শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ নিয়ে আজকের আলোচনা। চর্যাগীত বাংলা গান ও বাংলা কবিতার আদি নিদর্শন চর্যাগীতির সাংগীতিক প্রভাব সম্পর্কে স্বামী প্রজ্ঞানন্দ তার পদাবলী কীর্তনের ইতিহাসে প্রথম খণ্ডে বলেছেন, শাইদের ও ব্যংকটমুখীর কিরণ থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, ৯ম-১১শ শতকের বাংলাদেশে বৌদ্ধ চর্যাগীভিগুলিও ক্ল্যাসিক্যাল তথা শাস্ত্রীয় ও ট্র্যাডিশনাল শ্ৰেণীভুক্ত ছিল।

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ । নজরুলের ভাবনা

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ

 

হতে পারে ১৩শ থেকে ১৬শ শতকে গীত চর্যাগীতিরীতি গঠনে ও প্রকাশভঙ্গীতে ছিল অনেকটা সহজসরল কিন্তু তা যে, ৯শ-১১শ শতকের গীতিরূপ ও গীত শৈলীকে ভিত্তি করেই বিকাশ লাভ করেছিল একথা সত্য। ৯ম-১১শ শতকের পরবর্তী তিারিত পদগান বা অষ্টপদিগান, কৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলগান, নামকীর্তন, পদাবলী অন্যান্য ভক্তিমূলক অভিজাত গানের যোগসূত্রও চর্যাগীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল।

মোট কথা চর্চার গীতরীতি ও প্রেরণাই পরবর্তীকালে সকল গীতশ্রেণী সমৃদ্ধির পথে পাথেয়। চর্যাগীতিতেও যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব ছিলো তা চর্যাগীতির সুরবিশ্লেষণ বা গীতিশৈলী থেকে বোঝা যায়। প্রত্যেকটি চর্যাগীতির শিরোদেশে রাগের নাম উল্লেখ আছে।

যেসব রাগে চর্যাগীতি রচিত হয়েছে তাদের নাম হল পটমঞ্জরী, গবড়া, অরু, গুরারী, দেবী, দেশাখ, ভৈরবী, কামোन সী রামক্রী, বরাড়ী, বরী, মারী, মানসী গড়া, শবরী ও বঙ্গাল। পটময়ূরী চর্যাগীতিতে সর্বাধিক ব্যবহৃত রাগ। অন্যকোন গানে তাল নামের উল্লেখ না থাকলেও প্রবোধ সেন সংগৃহীত চর্যায় তিব্বতী অনুবাদে ২৪ সংখ্যক গানের শিরোদেশে ইন্দ্রতালের উল্লেখ দেখা যায়। এতে মনে হয় অন্য সকল গানেও রাগের সাথে তালের উল্লেখ ছিল।

চর্যায় ব্যবহৃত রাগের কয়েকটি জয়দেবের গীতগোবিন্দে এবং বড়চণ্ডীদাশের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনেও লক্ষ্য করা যায়। রামক্রী গীতগোবিন্দে হয়েছে রামকিরি এবং বড় চণ্ডীদাসের কারো রয়েছে দেশাগ। বড়চণ্ডীদাসের কাব্যের ধানুষী ধানেশ্রীর পরিবর্তিত রূপমাত্র। ম্যারীবাগ, মল্লার নামে আজও সুপরিচিত।

কৃষ্ণলীলায় প্রচলিত পাইরী রাগই চর্যাতে উড়েবর্ত কাহ্ন ইরী লোচনপণ্ডিত তার রাগরাগিনী গ্রন্থে গৌরী রাগ, নামে একটি রাগের উল্লেখ করেছেন, সেই গৌরী শব্দের পরিবর্তিত রূপ গইরা বা গবড়া হতে পারে, কিংবা এমনও হতে পারে যে সেকালে কাব্যে যেমন গৌড়িরীতি বলে একটি বিশিষ্ট রীতির উল্লেখ পাই তেমনি রাগের মধ্যে হয়ত একটি ছিল গৌড়ি রাগ বা সেই ঘৌড়ি শব্দের পরিবর্তিত রূপ।

চর্যাগীতিতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যবস্থার সম্পর্কে ডঃ নীহার রনজন রায়ের বক্তব্য এখানে স্মরণযোগ্য।

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ । নজরুলের ভাবনা

 

