কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন শুধু একজন কবি নন, বরং তিনি ছিলেন পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা এক অগ্নিকবি। তাঁর লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার পথে উদ্বুদ্ধ করা। সে সময় বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত দমবন্ধ—ব্রিটিশ সরকার জাতীয়তাবাদী প্রচারমাধ্যম, রাজনৈতিক সভা, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সবকিছুকে কঠোরভাবে দমন করছিল। এমন পরিস্থিতিতে নজরুল তাঁর কলমকে বেছে নেন বিপ্লবের অস্ত্র হিসেবে। তাঁর লেখা কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, সম্পাদকীয়—সবকিছুই বহন করত স্বাধীনতার আগুন, সাম্যবাদী চেতনা, শাসকের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ।

কবি নজরুলকে কেন কারাবরণ করতে হয়েছিল
নজরুল যখন ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখনই তাঁর লেখনী নতুন মাত্রায় বিস্ফোরিত হয়। ধূমকেতু ছিল এক অর্থে যুবসমাজের কণ্ঠস্বর—দাসত্বের বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ। ১৯২২ সালের পূজা সংখ্যায় তিনি প্রকাশ করেন ঐতিহাসিক কবিতা “আনন্দময়ীর আগমনে”, যেখানে মাতৃভূমিকে আনন্দময়ী দেবীরূপে কল্পনা করে তিনি আহ্বান জানান—অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে অসুরবধের মতো এক নবরূপী শক্তির উদ্ভব হোক। কবিতাটিতে ছিল স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিবাদ, ক্রান্তিকালীন বিদ্রোহ এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির ডাক।

স্বাভাবিকভাবেই ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ কবিতাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ঘোষণা করে। ধূমকেতুর সেই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালত তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। তাঁর এই শাস্তি ছিল নিছক কবিস্বাধীনতার ওপর আঘাতই নয়—এটি ছিল স্বাধীনতার স্বপ্নদর্শী এক শিল্পীর প্রতি উপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিশোধ।
কারাবাসও নজরুলের বিপ্লবী চেতনা কমাতে পারেনি; বরং আরও শক্তিশালী করেছে। প্রথমে তাঁকে আলীপুর জেলে রাখা হয়, পরে স্থানান্তরিত করা হয় হুগলি জেলে, যেখানে কারারক্ষীদের অমানবিক আচরণ তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। এর প্রতিবাদেই তিনি শুরু করেন ঐতিহাসিক ৩৯ দিনের অনশন, যা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক নজির। তাঁর এই অনশনের খবরে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সাংবাদিক, লেখক, কবি, বিপ্লবী সংগঠন, সাধারণ মানুষ—সবাই আওয়াজ তোলে নজরুলের মুক্তির জন্য। তিনি হয়ে ওঠেন এক জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীক।
এ সময়ই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে সমসাময়িক সাহিত্য–জগতে বিশেষভাবে সম্মানিত করে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি তাঁকে উৎসর্গ করেন, যা নজরুলকে আপ্লুত করে। এই অনুপ্রেরণায় তিনি জেলখানায় বসেই রচনা করেন বিখ্যাত কবিতা “আজ সৃষ্টি–সুখের উল্লাসে”, যেখানে কবিসত্তা, সৃষ্টিশক্তি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে তৈরি করে এক অবিনাশী শিল্পবিচ্ছুরণ।
নজরুলের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের এই দমননীতি তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন প্রকৃত অর্থে বিদ্রোহী কবি, অত্যাচারবিরোধী সত্য–কথনের প্রতীক। তাঁর কারাবরণ কেবল ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ছিল না; এটি ছিল উপমহাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে এক গৌরবময় অধ্যায়। ভারতবাসী তাঁকে বরণমালা দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিল কারণ তারা অনুভব করেছিল—নজরুল তাঁদের আত্মমুক্তির পথ দেখানোর জন্যই কলম ধরেছিলেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নজরুলকে কারাবরণ করতে হয়েছিল তাঁর সাহসী কলমের কারণেই—যে কলম ভারতবর্ষের মুক্তির বার্তা বহন করছিল, উপনিবেশিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে বজ্রধ্বনি তুলছিল এবং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য অগ্নিবাণীর মতো ছুটে যাচ্ছিল। তাঁর কারাজীবন তাই এক বিদ্রোহী শিল্পীর অমর ত্যাগ ও সংগ্রামের প্রতীক, যা আজও স্বাধীনতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
