নজরুলের পুত্র বুলবুলের মৃত্যু । নজরুলের ভাবনা

নজরুলের পুত্র বুলবুলের মৃত্যু: বর্তমানে সব জটিল রোগ কোনো-না-কোনোভাবে নিরাময়ের চেষ্টা চলছে। তৎকালীণ সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত উন্নতরূপ ছিল না। ফলে ১৯৩০ সালের ৭ মে কোলকাতার মসজিদবাড়ি স্ট্রীটে থাকাকালীন সময়ে নজরুলের ২য় পুত্র বুলবুল বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরুলের জীবনে নেমে আসে দুঃখসংযোজিত অধ্যায় যা কেটে উঠতে হয়তো নজরুল সারা জীবনেও পারেনি।

 

নজরুলের পুত্র বুলবুলের মৃত্যু

 

নজরুলের পুত্র বুলবুলের মৃত্যু

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ২য় পুত্র ছিলেন বুলবুল। তিনিও ছিলেন অসামান্য মেধাবী। সবাই তাকে কবি নজরুলের যোগ্য উত্তরসূরি ভাবতেন। কবি তাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। ছোটকালে কবি নজরুল তার পুত্রকে একটি গজল শিখিয়ে দিয়েছিলেন। বুলবুল সেই গজলটি কচি কণ্ঠে অত্যন্ত সুমধুর সুরে বলতেন। পুত্রের কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে যেতেন তিনি।

কিন্তু কবির এই পরম প্রিয় পুত্র মাত্র সাড়ে চার বছর বয়সে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর থেকেই কবি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হতে শুরু করেন।

যে মানুষটি বন্ধুদের আড্ডা মাতিয়ে রাখতো, সদা চঞ্চল সেই মানুষটি একদম বিমর্ষ হয়ে পরেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত তার বিমর্ষতা কাটে নি। এতটাই পুত্রশোকে বিহ্বল ছিলেন তিনি।

 

নজরুলের পুত্র বুলবুলের মৃত্যু

 

কবির পরম প্রিয় সেই পুত্র বুলবুল কে নিয়ে নজরুলের একটি খুবই বেদনাময় কাহিনি আছে তা হল

“পঞ্চানন ঘোষাল তখন কলকাতার তরুণ পুলিশ অফিসার। কাজী নজরুলকে তিনি ভালোবাসেন এবং মাঝে মাঝে তার সাথে গল্প করেন। একবার কবির বাসায় তল্লাশীর হুকুম এল উপর থেকে। এ বেচারাকে দায়িত্ব দেয়া হল সে দলে থাকার। গোয়েন্দারা তাকে নিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল কবির ঘরের।

কাজী নজরুল দরজা খুলে দিলেন এবং সঙ্গত কারণে এই তরুণ অফিসার এবং কবি দুজনই পরস্পরকে না চেনার ভান করে রইলেন। গোয়েন্দা পুলিশের দল কবির ঘরে সবকিছু তছনছ করে তল্লাশী চালাচ্ছে, কবিও তাদেরকে যথাসম্ভব বাক্স খুলে খূলে দেখাচ্ছেন।

 

নজরুলের পুত্র বুলবুলের মৃত্যু

 

হঠাৎ ঘরের কোনে পরম যত্ন উঠিয়ে রাখা একটি বাক্সে নজর পড়ল তাদের। তারা সেটি খুলে দেখতে চাইল। কবি অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বলে উঠলেন, না না, ওটাতে হাত দিবেন না যেন।

কবির বিচলিত মুখভঙ্গি দেখে পুলিশদের সন্দেহ তীব্র হল। তাদের একজন সজোরে সেটি খুলতেই সেই বাক্সটি থেকে ঝরে পড়ল কিছূ খেলনা আর ছোট ছোট জামা কাপড়সহ বাচ্চাদের অন্যান্য সামগ্রী।

এভাবে সেগুলো আছড়ে মাটিতে পড়তে দেখে কবির দু চোখ পানিতে ভরে গেল। ঝরঝর করে তিনি কেঁদে দিলেন সবার সামনে। এমন সুকঠিন মুখখানা তার ব্যাথায় ও দুঃখে কালো হয়ে এল।

 

google news logo

 

এ খেলনা ও ব্যবহার্য সামগ্রীগুলো ছিল কবির আদরের সন্তান এই ছোট বুলবুলের। তার মৃত্যুর পর এসব বুকে জড়িয়ে কবি স্বান্ত্বণা খুঁজে পেতেন, আদর আর চুমো পৌঁছে দিতেন বুলবুলের গালে।

এ অফিসার তার এক লেখায় নিজেকে অত্যন্ত ব্যর্থ ও লজ্জিত উল্লেখ করে লিখেছেন, এরপর কত মানুষের কত ঘর সার্চ করেছি, কিন্তু সেদিনের মতো এমন কষ্ট আর কোথাও পাইনি।

Leave a Comment