নজরুল সঙ্গীতের গায়কী: আজকাল জনপ্রিয় শিল্পীদের দিয়ে নজরুল সঙ্গীত গাওয়াবার একটা অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জনপ্রিয় শিল্পীর কন্ঠ ও শিক্ষা নজরুলসঙ্গীতের উপযোগী হোক বা না হোক বর্তমানের জনপ্রিয় শিল্পীদের দিয়ে গাওয়ানোর ফলে নজরুল সঙ্গীত অধিক জনপ্রিয় হবে এই রকম একটা অবাস্তব চিন্তা উদ্যোক্তাদের মনে ক্রিয়া করছে। ফলে নজরুল সঙ্গীত সাময়িক জনপ্রিয়তা পেলেও তার মান ক্রমশ ক্ষুণ্ণ হতে থাকবে।

নজরুল সঙ্গীতের গায়কী । নজরুলের ভাবনা
অদূর ভবিষ্যতে নজরুল সঙ্গীত তার গায়কী ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলবে। অর্থ ব্যয় করে অযোগ্য-কণ্ঠ একক সঙ্গীতের অনুষ্ঠান করা যায়, কাগজে অনুকূল সমালোচনা বার করা যেতে পারে। কিন্তু এর দ্বারা ব্যক্তি বিশেষের প্রচার ছাড়া নজরুল সঙ্গীতের মান উন্নত হবে না বরঞ্চ ক্রমশ নিম্নগামী হবে। সুতরাং পক্ষপাতমুক্ত হয়ে সামগ্রিকভাবে চেষ্টা করা দরকার যাতে নজরুল সঙ্গীতের অবিকৃত চরিত্র ও গায়কী অক্ষুণ্ণ থাকে ।
কবির কীর্তিকে একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক বিকাশ হিসেবেই ধরা উচিত। নতুবা কবিকে একপেশে ও ছোটো করা হয়। কোনো কোনো ব্যক্তি ও সমালোচক কবিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ হতে বিচার করে তাঁর আধ্যাত্মিক সঙ্গীতগুলিকে স্বীকার করতে চান না। কিন্তু চারণ কবি মুকুন্দদাসের মতো কবি নজরুলেরও সৃষ্টির উৎস ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক অনুভূতি ও মূল্যবোধর উপর।

নজরুল যে-সব শ্যামাসঙ্গীত লিখেছেন তা রামপ্রসাদ-কমলাকান্তের প্রকৃত উত্তর সাধকের বলা যেতে পারে। ‘বলরে জবা বল’ অথবা ‘আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে’-এই রকম দু-একটি গানের দ্বারাই নজরুল অমর হয়ে থাকতে পারতেন। যেমন অপূর্ব রচনা তেমনই অপূর্ব সুর যোজনা । নজরুলকে শুধুমাত্র উদ্দীপক গানের স্রষ্টা বললে ভুল হবে।
তাঁর দেশাত্মবোধক সঙ্গীতেও সারা দেশ মেতে উঠেছিল- একথা ঠিক। কিন্তু কবি তাঁর বিদ্রোহী কবিতায় অবচেতন মনে আবার বলে উঠেছেন ‘আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন চুড়ির কন কন। বিদ্রোহীর রণতুর্যই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়।
ধুলো-মাটির তুচ্ছ মার্চের ব্যথা ও কামনায় তাঁর সঙ্গীত-ডালি ভরে উঠেছে। মানুষের প্রেম ও ভালোবাসায় নজরুলের প্রতি রক্তবিন্দু রঙিন। তাঁর সাড়ে তিন হাজারের গানের অনেকখানি জুড়ে রয়েছে এই কাব্য-সঙ্গীত। কিন্তু তাঁর কাব্য সঙ্গীতে রয়েছে একটি বিশেষ গায়কী আধুনিক ও লঘু-সঙ্গীত হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। নজরুল ভারতীয় সঙ্গীত- শৈলীর প্রায় সমস্ত সঙ্গীতের উপরই সঙ্গীত রচনা করেছেন তাতে সুর যোজনা করেছেন। এছাড়া কিছু বিদেশী সুর নিয়েও বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।
যেমন- ‘রুম ঝুম, রুম ঝুম খেজুর পাতায়’ বা ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে অথবা “দূর দ্বীপাসিনী’ ইত্যাদি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী এই জাতীয় সঙ্গীতগুলোর মধ্যে দিয়ে নজরুলের প্রকৃত গায়কী পাওয়া যাবে না। বর্তমানে নজরুলের এই জাতীয় সঙ্গীতগুলিই আসরে নতুন নতুন নজরুল শিল্পীরা বেশি গেয়ে থাকেন।

এগুলো কবির কতগুলি এক্সপেরিমেন্ট। কবির গানের সত্যকার পরিচয় পাওয়া যায় তার গাজল গানে, ঠুংরি ভাঙা গানে, তাঁর চৈতী, কাজরী, রাগপ্রধান গ্যানে। নজরুলের অভিনব সৃষ্টি হলো তাঁর গজল। মনে হয় নজরুলই সর্বপ্রথম বাংলাগানে গজল গানের প্রবর্তন করে বাংলাসঙ্গীতকে করেছেন সমৃদ্ধশালী। তাই তাঁর সব ধরনের গানের গায়কীর অবস্থানটি লক্ষ করেই শিল্পীর পরিবেশন করা উচিত।
