কাজী নজরুল ইসলাম রচিত পালা গানের একটি তালিকা প্রণয়নঃবাল্য বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল) দলে যোগ দেন। তার চাচা কাজী বজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের বিশিষ্ট উস্তাদ ছিলেন এবং আরবি, ফার্সি ও উর্দূ ভাষায় তার দখল ছিল। এছাড়া বজলে করিম মিশ্র ভাষায় গান রচনা করতেন।
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত পালা গানের একটি তালিকা প্রণয়ন । নজরুলের ভাবনা
ধারণা করা হয়, বজলে করিমের প্রভাবেই নজরুল লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন। এছাড়া ঐ অঞ্চলের জনপ্রিয় লেটো কবি শেখ চকোর (গোদা কবি) এবং কবিয়া বাসুদেবের লেটো ও কবিগানের আসরে নজরুল নিয়মিত অংশ নিতেন। লেটো দলেই সাহিত্য চর্চা শুরু হয়।
এই দলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতেন, তাদের সাথে অভিনয় শিখতেন এবং তাদের নাটকের জন্য গান ও কবিতা লিখতেন। নিজ কর্ম এবং অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বাংলা এবং সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করেন। একইসাথে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অর্থাৎ পুরাণসমূহ অধ্যয়ন করতে থাকেন। সেই অল্প বয়সেই তার নাট্যদলের জন্য বেশকিছু লোকসঙ্গীত রচনা করেন।
লেটোদলে কাজী নজরুলের অবস্থানের ফলে নজরুলের পালাগান রচনার করবার ক্ষেত্রটি বেশ পরিপক্কতা অর্জন করে। পালাগানের বৈশিষ্ট্য এবং গীতিশৈলীর দিক দিয়ে নজরুল রচিত পালাগান বিষয়ভিত্তিক উপাখ্যান মাত্র।
লেটো প্রকৃতপক্ষে গ্রামীণ যাত্রাপালারই একটি জনপ্রিয় আঙ্গিক। লেটোর দলে পরিবেশিত পালার মধ্যে ‘সঙ’ এবং ‘প্রহসন’ও ছিল। নজরুল রচিত লেটো-যাত্রাপালা হলো –
১. চাষার সঙ
২. শুকনি বধ
৩. মেঘনাদ বধ
৪. আকবর বাদশাহ
৫. রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ
৬. দাতাকর্ণ
৭. কবি কালিদাস
৮. বিদ্যাভুতুম
৯. রাজপুত্রের সঙ
১০. ঠগপুরের সঙ
১১. বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো
১২. সতী
১৩. হরিদাসী মেথরানী
যাত্রাধর্মী এই লোক-অভিনয়কলার পালাকার হিসেবে নজরুলের অবদান জানা গেলেও সকল লেটো-পালার পূর্ণাঙ্গ লেখ্যরূপ খুঁজে পাওয়া যায় না।
সমপ্রতি কিছু পালা খুঁজে পাওয়া গেছে, যা নজরুলের রচনা বলে অনুমান করা হচ্ছে। লেটো-যাত্রার শুরু হয় সখীদের আসর-বন্দনার মাধ্যমে। তারপর ‘বাই’ নাচ। এই ‘বাই’ নাচের গানও লিখেছেন কাজী নজরুল। এই গান একাধিক লেটো-পালায় গীত হয়। এই শ্রেণির একটি গান বর্ধমান এলাকা থেকে উদ্ধার করেছেন পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতি-গবেষক মহম্মদ আয়ুব হোসেন। গানটি এমন:
সে কেন আমারে মজাইল সই।
আমি যে তার বিয়ে করা বৌ যে না হই।
আমি লো সই পর নারী
আমি থাকি পরের বাড়ি
বাঁশির সুরে সে কে ডাকে মোরে সই।
লেটো-শিল্পীদের বরাত দিয়ে গবেষক জানিয়েছেন যে, এটি নজরুলের বয়ঃসন্ধিকালের রচনা।১ এছাড়া আসর-বন্দনার পরে বিচিত্র সাজের পুরুষের একক কণ্ঠের ধুয়াগানও নজরুল রচনা করেছিলেন। লেটো-শিল্পীদের ধারণা – ‘আমি করবো না আর বিয়ে’ গানটি নজরুলের।২ নজরুল যে অসংখ্য লেটো-পালা রচনা করেছেন – তা নিয়ে দ্বিমত নেই। সমপ্রতি ‘হরিদাসী মেথরানী’ নামের একটি প্রায়-পূর্ণাঙ্গ পালা উদ্ধার করা হয়েছে। মহম্মদ আয়ুব হোসেন মনে করেন, এটি নজরুলের লেটো-জীবনের শেষের দিকের রচনা। এটি বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার কেতুগ্রাম থানার খাসপুর গ্রামের প্রবীণ লেটো-শিল্পী কাজী আবদুস সুকুরের কণ্ঠ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। পালাটি এতদিন মুখে-মুখে প্রচলিত ছিল।৩ প্রায় ২১ পৃষ্ঠা দীর্ঘ পালায় ৯টি একক গান এবং ১টি হাস্যাত্মক ডুয়েট গান রয়েছে। প্রধান লেটো-শিল্পীদের বরাত দিয়ে মুহম্মদ আয়ুব হোসেন জানিয়েছেন যে, ‘বৌ-এর বিয়ে’, ‘আজব বিয়ে’ এবং ‘জেলে-জেলেনী’ পালাও কাজী নজরুল ইসলামের রচনা। কিন্তু এ বিষয়ে নিঃসংশয় হওয়ার উপায় নেই।
আরও দেখুনঃ