“সঙ্গীত ইতিহাসের দিক থেকে চর্যাগীতির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য রাগ শবরী ও বঙাল রাগ। শবরী রাগতো নিঃসন্দেহে শবরদের মধ্যে প্রচলিত রাগ। এই লোকায়িত রাগটির মার্গীকরণ করে হয়েছি বলা কঠিন; তবে এর উল্লেখ শুধু চর্যাগীতিতেই পাইতেছি, আগে বা পরে সে উল্লেখ আর কোথাও দেখিতেছিনা। বঙাল রাগও যে কি ধরনের আজ তাহাও বোঝার উপায় নেই।

তবে এই রাগীটিও যে, একসময় গুর্জরী মালবশ্রী বা মালসী প্রভৃতি রাগের মত স্থানীয় লোকায়ত রাগই ছিল সন্দেহ নাই। অথচ ভারতীয় রাগসঙ্গীতে বঙাল রাগ একসময় সুপরিচিত রাগ ছিল এবং অষ্টাদশ শতকের রাজস্থানী চিত্রনিদর্শনে বঙাল রাগের চিত্রও দুর্লভ নয়। পরে কিভাবে রাগটি লুপ্ত হল জানা জায়নি। মূলত চর্যাগীতির দেবক্রী, গবরা, মালসী গবুড়া, শবরী, বঙাল, কাহ্নগুজরী প্রভৃতি অনেক রাগই আজ বিলুপ্ত। দেশাগ রাগ মনে হচ্ছে আজকের দেশরাগে বিবর্তিত হয়েছে। সার্বিক উপস্থান প্রক্রিয়ায় আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, চর্যাপদে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যবহার বেশ রয়েছে।

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ

 

শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীত:

সাঙ্গীতিক পরিভাষায় শ্ৰীকৃষ্ণ কীর্তন বিপ্রকীর্ণ জাতির, অর্থাৎ প্রধান প্রধান প্রবন্ধ ব্যতীত দেশে যে সকল গীতরূপ ইস্তততঃ বিক্ষিপ্তভাবে পাওয়া যায় তাকে বিপ্রকীর্ণ আড্ডা দেয়া হয়। তেমনি এটি লোকায়ত জনগনের ও কাব্য দুটি গ্রাম্য গোপবালক- বালিকার প্রণয় কাহিনী, এতে গ্রামের পথঘাট, বনাঞ্চল এবং গ্রাম্যজীবনের এক স্বাভাবিক চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনটি চরিত্র রাধা-কৃষ্ণ ও বড়াই-এর উক্তি প্রত্যুক্তি স্থলবন্ধনের মধ্যদিয়ে কাহিনী রুপে বর্ণিত হয়েছে। অনেকের ধারণা যে, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের মধ্যে বাংলার ঝুমুর গান ও লোকযাত্রার বীজ নিহিত।

শ্ৰীকৃষ্ণ কীর্তনে যে, শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের ব্যবহার ছিল তা রাগের ব্যবহার দেখে বোঝা যায়, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে মোট ৩২টি রাগের উল্লেখ পাওয়া যায়- যেমন ঃ আহের, কতু, কহু, কহুতচারী, কেদার, কোড়া, কোড়াদেশাগ, গুনারী, দেশববাড়ী, দেশাগ, ধানসী, পটমঞ্জুরী, পাহাড়ী, বঙ্গাল, বঙ্গাল বরাড়ী, বসন্ত, বিভাস, বিভাসকুহু, বেলাবলী, ভাটিয়ালী, ভৈবরী, মল্লার, মালব, মালবশ্রী, মাহারবা, রামগিরি, ললিত, শোরী, শ্রী, শ্রীরাম গিরি ও সিন্ধুড়া এবং তালের ব্যবহার হল- যতি, ক্রীড়া, একতালী, লঘু, শেখর, রূপক, কুজুক, আঠতালা শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে উল্লেখিত শোরি রাগ সম্ভবত চর্যায় ব্যবহৃত শবরী রাগের অপভ্রংশ।

শ্ৰীকৃষ্ণ কীর্তে যে সকল রাগরাগিনীর উল্লেখ আছে তার মধ্যে কিছু কিছু রাগ-রাগিনীর পরিচয় প্রাচীন সঙ্গীত শাস্ত্রে পাওয়া যায়। তার মধ্যে আহের, কহু, রামগিরি, ধানসী, দেশাগ ইত্যাদি রাগের নাম উল্লেখ যোগ্য। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে পাহাড়ী রাগযুক্ত পদের সংখ্যাই অধিক। অতএব, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বহির্ভূত নয়। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে রাগ রাগিনীর ব্যবহার ছিল এবং তা প্রামাণিক।

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ । নজরুলের ভাবনা

 

চর্যাপদের দর্শনতত্ত্ব:

