নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সম্পর্কে বিশ্লেষণ । নজরুলের ভাবনা

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান : বাংলা সঙ্গীতের ক্রমবিবর্তনের ধারায় নজরুল সঙ্গীত তথা : নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সার্বিকভাবে সাহিতিক পরিমণ্ডলে একটি প্রভাব ফেলেছে। বাংলা গানের পর্যায়ক্রমিক সূচিতে নজরুলের আধুনিক গান, বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ।

 

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সম্পর্কে বিশ্লেষণ

 

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সম্পর্কে বিশ্লেষণ । নজরুলের ভাবনা

বাংলা গানের উৎপত্তি থেকে আধুনিক গান যেভাবে নান্দনিক রূপ লাড করেছে নজরুলের আধুনিক গান তার ব্যতিক্রম নয়। বাণী, সুর এবং রাগ সংমিশ্রণে যা শ্রবণের অনুভূতিকে ছুঁয়ে যায়। আমরা নজরুলের আধুনিক গানের সাথে বাংলা আধুনিক গানের সাঙ্গিতিক বিশ্লেষণ এবং সার্থক অবস্থান আলোচনা করব ।

আধুনিক গানঃ

যে গানের বাণী ও সুর রোমান্টিক ও বিরহ ভাবাবেগে একটি অপরটির পরিপুরক তাকে আধুনিক গান বলে। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে এর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। কিছু কিছু আধুনিক গানের রূপক অর্থ ব্যথিত হৃদয় বা মনকে ছুঁয়ে যায়। নজরুলের মতো কোনো গীতিকার বাণী ও সুরের মালা দিয়ে আধুনিক গানকে এত সুন্দরভাবে সাজাতে পারেনি বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। আধুনিক গানের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাগাশ্রিত সুর সংযোজন বলিষ্ঠ বাণী, সুরকারের বিভক্তি, সুন্দর পরিবেশনা নজরুলের গানের মূল বৈশিষ্ট্য ।

মন্তব্য

অপূর্ব সুন্দর মৈত্রের “সঙ্গীত কথা” গ্রন্থে ডার উইনের সঙ্গীতের উৎপত্তি সম্পর্কিত একটি মতবাদ সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেছেন, “সঙ্গীতের উৎপত্তি যেভাবেই হোক না কেন সিন্ধু সভ্যতার যুগ, বৈদিক যুগ, বৈদিকোত্তর যুগ, মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ এই কয়টি ধাপ অতিক্রম করে মার্গ সঙ্গীত এবং দেশী সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্যকে একত্রিত করে আজকের প্রবাহ মান আধুনিক গানের সৃষ্টি।”

গান রচনার আভিধানিক অর্থ একই হলেও রচনার উৎস ও প্রেক্ষাপট পর্যায় হিসেবে বৈশিষ্ট্য বহন করে। নজরুলের আধুনিক গান বিবর্তনের ধারায় শেষ পর্যায় হলেও কাব্যিক অংশ ও সুরের সংযোজন সার্বিকভাবে বৈচিত্র্যমুখী।

 

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সম্পর্কে বিশ্লেষণ

 

অলংকার

গায়কী বৈশিষ্ট্যে নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গানের সীমাবদ্ধতা বেশ রয়েছে। অলংকারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্যান্য পর্যায়ের গানের মতো বিশেষ মহত্বপূর্ণ স্বরসঙ্গতি প্রদর্শিত হয় না। তবুও আধুনিক পর্যায়ের গানের নান্দনিকতা অনেক।

অন্য সুরকার প্রসঙ্গ :

সুর বৈচিত্র্যর শ্রেণীবিন্যাস প্রশ্নে কাজী নজরুল তাঁর রচিত গানে অন্য সুরকারের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। এই বৈশিষ্ট্যটি আধুনিক গানে বেশির ভাগ দেখা যায়।

যেমন- “এখনও ওঠেনি চাঁদ”

বাণী প্রসঙ্গ

বিষয়ভিত্তিক রচনার ক্ষেত্রে বাণী-বিন্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রোমান্টিক এবং বিরহ দুটি ভিন্ন আঙ্গিকের ক্ষেত্রে বাণীর বিভিন্নতা দেখা যায়। গান রচনার পর সুর সংযোজনের সময় অনেক সময় বাণীর পরিবর্তন হয়।

ভাব বিন্যাস

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গানের ভাব-বিন্যাসের ক্ষেত্রে দর্শন তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট মূল বিষয় ভাবার্থ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গানের মূলভাব পরিবর্তনশীল। আধুনিক পর্যায়ের গানে ভাবের দিকটি সর্বোপরি আধুনিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ।

 

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সম্পর্কে বিশ্লেষণ

 

ডি এল রায় ও নজরুরের আধুনিক পর্যায়ের গান :

ডি এল রায় ও নজরুলের গানের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য হলো সুরের ধারাবাহিকতা। বাণী এবং বাক্য সমন্বয়ের অবস্থান কাছাকাছি বটে। যেমন-

(১) নজরুলের আধুনিক গান :

