শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারায় নজরুল সঙ্গীতের অবস্থান : শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে নজরুল সঙ্গীতের অবস্থান সার্বিকভাবে পরিপূর্ণ। নজরুলের ধ্রুপদ, ধামার, ঠুমরী, টপ্পা, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারাকে পরিপূর্ণ করেছে। এ সকল পর্যায়ের গানের গীতি শৈলী, বাণীগত অবস্থান, তাল বিভাজন সর্বক্ষেত্রে একটি নান্দনিক অবস্থান লক্ষ্যণীয়, যা সঠিক আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করা সম্ভব।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারায় নজরুল সঙ্গীতের অবস্থান
মন্তব্য:
(১) নজরুলের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পর্যালোচনা এবং দক্ষতার স্বরূপ প্রকাশ করতে গিয়ে ব্রহ্মমোহন ঠাকুর বলেছেন “বিভিন্ন কবির বিভিন্ন ধারার গান দর্শককে শ্রুতিমধুর অবস্থান উপহার দিয়েছে, কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অবস্থান একমাত্র নজরুলসঙ্গীতেই বিন্যাসিত । ”
রাগপ্রধান বাংলা গান; ব্রহ্মমোহন ঠাকুর
(২) ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ব-বাংলার রাগ সঙ্গীত-চর্চা প্রসঙ্গে অনেক গুণীজন অনেক মন্তব্য করেছেন৷ বাংলা গানের শাস্ত্রীয় ভাবধারা বাংলা গানকে কতটা সমাদৃত করেছে, সে প্রসঙ্গে অমিত্র সুদন মৈত্র বলেছেন, “নজরুল সকল পর্যায়ের গান লিখে বাংলা গানকে আধুনিকতার শীর্ষে রূপ দিয়েছেন কিন্তু তা পরিপূর্ণ হতো না, যদি না তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে নিজের অবস্থানকে তুলে না ধরতেন
” নজরুলসঙ্গীত ও বাংলা গান; কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়।
ধ্রুপদ :
“ধ্রুপদ” শব্দের উৎপত্তি ধ্রুব পদ থেকে। সে ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত হোক বা ধ্রুপদ পর্যায়ের বাংলা গান হোক পাণীগত অবস্থান একই ধরনের। দ্রুপদ প্রথমে অর্থবিহীন শব্দ দ্বারা আলাপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় (যেমন: দোম, তোম, তানা দেরে ইত্যাদি) কিন্তু নজরুল সৃষ্ট ধ্রুপদে অর্থবিহীন শব্দ দ্বারা আলাপ প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো মতামতের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
কিন্তু শিল্পীর যোগ্যতা অনুসারে নজরুলের ধ্রুপদ পরিবেশনের সময় শিল্পী আলাপ, লয়কারী, প্রভৃতি উপস্থাপন করেন। ধ্রুপদ পর্যায়ের গানে তাল হিসেবে ঝাঁপতাল, তেওড়া, চৌতাল, সুরফাঁক তালের অবস্থান লক্ষ্যণীয়। যেমন: এসো শংকর ক্রোধায়ী হে প্রলয়ঙ্কর তাল সুরফাঁক।

ধামার
ধামার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ধারার দ্বিতীয় পর্যায়। এর ব্যাপ্তি ধ্রুপদের পরে। ধামারের গীতিশৈলী এবং নজরুলের ধামার পর্যায়ের গীতিশৈলী ভিন্নধর্মী। ধামার পর্যায়ের গান যে কোনো রাগের অবস্থান বিন্যাসে রচিত। ধামার পর্যায়ের গান ধামার তালেই নিবন্ধ। তাল যন্ত্র হিসাবে তবলা ও পাখোয়াজের ব্যবহার দেখা যায়। নজরুল সৃষ্ট ধামারের সংখ্যা বিশেষ নয়। খুব কম সংখ্যক ধামার বচনার মধ্য দিয়ে তিনি তার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন।
