কাজী নজরুলের ভাইবোনদের পরিচয়

বাংলা সাহিত্য–সংগীতের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য বহুমাত্রিক প্রতিভা, যিনি মাত্র ২৩ বছরের সক্রিয় সাহিত্যজীবনে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক ও সঙ্গীত–সৃষ্টি দিয়ে সমগ্র বাংলা জাতিকে আন্দোলিত করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অসামান্য প্রতিভার পিছনে ছিল অত্যন্ত সাধারণ, সংগ্রামী এবং দারিদ্র্যপীড়িত একটি পারিবারিক জীবন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে, যেখানে ছিল না ধন–সম্পদের প্রাচুর্য, বরং ছিল জীবনযুদ্ধের প্রতিদিনের কঠিন প্রয়াস। তাঁর পরিবার ছিল ঐতিহ্যবাহী কাজী বংশের হলেও অর্থনৈতিকভাবে ছিল একেবারেই সীমিত। তাই নজরুলের পরিবার–পরিচয় তাঁর জীবনের পরবর্তী বিদ্রোহী চরিত্র, মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংগ্রামী মানসের উৎস হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

 

কাজী নজরুলের ভাইবোনদের পরিচয়

 

কাজী নজরুলের ভাইবোনদের পরিচয়

নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদ দুটি বিবাহ করেছিলেন। ঐ দুই স্ত্রীর গর্ভে মোট জন্মগ্রহণ করেন নয় সন্তান—যার মধ্যে সাতজন পুত্র এবং দুইজন কন্যা। এই বৃহৎ পরিবারে নজরুল ছিলেন ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান। পরিবারটির আর্থিক অবস্থার দুর্বলতা, বাবার ধর্মীয় দায়িত্ব, মসজিদ–মাজার কেন্দ্রিক জীবনযাপন—সবকিছু মিলিয়ে নজরুলের বেড়ে ওঠার পরিবেশ ছিল গ্রামবাংলার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

ভাইবোনদের মধ্যে নজরুলের সহোদর ছিলেন তিন ভাই ও এক বোন। তাঁদের পরিচয় নিম্নরূপ—

  • জ্যেষ্ঠ ভাই: কাজী সাহেব জান—যিনি পরিবারের দায়িত্ব বহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

  • কনিষ্ঠ ভাই: কাজী আলী হোসেন—যিনি নজরুলের প্রতি গভীর স্নেহ–মমতায় আবদ্ধ ছিলেন।

  • বোন: উম্মে কুলসুম—পরিবারের কনিষ্ঠ কন্যা, যিনি নজরুলের শৈশব ও কৈশোরে মায়ের মতো স্নেহ দিয়েছিলেন।

নজরুলের ডাক নাম ছিল “দুখু মিয়া”, যার মধ্যে যেন পূর্বাভাস ছিল তাঁর জীবনের সংগ্রাম, দুঃখ ও অদম্য লড়াইয়ের। পারিবারিক দারিদ্র্য তাঁকে ছোটবেলাতেই পরিণত করেছিল বাস্তববাদী ও দায়িত্বশীল। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই জীবিকার তাগিদে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে, আর মাত্র ১৮ বছর বয়সে—১৯১৭ সালে—তিনি যোগ দেন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। সেনাজীবন তাঁর মানসগঠনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল; শৃঙ্খলা, সামরিক সাহস, দেশ–সময়–রাজনীতি সম্পর্কে সচেতনতা—সবকিছুই গড়ে ওঠে সেখানেই।

একদিকে মুসলিম পরিবারের সন্তান হয়ে মসজিদ–মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষায় দীক্ষিত হওয়া, অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বহুধর্ম–বহুসংস্কৃতি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া—এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা নজরুলকে পরিণত করে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী কবিতে। তাই তাঁর সাহিত্য ও সঙ্গীতে আমরা একাধারে পাই ইসলামি ভাব, হিন্দু পুরাণ, বৈষ্ণব ভক্তি, বেদিক দর্শন এবং সাম্য–বিপ্লবের অগ্নিবাণী।

১৯২২ সালে তাঁর “বিদ্রোহী” কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি হয়ে ওঠেন সমগ্র ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহের প্রতীক। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে কারাবন্দী করে—যা তাঁর বৈপ্লবিক কবিসত্তাকে আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করে।

তাঁর ভাইবোনরা ছোটবেলায় যেমন তাঁর সঙ্গে দুঃখ–কষ্ট ভাগ করেছেন, তেমনি পরবর্তী জীবনে তাঁর প্রতিভার বিকাশেও তাঁরা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন। পরিবারের ধর্মীয় আবহ, ভাইবোনদের স্নেহ, যৌথ পরিবারের আন্তরিকতা ও সংঘাত—সবকিছুই নজরুলকে জন্ম দিয়েছে গভীর সংবেদনশীলতা, মানবপ্রেম এবং লড়াকু মানসিকতা, যা তাঁর সাহিত্যজীবনের মূল চালিকাশক্তি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের ভাইবোনদের পরিচয় শুধু পারিবারিক তথ্য নয়—বরং তাঁর ব্যক্তিত্ব, জীবনের সংগ্রাম ও সাহিত্য–চেতনার বিবর্তন বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাঁর পরিবারই ছিল সেই প্রথম বিদ্যালয়, যেখানে তিনি শিখেছিলেন ভালোবাসা, দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার পাঠ—যা তাঁকে পরিণত করেছিল বাংলা ভাষার বিদ্রোহী কবি, মানুষের কবি, জাতির আত্মার কবিতে।

Leave a Comment