চর্যাপদের প্রতিটি পদই তথ্য দর্শনের দিক দিয়ে আধ্যাত্মিক। কেউ কেউ যদিও বলেছেন চর্যাপদ তান্ত্রিক সাধনারই বহির্বিন্যাস। তবে গবেষণা ভিত্তিক প্রমাণে দেখা যায় চর্যাপদ রচয়িতারা কেউই তান্ত্রিক ছিলেন না। মানব দর্শনের মূল প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে চর্যাপদ রচিত হয়েছে। এছাড়াও একটি দিক খুব মূল্যবান যে পর্যাপদে ব্যবহৃত তথ্য দার্শনিক মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত।

২৩ জন পদকর্তার মধ্যে মাত্র ৩ জন পদকর্তাকে আমরা পাই যারা তাদের পদে কোন প্রকার পারিপার্শ্বিক শব্দ কিংবা আদি রসাত্মক রূপক শব্দ ব্যবহার করেননি। বাকি ২০ জন পদকর্তা তন্ত্র সাধনার মূল বাণী প্রচার করে গেছেন তাদের রচনায়।

তথ্যে প্রমাণ মিলে যে, চর্যাপদগুলি বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন পদ্ধতি মূলক এক প্রকার গান। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত চর্যাপদে বৌদ্ধদের মতে শূন্যতা ও করুনার মিলনে বোধচিত্ত উৎপন্ন হয়। আর বধিচিত্ত লাভের মধ্যে দিয়ে উপনীত হওয়া যায় আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণার বহির্বিন্যাসে। আসলে তন্ত্র কোন দার্শনিক মত নয়। মূলত কতগুলি আচারেরই সমষ্টি। সেই তন্ত্রাচার আদিতে হিন্দু বা বৌদ্ধ কোন ধর্মের সঙ্গেই সংযুক্ত ছিল না। হিন্দু বৌদ্ধাদির সঙ্গে তার যোগ পরবর্তিকালের।

দর্শনতাত্ত্বিক আলোচনার মূল প্রেক্ষাপট বান্ডির সাধারণ আলোচনা ও মূলভাবের ঊর্ধ্বে। চর্যাপদের নিয়মতান্ত্রিক আলোচনাসমূহ দর্শনতত্ত্বের আলোকেই প্রতিফলিত হয়ে থাকে। চর্যাপদ রচনার ক্ষেত্রটি যেমনই হোক না কেন পারিপার্শ্বিক অবস্থান, ধর্মীয় দর্শনের অনুভূতি, মানব দর্শনের বৈশিষ্ট্য চর্যাপদে সার্বিকভাবে বিদ্যমান।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

 

শ্ৰীকৃষ্ণ কীর্তনের দর্শনতত্ত্ব:

শ্ৰীকৃষ্ণ কীর্তন মূলত সনাতন ধর্ম বিষয়ক। যেখানে রয়েছে রাধা ও কৃষ্ণের জীবন কাহিনী সম্বলিত তথ্য। রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াই তিনটি মূল চরিত্র হলেও রাধা ও কৃষ্ণের সংলাপই শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের মূল উপজীব্য বিষয়। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের বৈচিত্র্যময় কাহিনীর মধ্যে রয়েছে রাধার বিরহ খণ্ড, নৌকা খণ্ড, বান খণ্ড, বংশি খণ্ড, বৃন্দাবন খণ্ড, দানখণ্ড, জন্ম খণ্ড, তাম্বুল খণ্ড, ভাঁড় খণ্ড, যমুনান্তগর্ত বস্ত্রহরণ খত। এছাড়াও শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের বিষয়বস্তুতে রয়েছে তাদের অন্তনির্হিত সম্মিলিত সংলাপ। কখনও কখনও অভিমানি রাধার জাগতিক প্রেমের উপাখ্যান গীতসুধায় বর্ণিত হয়েছে।

দর্শনতাত্বিক আলোচনায় অবতার শ্রীকৃষ্ণ তার জীবনের বৈশিষ্ট্যময় আবেগ, অনুভূতি, ও সৃষ্টির দৃষ্টিতে রাধাকৃষ্ণের প্রেম, বিরহ, অনুভব ও বিন্যাসিত জীবন কাহিনীই শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের মূল উপাখ্যান দর্শনতাত্ত্বিক রহস্যময় রূপকে মানবজাতির মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে। এই বাক্যটির গতি প্রকৃতি বড়ু চণ্ডিদাস রাধার মানবিক ভাব বিন্যাসিত প্রেম কাহিনীর সাথে বর্ণনা করেছেন।

Leave a Comment