নজরুল সৃষ্ট ধামারঃ
“দোলে ঝুলন দোলায়” সুর হিমাংশু দত্ত,
প্রকাশকাল :
১৫ জুন, ১৯৩৭, রেকর্ড নং-৯৯৩০
খেয়াল
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারার তৃতীয় পর্যায় হলো খেয়াল । খেয়ালের গীতিশৈলী এবং নজরুলের খেয়াল পর্যায়ের গানের গীতিশৈলী প্রায় কাছাকাছি। খেয়াল গানের মূলত ৫টি বিভাগ, এর যে কোনো একটি বিভাগ বাদ দিলে পরিবেশনায় তা পূর্ণতা পাবে না। নজরুল সৃষ্ট খেয়াল গানের অবস্থান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের খেয়াল পর্যায়ের গানকে পরিপূর্ণ করেছে।
যেমন: “এস প্রিয় আরো কাছে “
ঠুমরীঃ
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ধ্রুপদ, ধামার, ঠুমরীর অবস্থান খুব পাশাপাশি। ঠুমরীর গীতিশেলী, অবয়ব, তালের ব্যবহার রাগের ব্যবহার এবং নজরুলের ঠুমরী পর্যায়ের গানের গীতিশৈলীর অবস্থান ও তালের ব্যবহার একই ধরনের যা গায়কের স্বাধীনতা এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দখলের উপর নির্ভরশীল। ঠুমরী পর্যায়ের গানে নজরুল যে রাগের ব্যবহার করেছেন তার মধ্যে পিলু, খাম্বাজ, ঝিঝিট, তিলোক কামোন উল্লেখযোগ্য ।
বাণীগত অবস্থানের দিক দিয়ে মোটামুটি সাধারণ শব্দ এবং বাক্য দেখানো হয়েছে। ঠুমরী পর্যায়ের গান মূলত সুর বৈচিত্র্যমূখীতার কারণে গানটি মূলত রাগে বিন্যাসিত । ফলে পরিবেশনের সময় এর বিস্তার, সূক্ষ্ম সুরের কারুকাজ ঠুমরীর বৈশিষ্ট্যকে মহৎ করে তোলে। নজরুল বাংলা গানের বিবর্তনের ক্ষেত্রে ঠুমরী পর্যায়ের গানকে স্বার্থক রূপ দিয়ে গেছেন।
যেমন : “সুরে মালা ও বাণীর মেলা”

টপ্পা :
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি পর্যায় হলো টপ্পা। তা হলেও বাংলা গানের আধুনিক পর্বে এর ব্যাপ্তি ঘটিয়েছেন কাজী নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা গানের পরিপূর্ণতার ক্ষেত্রে টপ্পা অঙ্গকে একটি অধ্যায় বলা চলে। টপ্পা পর্যায়ের গানের বৈশিষ্ট্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং লঘু সঙ্গীতে একই ধরনের।
টপ্পায় মূলত একই স্বরে সুরের বিভিন্ন অবস্থান সর্বাধিক। শিল্পীর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ধারণ করবার ক্ষমতা অনুসারে গায়কীর স্বার্থকতা পায়। নজরুলের টপ্পা অঙ্গের গানের বিস্তার বা পরিধির অবস্থান এতোটা না হলেও নজরুলসঙ্গীতকে পরিপূর্ণ করবার মতো গান নজরুল রচনা করেছেন।
যেমন : “যাহা কিছু মম”
দাদরা :
নজরুল তার গানের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি ধারাকে বাংলা গানে প্রতিফলিত করেছেন। যার একটি পর্যায় দাদা। দাদুরা একটি গীতরীতি, গীতিশৈলীর ধারায় সার্বিকভাবে একটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। দাদুরা পর্যায়ের গান দাদুরা তালেই গাওয়া হয়। এর সুর বৈচিত্র্য বা সুর বণ্টন শিল্পীর যোগ্যতা অনুসারে হয়ে থাকে।
যেমন: “এস বসন্তের রাজা হে আমার”
রাগ: পিলু, তাল: দাদরা
রেকর্ড নং এন ৫৪০৬.

