অনুবাদক হিসাবে কাজী নজরুলের মূল্যায়ন : যে-সব কবি অনুবাদের দ্বারা বাঙলা সাহিত্যের সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন নজরুল যে তাঁদের মধ্যে একজন এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর পরিচয় স্বল্প থাকলেও আরবী ও ফারসী সাহিত্যে তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।

অনুবাদক হিসাবে কাজী নজরুলের মূল্যায়ন । নজরুলের ভাবনা
প্রথম জীবনেই তিনি আরবী, ফারসী ও উর্দু মেশানো মুসলমানী বাঙলায় অনেক পালাগান রচনা করেন। পরবর্তী জীবনে ‘সিরাজদ্দৌলা’ প্রভৃতি নাটকের জন্যে তিনি বহু উর্দু গান রচনা করে দেন। শুধু তাই নয়। আরবী ও ফারসী সাহিত্যের অমর ভাণ্ডার থেকে ভাব, শব্দ, ছন্দ, সুর প্রভৃতি সংগ্রহ করে তিনি বাঙলা ভাষাকে ঐশ্বর্যশালী করতে সর্বদা যত্নবান ছিলেন।
সংস্কৃত ও বাঙলার নিজস্ব ভাব ও ভাষার প্রতিও তাঁর আন্তরিক আগ্রহ ছিল বলে অন্য সাহিত্য থেকে তিনি যা চয়ন করে এনেছেন তা বাঙলা ভাষার নিজস্ব জিনিস হয়ে উঠেছে। তাঁর অনুবাদের পরিমাণ তেমন বেশি না হলেও তার উৎকর্ষের মান সামান্য নয়।

নজরুলের অনুবাদ গ্রন্থ তিনটি। এগুলি হচ্ছে-‘রুবাইয়াৎ-হাফিজ’ [আষাঢ় ১৩৩৭ সাল ১৯৩০), “কাব্য আমপারা” (১৯৩৩) ও ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ ১৯৫৯]। এছাড়া নজরুল ইংরেজি, আরবী, ফারসী প্রভৃতি কবিতার অনুবাদ ও ভাবানুবাদ করেছেন।
‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজের মুখবন্ধে তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি হাফিজের ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটি গজলের অনুবাদ করেছেন। এই অনুবাদ কবিতা ও গজল বিভিন্ন সাময়িক পত্রে ও তাঁর পুস্তকে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং যথাস্থানে সেগুলি প্রয়োজনানুযায়ী উল্লিখিত হয়েছে।
নজরুলের ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ ও ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ গ্রন্থদ্বয়ের মূল ফারসী পদ্য এবং ‘কাব্য আমপারা’-র ভিত্তি আরবী গদ্য। তিনি সবক্ষেত্রেই যথাসম্ভব মূলের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছেন। ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ এবং বিশেষ করে ‘কাব্য আমপারা’য় তাদের মূলের প্রতি বিশেষ অধীনতার জন্যে তাঁর অনুবাদ কোনো কোনো জায়গায় আড়ষ্ট ও শ্লথগতি হয়ে পড়েছে।

এক ভাষা থেকে কতকটা বস্তু অন্য ভাষায় ছাঁচে ঢেলে দিলেই প্রকৃত অনুবাদ হয় না। অনুবাদের সময় যে ভাষা থেকে অনুবাদ করা হচ্ছে তার বিশিষ্ট গতিকে অনুবাদের ভাষায় সঞ্চারিত করা উচিত। অনুবাদ যাতে মূলের মতোই পাঠকবর্গকে প্রভাবিত করতে পারে তা দেখা অবশ্য কর্তব্য।
এদিক দিয়ে অনুবাদের মধ্যে প্রত্যেক কবিতাই নতুন সৃষ্টি হয়ে ওঠা দরকার। এই প্রসঙ্গে কান্তিচন্দ্র ঘোষের ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ ফিটসজেরাল্ড ও কান্তিচন্দ্রের অনুবাদ সম্পর্কে একটি পত্রে যা লিখেছিলেন (২৯ শে শ্রাবণ, ১৩২৬ সাল (১৯১৯) তা বিশেষভাবে স্মরণীয়।

“….এ রকম কবিতা একভাষা থেকে অন্য ভাষায় ছাঁচে ঢেলে দেওয়া কঠিন। কারণ এর প্রধান জিনিসটা বস্তু নয়, গতি। জেরাল্ডও তাই ঠিকমত তর্জমা করেননি। মূলের ভাবটা নিয়ে সেটাকে নতুন করে সৃষ্টি করেছেন। ভালো কবিতা মাত্রকেই তর্জমায় নতুন করে সৃষ্টি করা দরকার। তোমার তর্জমা পড়ে আমার একটা কথা বিশেষ করে মনে উঠেছে। সে হচ্ছে এই যে বাংলার কাব্যভাষার শক্তি এখন এত বেড়ে উঠেছে যে, অন্য ভাষার কাব্যের লীলা অংশও এ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব। মূল কাব্যের এই রসলীলা যে তুমি বাংলা ছন্দে এমন সহজে বহমান করতে পেরেছ এতে তোমার বিশেষ ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে।”

অনুবাদে এক ভাষার ভাব ও গতি অন্য ভাষায় ঢালার সঙ্গে সঙ্গে মূলের সৌন্দর্য- রহস্যের প্রতি আগ্রহ জাগানোর চেষ্টা থাকা দরকার। গ্যেটের মতে, অনুবাদক পাঠককে কোনো এক অবগুন্ঠিত সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাকে এ সৌন্দর্যের জন্য আকাঙ্ক্ষিত করে তোলেন। নজরুল তাঁর অধিকাংশ অনুবাদে, বিশেষ করে হাফিজের গজল ও রুবাইয়ের অনুবাদেই মূল কাব্যের ভাব ও গতি বজায় রাখতে এবং সেই সঙ্গে তার সৌন্দর্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন।
