কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি লোকসঙ্গীত পর্যায়ের গানের অবয়ব বিশ্লেষন : নজরুলগীতি বা নজরুল সঙ্গীত বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান কবি ও সংগীতজ্ঞ কাজী নজরুল ইসলাম লিখিত গান। তার সীমিত কর্মজীবনে তিনি ৩০০০-এরও বেশি গান রচনা করেছেন। এসকল গানের বড় একটি অংশ তারই সুরারোপিত। তার রচিত চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্বগগণে বাজে মাদল বাংলাদেশের রণসংগীত।

কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি লোকসঙ্গীত পর্যায়ের গানের অবয়ব বিশ্লেষন
নিম্নে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত গানের অবয়ব বিশ্লেষণ করা হলো।
“নিশি পবন নিশি পবন ফুলের দেশে যাও”
গ্রন্থঃ ২য় খণ্ড
স্বরলিপি: নজরুল স্বরলিপি ১ম খণ্ড
প্রকাশকাল জুন, ১৯৩৮
রেকর্ড নাম্বার – এন ১৭০৯৯
শিল্পী-মৃণাল কান্তি ঘোষ
সুরকার: গীরিণ চক্রবর্তী
তাল: দ্রুত দাদরা
পর্যায়: লোকসঙ্গীত
স্থায়ী
নিশিপবন, নিশি পবন ফুলের দেশে যাও
ফুলের বনে ঘুমায় কন্যা, তাহারে জাগাও
যাও, যাও, যা, (1)
এখানে কবির কাল্পনিক মনের কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি নিশি পবনকে ফুলের দেশে যাওয়ার কথা বলেছেন। কারণ ফুলের দেশে কবির কাল্পনিক কন্যা ঘুমিয়ে আছে তাকে জাগাবার জন্য তিনি নিশি পবনকে যেতে বলেছেন।

অন্তরা
মৌটুস টুস মুখখানি তার,
ঢেউ খেলানো চুল
ভোমরার ঝাঁক ঘেরা যেন, ভোরের পদ্মফুল
হাসিতে তার মাঠের সরল
বাঁশির আভাস পাও,
যাও, যাও, যাও (।।)
এখানে কবি তাঁর কাল্পনিক প্রিয়ার রূপের বর্ণনা করেছেন। মৌ অর্থ মধু। প্রিয়ার মুখ যেন মধু মাখা এবং তার কেশ ঢেউ খেলানো দেখলে মনে হয় ভোমরার দল ঝাঁক ধরে পদ্ম ফুলের মতো রূপ নিয়েছে। কবির প্রিয়ার হাসি এত সরল যে হাসলে মনে হয় মধুর সুরে বাঁশি বেজে উঠছে।
সঞ্চারী
চাঁপা ফুলের পুতলি ঘেরা,
চাপা রঙের শাড়ি
তারেই দেখতে আকাশ গাঙ্গে চাঁদ দেয়রে পাড়ি
তার একটু খালি চোখের আদল
বাদল মেঘে পাও ।
কবির প্রেয়সীর গায়ে চাপা রঙের শাড়ি পরিধেয়। তাঁর প্রেয়সীর রূপ এতই সুন্দর যে তাকে দেখতে আকাশ গাঙে চাঁদ পাড়ি জমায়। তার প্রিয়ার চোখ মায়ায় ভরপুর। দেখলে মনে হয় যেন চোখের আদল বাদল মেঘের সাথে মিশে গেছে এবং এক অপূর্ব মায়ার সৃষ্টি করছে।

আভোগ
ধীরে ধীরে জাগাইত তার
ঝরা কুসুম ফেলিয়া গায়
জাগলে কন্যা যেন রে মোর
পত্রখানি দাও ।
যাও, যাও, যাও (1)
কবি তাঁর প্রিয়াকে ধীরে ধীরে জাগাতে নিশি পবনকে বলেছেন, এবং তাঁর প্রিয়া এত কোমল যে তার গায়ে যেন ঝরা কুসুম ফেলে জাগানো হয় এবং যখন তার প্রিয়া নিদ্রা থেকে জাগবে তখন কবির হৃদয়ের ব্যক্ত সকল কথায় লিপিবদ্ধ পত্রটা যেন নিশিপবন ঘুমন্ত কন্যাকে জাগিয়ে দেয় সেই অনুরোধই করেছেন। এবং নিশি পবনকে বারবার যাবার অনুরোধ করেছেন।
উপসংহার:
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, কবি তাঁর এই লোকসঙ্গীত অঙ্গের গানেও চমৎকারভাবে তাঁর মনভাব উপস্থাপন করেছেন। এবং তাঁর গানের ভাণ্ডারকে এক অপূর্ব রূপে মহিমান্বিত করেছেন তাঁর রচনার মাধ্যমে।