রাগপ্রধান গান :
এই গানগুলো রাগাশ্রয়ী কাব্য গীতি যা কোনো একটি রাগের স্বর বিন্যাসে রচিত। রাগপ্রধান গানের বাণী এবং বাক্য সমন্বয়ের আক্ষরিক, শাব্দিক, অলংকার অনেকাংশে কাব্যগীতির ধারায় রচিত। এর অবয়ব তাল বৈচিত্রা, সুর বিন্যাস শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
যেমন : “জয়তু শ্রীরাম কৃষ্ণ”
রাগ ইমন, তাল: একতাল
রেকর্ড নং জে এন ৫৪৫৬
শালঙ্ক শ্রেণীর রাগঃ
নজরুলের গানের বৈচিত্র্য সাধন এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্যকে সঠিক রাখবার জন্য তিনি তাঁর গানে শালঙ্ক শ্রেণীর রাগের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। শালঙ্ক, রাগ বলতে দুটি রাগের মিশ্রণকে বুঝায়। নজরুল শালঙ্ক গান রচনায় নিজের শাস্ত্রীয় প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন।
যেমন “ওমা বক্ষে ধরে শিব ”
রাগ: বেহাগ-খাম্বাজ, তাল দাদরা
রেকর্ড নংএন ২৭৬৩৩
সংকীর্ণ শ্রেণীর রাগ :
নজরুলের সংকীর্ণ শ্রেণীর গানকে মিশ্র রাগের গান বলা হয়। কারণ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সংকীর্ণ শ্রেণীর রাগ পরিবেশনায় মোটামুটিভাবে একটি নিয়ম মানা হয় বা নির্দিষ্ট রাগগুলিকে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, কিন্তু নজরুলের গানের পরিবেশনায় সংকীর্ণ শ্রেণীর রাগ এন্ডটা বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় না, সে কারণে নজরুলের সংকীর্ণ শ্রেণীর গানকে মিশ্র রাগের গান বলা হয়।
যেমন : “ এবার নবীণ মন্ত্রে হবে জননী তোর উদ্ভোদন
রাগ: মিশ্র ভৈবরী, ভাল দাদরা,
প্রকাশ কাল ১৯৩৯ সাল
রেকর্ড নং এন ২৭৩৯৫

দক্ষিণ ভারতীয় রাগের প্রয়োগঃ
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূলত দুটি পদ্ধতি, একটি উত্তর ভারতীয় পদ্ধতি অন্যটি দক্ষিণ ভারতীয় পদ্ধতি। কাজী নজরুল মূলত উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির বিশেষজ্ঞ ছিলেন। নজরুল উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে পারদর্শী হলেও, সুরের আঙ্গীকের ধারা বিশ্লেষণ করতে গিয়েই তিনি দক্ষিণ ভারতীয় রাগের ব্যবহার তাঁর গানে প্রয়োগ করেন।
যেমন “এসো চির জনমের সাথী ”
রাগ নাগস্বরাবলী, তাল : ত্রিতাল
প্রকাশকাল ১৯৩৭.
গুপ্ত রাগের গান :
একমাত্র নজরুলই পঞ্চ-গীতি কবির মধ্যে লুপ্ত রাগের ক্ষেত্রে স্বার্থক রূপকার যা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অবস্থান এবং বাংলা গানকে বাহ্যিক রূপ দিয়েছে। যদিও গুপ্ত রাগের গানের সংখ্যা এতটা ব্যাপক নয় তবুও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারাকে নজরুল তাঁর সঙ্গীতের মাধ্যমে অলংকৃত করেছেন। ”
যেমন ” খেলে নন্দের আঙ্গিনায়
রাগ দেবগান্ধার,
পর্যায় ভজন, ভাল ঝাঁপতাল
রেকর্ড নং এন ১৭২০০
লক্ষ্মণগীত :
কাজী নজরুল ১৯৩৯ সাল থেকে লক্ষ্মণগীত রচনা শুরু করেন। উত ছয়টি লক্ষণ গীত পাওয়া যায়। অন্যান্য পর্যায়ের মতো লক্ষণ গীত রচনায় তিনি এতটা সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
যেমন ” কার অনুরাগে শ্রীমুখ উজ্জ্বল”
রাগ রাগেশ্রী, তাল : ত্রিতাল।
উপসংহার :
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশিলিত ধারায় কাজী নজরুলের অবাধ বিচরণ ছিল। তিনি যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন তা প্রমাণিক। তাঁর গানের মধ্যে রাগাশ্রীত বাংলা গান। ও তাঁর রাগ সৃষ্টি বিশেষ স্বাক্ষর রেখেছে। তাই বাংলা গানের বিবর্তনে কাজী নজরুলের অবদান চিরস্থায়ী। বিশেষ করে রাগ প্রধান বাংলা গান রচনায় তাঁর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরদিন।

