কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে ৪৯ বাঙালি রেজিমেন্টে যোগদান ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা তাঁর ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য ও সঙ্গীতচেতনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বাল্যজীবন থেকেই দারিদ্র্য, অনটন ও সংসারের দায়ভার তাঁকে বারবার বিচিত্র জীবিকায় যুক্ত করেছে। কখনো মক্তবে শিক্ষকতা, কখনো মুয়াজ্জিনের কাজ, কখনো রুটির দোকানের কর্মচারী। এসবের মাঝেই তাঁর প্রতিভার প্রতি আস্থা রাখেন আসানসোল থানার দারোগা রফিজউল্লাহ, যিনি নজরুলের রচিত ছড়া, কবিতা ও সুরময় উচ্চারণ লক্ষ্য করে তাঁকে দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি করান। এরপর সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের বিকাশ ঘটে, যেখানে তিনি সাহিত্য, সংগীত, ফার্সি ভাষা ও বিপ্লবী চেতনার শিক্ষায় চারজন শিক্ষক—সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, নিবারণচন্দ্র ঘটক, হাফিজ নুরুন্নবী এবং নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শে গভীরভাবে প্রভাবিত হন।

নজরুলের ৪৯ বাঙালি রেজিমেন্টে যোগদান
তবে শৈশব ও কৈশোরে দারিদ্র্যের তীব্র অভিজ্ঞতা, স্বাধীনমনা স্বভাব এবং অস্থির জীবনের হাতছানি তাঁকে বিদ্রোহী করে তোলে। ১৯১৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার আগেই নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। এটি তাঁর জীবনের একটি সাহসী ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপ হলেও—এটি নজরুলকে এনে দেয় নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন শিক্ষা এবং বিশাল বিশ্বের স্পর্শ। তিনি যোগ দেন ৪৯ বাঙালি রেজিমেন্টে, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ–উত্তর ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে তাঁর প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়, পরে তাঁকে সীমান্ত প্রদেশের নওশেরা অঞ্চলে পাঠানো হয়, যেখানে কঠোর সামরিক পরিবেশ, যুদ্ধের প্রস্তুতি, সেনানিবাসের জীবন ও নানা জাতির মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।

সেনাবাহিনীতে যোগদানের সময় তাঁর পদবী ছিল সাধারণ সৈনিক, কিন্তু তাঁর যোগ্যতা, শৃঙ্খলাবোধ ও নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতি হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কর্পোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। সেনাজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে দিয়েছে সামরিক সংগঠন, শৃঙ্খলা, অভিযানচেতনা, মার্চের ছন্দ, কুচকাওয়াজের তাল—যা তাঁর সংগীতধারায় গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে তাঁর বহু গান—বিশেষ করে দেশাত্মবোধক, মার্চ, করাচ, উদ্দীপনামূলক গানগুলো—এই সামরিক ছন্দ ও তেজস্বিতা বহন করে।
করাচি সেনানিবাসে অবস্থানকালে নজরুল শুধু সৈনিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন চিন্তাশীল, সৃজনশীল, পর্যবেক্ষণশীল এক শিল্পী। সেনানিবাসের লাইব্রেরি, বুলেটিন, মুসলিম সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি ও ভাষা নিয়ে আলোচনা তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারকে প্রসারিত করে। এখানেই তিনি আরবি–ফার্সি ভাষায় গভীর আগ্রহী হন, সুর ও সংগীত নিয়ে রাগভিত্তিক গবেষণা শুরু করেন এবং বহু কবিতা রচনা করেন, যার ভেতর লুকিয়ে থাকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, সাম্যবাদী চেতনাবোধ, মানবিক ঐক্যের ডাক।
তিনি সেনাবাহিনীতে প্রায় আড়াই বছর (১৯১৭–১৯২০) কর্মরত ছিলেন। এই সময়ে তাঁর অন্তরমহলে জন্ম নেয় ভবিষ্যৎ বিদ্রোহী কবি, ভবিষ্যৎ সঙ্গীত–স্রষ্টা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, সামরিক মানসিকতা, যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজের চিত্র—সব মিলিয়ে তাঁর সৃষ্টিতে পরবর্তীকালে আমরা দেখতে পাই অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্রোধ, মানুষের মুক্তির প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং বারবার পুনরাবৃত্তি হওয়া সংগ্রামের সুর।
৪৯ বাঙালি রেজিমেন্টে যোগদান তাই নজরুলের জীবনের এক অনিবার্য অধ্যায়—যেখানে দারিদ্র্যের কিশোর দুখুমিয়া রূপান্তরিত হন পরিণত, সাহসী ও মুক্তচিন্তার নজরুলে। যুদ্ধ–অভিজ্ঞতার আগুনে তাপিত এই তরুণই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন উপমহাদেশের বিজলি–সম বিদ্রোহী কবি, যার কলম বন্দিশালার শৃঙ্খল ভেঙে ছুটে যায় মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে।
