কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব ছিল দারিদ্র্য, অভাব–অনটন এবং সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠোর বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। পরিবারের আর্থিক সংকট, পিতার অকালমৃত্যু এবং বিদ্যালয়ের নিয়ম–কানুনের প্রতি তাঁর স্বভাবজাত অস্থিরতা মিলিয়ে খুব অল্প বয়সেই তিনি জীবনজীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হন। নজরুল কখনোই শ্রমকে হীন কাজ হিসেবে দেখতেন না; বরং তাঁর মানবিকতা ও আত্মসম্মান তাঁকে শিক্ষা দিয়েছিল—সৎ পরিশ্রমই জীবনের প্রকৃত সম্মান। এ কারণেই তিনি কিশোর বয়সেই বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন—মসজিদের কাজ, লেটো দলে গান–নাটক, গ্রাম্য চাকরি, এমনকি শ্রমজীবী মানুষের মতো সাধারণ কাজও।

নজরুল কোথায় এবং কখন, কার রুটির দোকানে চাকরি করেন
এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১২ সালের একটি ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি হঠাৎ করে দরিরামপুর স্কুল থেকে উধাও হন। নিয়ম–শৃঙ্খলার বদ্ধ পরিবেশ তাঁর স্বাধীনচেতা স্বভাবের সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না। কিন্তু স্কুল ছাড়ার পর তাঁর সামনে উপস্থিত হয় কঠিন বাস্তবতা—কোথায় যাবেন? কি খাবেন? কীভাবে চলবেন? শৈশবের এই অনিশ্চয়তা তাঁকে ঠেলে দেয় শ্রমিকজীবনে। আর্থিক অনটনের কারণে তিনি আসানসোল স্টেশনের কাছাকাছি মোহাম্মদ এম. এ. বখশ নামক এক ব্যক্তির রুটির দোকানে চাকরি নেন। মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৫ টাকা, যা সে সময়েও খুবই সামান্য।

এই রুটির দোকানই নজরুলের জীবনে এক 새로운 অধ্যায়ের সূচনা করে। দিনভর রুটি তৈরির কাজ, শ্রমের ক্লান্তি, দোকানের ধুলো–বালি—সবকিছুর মধ্যেও নজরুল কখনো তাঁর সৃজনশীলতার চর্চা বন্ধ করেননি। রুটি গড়ার ফাঁকে ফাঁকেই তিনি মাথায় ছড়ানো–ছিটানো সুরগুলোকে শব্দে সাজাতেন, লিখতেন কবিতা, গজল, হামদ–নাত ও গান। দোকানে আসা–যাওয়া বই, পুথি ও বিভিন্ন পত্রিকা পড়তেন গভীর মনোযোগ নিয়ে। তাঁর জ্ঞানপিপাসা এত তীব্র ছিল যে শ্রমের কষ্ট তাঁর শিক্ষালাভের আগ্রহে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। পরবর্তীতে কবিতা, সংগীত ও সাহিত্যচর্চায় যে বিস্ময়কর প্রজ্ঞা নজরুল প্রদর্শন করেছিলেন, তার প্রাথমিক বীজ রোপিত হয় এই শ্রমজীবী সময়টিতেই।
রুটির দোকানের এই অভিজ্ঞতা নজরুলকে একদিকে যেমন জীবনসংগ্রামের কঠিন পাঠ শিখিয়েছে, অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাকে আরও গভীর করেছে। সমাজের অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর যে আকর্ষণ ও মমতা ছিল, তার ভিত্তি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায়। পরবর্তীতে তাঁর কবিতা ও গানে যে মানবমুক্তি, শ্রমিক অধিকার, সাম্যবাদ এবং বিদ্রোহের ধ্বনি উচ্চারিত হয়—এই শ্রমঘাম–মাখা কিশোর সময় সেসব চিন্তারই ভিত্তিস্থান।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নজরুল ১৯১২ সালে আসানসোল স্টেশনের কাছে এম. এ. বখশের রুটির দোকানে কাজ করেছিলেন, এবং এই দোকানই তাঁর সৃজনশীলতার প্রথম পাঠশালা, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার উৎস এবং বিদ্রোহী মানসগঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ভবিষ্যৎ সাহিত্যিক জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে অমূল্য উপাদানে—যা তাঁকে শেষ পর্যন্ত করে তুলেছে বাংলা ভাষার “বিদ্রোহী কবি”।
