নজরুলের ইসলামী গান নজরুলসঙ্গীত রচনার অন্যতম অধ্যায়। ইসলাম ধর্মের বিষয়বস্তু মানবদর্শন এই গানের মূল উপাখ্যান। বৈচিত্র্য-ভৈববে নজরুলের ইসলামী গান ধর্মীয় অনুশাসনে বাঁধা।

নজরুলের ইসলামী গান রচনার প্রেক্ষাপট ও উৎস
নিয়মতান্ত্রিক সাঙ্গীতিক বিচারে লঘু সঙ্গীতের একটি পর্যায় হিসেবে নজরুলের ইসলামিক গান সতন্ত্র ধারায় প্রতিষ্ঠিত। আমরা এর বিষয়বস্তু ও দর্শনতত্ত্ব পর্যালোচনার মাধ্যমে নজরুলের ইসলামি গানগুলোর প্রেক্ষাপট, উৎস, সুরের আঙ্গিক বৈচিত্র্য, বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাব ।
ইসলামিক গান
ইসলাম ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে রচিত গানকে ইসলামিক গান বলে ।
ইসলামী গান রচনার প্রেক্ষাপট :
শৈশব থেকেই নজরুল সুফী, বাউল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মন্দির, মসজিদ, পুঁথি পাঁচালি প্রভৃতির আবেশপুষ্ট ছিলেন। ইসলামি পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে ধর্মীয় রীতি- নীতি অনুযায়ী এবং বিষয়ভিত্তিক অনেক ইসলামি গান তিনি রচনা করেছিলেন। ১৯২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে নজরুল একনিষ্ঠভাবে ইসলামী গান রচনা শুরু করেন ।

সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপট :
১৯০৫ সালের পর থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা প্রকট আকার ধারণ করে। বালক নজরুল তখন থেকেই অসাম্প্রাদিয়কতা প্রসঙ্গ নিয়ে নিজেকে তৈরি করেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনায় গান, কাব্য রচনা নজরুলের মধ্যে সুপ্ত অবস্থান বিরাজ ছিল।
এজন্য তিনি রচনা করেছেন ইসলামিক চেতনায় বিভিন্ন গান এবং কাব্য। মুসলিম বিশ্ব নজরুলকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ভারতীয় হিন্দুশাস্ত্র অনুসারী অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তি নজরুলের ইসলামী চেতনাকে স্বীকৃতি দেননি। তার রচিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান, নারী জাগরণের গান, মুসলিম জাতির মুক্তির গান ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলাম ধর্মকে তথা ইসলামের বিষয়বস্তুকে একটি সঠিক ধারায় বর্ণনা করেছিলেন। যে বর্ণনায় ইসলাম ও অসাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া ছিল।
সনাতন ধর্মের প্রভাব
বৈদিক যুগ থেকেই হিন্দুধর্মীয় বিষয়ভিত্তিক সঙ্গীত আজো প্রচলিত। কালের বিবর্তনে এটি ব্যাপকতা পেয়েছে। নজরুল গান রচনা করার শুরু থেকেই হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের বিষয়ভিত্তিক গান রচনার অভিমত পোষণ করেন। যেহেতু ধর্মীয় রীতিনীতিতে গান রচনা করা সম্ভব তাই তিনি রচনা করেছিলেন ইসলাম ধর্মের বৈচিত্রতায় ইসলামিক সঙ্গীত।

বিভিন্ন দেশের প্রভাব
নজরুলের ইসলামী গান রচনার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের প্রচলিত ইসলামী ধারাও নজরুলকে প্রভাবিত করেছিল। করাচীতে অবস্থানকালে তিনি শুধু নিজের সৈনিক দায়িত্ব ছাড়াও ইসলামী গান রচনার ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রাখেন। যার প্রকাশ ঘটেছে তার রচিত ইসলামী গানে।
নজরুল রচিত ইসলামী গানের সংখ্যা :
গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ অনুসারে দেখা যায় নজরুল ২০০টির মতো ইসলামী গান রচনা করেছেন। যার মধ্যে ইসলাম ধর্মের সকল বিষয়ই বিদ্যমান। এই সংখ্যা নিয়েও মতভেদ বিদ্যামান।
গ্রামোফোনে যোগদান ও বুলবুলের মৃত্যু :
গ্রামোফোন কোম্পানিতে যোগদান ও তার প্রিয় পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পর ইসলাম ধর্ম বিষয়ক বেশ কাব্য, সঙ্গীত ও প্রবন্ধ রচনা করেন।
রাগের ব্যবহার :
ইসলামী গানের বৈচিত্র্য এবং নজরুলসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য রক্ষার জন্যে নজরুল ইসলামী গানেও রাগের ব্যবহার করেছেন।
যেমন: “বক্ষে আমার কাবার ছবি” রাগ সিন্ধু রাগেশ্রী, তাল : কাহারবা ।
কাওয়ালী ও গজলের প্রভাব :
বাংলা গজল প্রবর্তনে কাজী নজরুলের নাম অবিস্মরনীয়। গজলের আঙ্গিক এবং কাওয়ালী গীতরীতিকে তিনি ইসলামিক গানে ব্যবহার করে আধুনিকতায় পরিণত করেছেন। যেমন: “এ কোন মধুর শারাব দিলে ”

লোকসঙ্গীত প্রভাবিত ইসলামী গান
ইসলাম ধর্মের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্যকে তরান্বিত করতে গিয়ে নজরুল লোকসঙ্গীতের সুর ও বাণীকেও ইসলামী গানে সংযুক্ত করেছেন। যা অন্তত সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছানো যায়। যেমন “ও দরিয়ার মাঝি”।
তালের ব্যবহার :
ভাল হিসেবে দাদরা, কাহারবা ও ঝাঁপতালের প্রচলনই সর্বাধিক।
শেয়র প্রসঙ্গ :
নজরুলের ইসলামী গান ভালে নিবন্ধ হলেও অনেক গানে শেষরের ব্যবহার প্রচলিত। শেষর থাকবার কারণে বাণীর বাহ্যিক প্রকাশ সঠিকভাবে বোঝা যায় বলে নজরুল নিজে তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
গায়ন পদ্ধতি :
নজরুলের ইসলামী গান তাঁর রচিত অন্যান্য লঘু সঙ্গীত প্রকৃতির। গানের অবস্থান হিসেবে পরিশেনায় কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী আভোগ মিশ্রণে এ পর্যায়ের গান পরিবেশিত হয়। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে শেষরের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
উপসংহার :
বাংলা গানের ইতিহাসে নজরুলের ইসলামী গানগুলি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। সুর, বৈচিত্র্য ও জনপ্রিয়তা এই তিনের ক্ষেত্রেই তার স্থান অতি উচ্চে। বিশেষ করে নজরুলের ইসলামী গানগুলি অতুলনীয়, অপ্রতিদন্দি এবং অক্ষয়। যা যুগে যুগে মুসলিম জাতির ভিত্তিমূল গঠন করতে চির সহায়ক হবে।