“আমি প্রভাতি তারা পূর্বাঞ্চলে”
শিল্পী: যুথিকা রায়
রেকর্ড ১৭৩৯
তাল: কাহারবা

(২) ডি এল রায় এর আধুনিক গান

“তোমারেই ভালবাসি আমি”

রাগঃ কানাড়া
তালঃ কাহারবা

রজনী কান্ত ও নজরুলের আধুনিক গানঃ

নজরুলের আধুনিক গানের বৈশিষ্ট্য ও রজনী কান্তের গানের বৈশিষ্ট্য ভীন্ন পর্যায়ের। ব্যাপক সৃষ্টিতে আধুনিক গানের ক্ষেত্রটি সু পরিসরে রোমান্টিক এবং বিরহের হলেও রজনী কান্তের গান ও নজরুলের আধুনিক গান নান্দনিক বটে।

যেমন

“আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে”
তালঃ দাদরা

 

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সম্পর্কে বিশ্লেষণ

 

অতুল প্রসাদ ও নজরুলের গান

অতুল প্রসাদের রচিত সঙ্গীত যে ধারায় প্রভাহিত সেখানে আধুনিক পর্যায়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল তবুও আলোচনার ভিত্তিতে গানের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় কিছু গান আধুনিক পর্যায় হিসেবে ধরা যায়। তুলনামূলক বিশ্লেষণে নজরুলের আধুনিক গান অতুলের গানের চাইতে সাঙ্গীতিকভাবে মহত্বপূর্ণ যেমন : অতুল প্রসাদের গান,

“এমন বাদলে তুমি কোথা” ।
তাল: তেওড়া।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান :

রবীন্দ্রনাথের আধুনিক গান ও নজরুলের আধুনিক গান ভীন্নধর্মী হলেও যার যার অবস্থানে মহত্বপূর্ণ ।

অবয়ব :

চর্যাপদ থেকে আধুনিক পর্যায় পর্যন্ত বাংলা গানের ধারার সকল পর্যায়ের গানের নাম ভিন্ন হলেও অবয়ব একই রকম প্রায়। স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, অভোগ এই চারটি বিভাগেই নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গানের অবস্থান।

গীতিশৈলি :

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গানের গীতিশৈলির ধারা প্রায় অন্যান্য গানের মতোই। প্রথমে স্থায়ী সমাপ্তির পর অন্তরা তারপরে, সঞ্চারী এবং শেষ পর্যায়ে আভোগ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আধুনিক গানের সমাপ্তি হয়।

তালের ব্যবহার :

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গানে দাদরা, কাহারবা তালের প্রয়োগ বেশি দেখা যায়।

রাগ-রাগিনীর ব্যবহার

মিশ্র রাগের ব্যবহার খুব। শুদ্ধ ও শালংক রাগের প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না।

আধুনিক বাংলা গান ও কাজী নজরুলের আধুনিক গান : চর্যাপদের শুরু থেকে বাংলা গানের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসে আধুনিক গান একটি অধ্যায় বটে। যার সাথে বিংশ শতাব্দীতে যুক্ত হয়েছে নজরুলের আধুনিক বৈশিষ্ট্যে রচিত সঙ্গীত।

 

নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সম্পর্কে বিশ্লেষণ

 

ছল প্রকরণ :

কাব্য ও সঙ্গীত উভয় ক্ষেত্রেই ছন্দ প্রকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রচনা ও তার সাথে সুর সৃষ্টির বিষয়টি ছন্দবদ্ধ সুর সংযুক্ত বাণীর বাহ্যিক প্রকাশ। কাব্যিক ধারায় যখন সুরকে বিবেচনা করা হয় তখন ছন্দের একটি প্রভাব গানে প্রতিফলিত হয়। যেমন : পদ্ধড়ী ছন্দ।

সাঙ্গীতিক মূল্যায়ন

সাঙ্গীতিক মূল্যায়নের দৃষ্টিতে নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান ঐতিহাসিক আধুনিক বাংলা গানকে অলংকৃত করেছে। বাণীর সাথে সুরের সমন্বয়, নির্বাচিত তাল এবং সার্থক পরিবেশনায় নজরুলের আধুনিক গান হয়েছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত এবং গীতিময়।

রেকর্ডকৃত শিল্পী প্রসঙ্গ :

নজরুলের আধুনিক গান যারা রেকর্ড করেছে তাদের মধ্যে জগনময় মিত্র, সতিনাথ মুখোপাধ্যায়, যুথিকা রায়, কমল দাশ গুপ্ত, কুমারী মীনা বন্দোপাধ্যায়, সন্তোষ সেন গুপ্ত প্রমুখ।

 

google news logo

 

উপসংহার :

উপরোক্ত আলোচনার আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, বাংলা গানের পর্যায় ক্রমিক ধারায়, নজরুলের আধুনিক গান আধুনিক গানের বৈচিত্র্য বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ । অলংকারিক দিক দিয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যদিও মহত্বপূর্ণ স্বরসঙ্গতি প্রদর্শিত হয় না। তবুও বাণী ও সুরের গাথুনী তাঁর আধুনিক গানকে করেছে নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ ।

Leave a Comment