেশ-বিভাজনের পরবর্তী অবস্থান থেকে পূর্বপাকিস্তান এবং পশ্চিমবঙ্গে নজরুলের রচনার বিশেষ চর্চার সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় এই উপমহাদেশের নজরুল চর্চা প্রথম থেকেই সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির সংকীর্ণতায় ক্লিষ্ট হয়েছে।

 

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার নজরুল চর্চা

 

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার নজরুল চর্চা

দেশ বিভাগের পর নবগঠিত স্বতন্ত্র ভুবনেও নজরুল এপার ওপার বাংলায় জনগণের কবি হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। উভয় সম্প্রদায়ের কবি- গীতিকার লেখক নজরুল শংকর বাঙালি জাতীয়তার প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে একটি আসনে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তাইতো তিনি জনগণের কবি, প্রেমের কবি, সামোৱ কৰি, বিদ্রোহী কবি। বিভাগোত্তর বাংলাদেশে নজরুল মুসিলম জনগণের কবি।

ইসলামী চেতনার কবি এমন ধারণার উপলব্ধিই নজরুল চর্চার প্রধান ধারা গড়ে ডোলে। নজরুল-চর্চার এই একদেশদর্শিতার বিপরীত ধারাটি ছিল দুর্বল অসংগঠিত। যে কারণে হোক, সে সময় প্রগতিবাদীদের নজরুল-চর্চায় আগ্রহ ছিল অপেক্ষাকৃত কম। নজরুলকে তাই অধিকাংশ সময় ওই রক্ষণশীল ধারাতেই আবদ্ধ থাকতে হয়েছে। কিন্তু নজরুলের প্রতিভার মূল্যায়ন প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিভিন্নভাবে করা হয়েছে এটা প্রমাণিক।

 

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার নজরুল চর্চা

 

নজরুল চর্চায় পাকিস্তানী বাংলাদেশে প্রথমদিকে কবির জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীর অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেই সঙ্গে পত্রপত্রিকায় নজরুল সম্পর্কে কিছু অগভীর আলোচনা ও প্রশস্তিবাচক কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। সে-সব রচনায় নজরুলকে ইসলামী জাগরণের অগ্রদূত হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এসময় কেউ কেউ তার রচনায় পাকিস্তান বাদিতা আবিষ্কারের উদ্ভট চেষ্টাও করেছেন। সে সময় একদল মুসলমান লেখক-সংবাদিক নজরুলকে কাফের বলেও আখ্যায়িত করেছেন। নজরুলের ব্যাতিক্রমধর্মী পদচারণার জন্য তিনি কোথাও নিন্দিত বা কোথাও আবার নন্দিত হয়েছেন। করাচী থেকে ফিরে নজরুল কলকাতায় বসবাস শুরু করেন।

তৎকালীণ সময় হতেই তিনি সাংবাদিক, শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার রূপে নিজের প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) আনুষ্ঠানিকভাবে নজরুল-চর্চার সূত্রপাত ঘটে। বিশেষ করে সঙ্গীত ও কাব্যের চর্চার একটি ধারাবাহিক শ্রোত প্রবাহিত হয় নজরুল প্রেমিকদের মধ্যে।

 

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার নজরুল চর্চা

 

বাংলাদেশে ১৯৪৭ সাল হতেই মুসলিম সম্প্রদায়ের আধিপত্য বিরাজ করতে থাকে। নজরুলের কর্মময় জীবনের শুরু হতে (১৯২০) পশ্চিম বাংলার সাহিত্য ও সঙ্গীত সামাজে নজরুলের রচনার ধারাবাহিকতা প্রভাব ফেলতে শুরু করে। নজরুলের মুক্তি, বিদ্রোহী, আনন্দময়ীর আগমন প্রভৃতি কবিতা ভারতীয় উপমহাদেশের জনমানসে বিপ্লবী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়।

বৈচিত্র্যমুখী গান রচনার জন্য সাঙ্গীতিক অবস্থানে নজরুলের সঙ্গীতময় প্রতিভাকে বাঙালির সঙ্গীত চর্চায় গুরুত্ত পায়। তৎকালীণ সময়ে প্রগতিবাদী ছাত্র-যুবক, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে যেমন নজরুলের মানবতাবাদী, সমাজবাদী, বিদ্রোহী জাতীয়বাদী পরিচয় প্রধান হয়ে ওঠেছে।

তেমনি তমদ্দুন মজলিস ও অনুরূপ ইসলামী প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত অনুষ্ঠানে নজরুল প্রধানত ইসলামী কবি ও মুসলমান জনগণের অগ্রদূত হিসাবে পরিবেশিত হয়েছে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শুভ বুদ্ধি সংস্কারমুক্ত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নজরুলের পুনর্মূল্যায়নকর্মে নিযুক্ত আছেন।

 

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার নজরুল চর্চা

 

এ ছাড়া বাংলাদেশে নজরুল নামে একটি গবেষনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ন্ত্রিত। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশের নজরুলের প্রতিভার মূল্যায়ন করা হচ্ছে নানাভাবে। পশ্চিমবঙ্গেও নজরুল-চর্চায় ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে।

সুতরাং “নজরুল ইনস্টিটিউট” এ পর্যায়ে নজরুল সম্পর্কে যে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তার ধারা নজরুল সম্পর্কিত ব্যক্তিগত গবেষণা এখানে প্রতিষ্ঠানিক উদ্দিপনা লক্ষ করে নজরানা চর্চাকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক মাত্রা দিতে সমর্থ হয়েছে।

 

google news logo

 

বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের বর্তমান প্রবাহিত নজরুল চর্চার শ্রোতধারা অপরিবর্তিত থাকলে আমরা নজরুলের রচনাকে আরো সুন্দর ও সার্থক রূপ দিতে পারবো তেমনটি আশা করা যায়।

Leave a Comment