বাংলা গানের জগতে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য নাম। তিনি শুধু একজন কবি নন, তিনি ছিলেন এক অসামান্য সঙ্গীতকার, সুরস্রষ্টা ও কণ্ঠশিল্পী। তাঁর গানের ভাণ্ডারে যেমন দেশাত্মবোধ, প্রেম, প্রকৃতি ও মানবতার কথা আছে, তেমনি রয়েছে গভীর ধর্মীয় অনুভূতিও।
নজরুল ছিলেন বহুমুখী চিন্তার মানুষ — তিনি হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের ভাবধারাকেই সমানভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাঁর সৃষ্ট গানে যেমন শ্যামা, কৃষ্ণ ও শিব বন্দনা আছে, তেমনি আছে নবী মুহাম্মদ (সা.) ও ইসলামী আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তির প্রকাশ।
নজরুলের রচিত ইসলামী গানের সংখ্যা প্রায় ২০০টিরও বেশি, যা তাঁর সঙ্গীতজগতে একটি স্বতন্ত্র ধারা গঠন করেছে। এই গানে তিনি মুসলিম সমাজের আবেগ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আধ্যাত্মিক অনুভূতি, হজ, রমজান, ঈদ, নবীপ্রেম ও মানবতার বার্তা তুলে ধরেছেন। তাঁর ইসলামী গান কেবল ধর্মীয় রচনাই নয়, বরং এগুলো এক গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জাগরণের আহ্বান।

যে কোন ৪টি ইসলামিক গানের পরিচয়
কাজী নজরুলের ইসলামী ভাবনা
কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী গানে মূলত তিনটি ধারা লক্ষ্য করা যায়—
১. আল্লাহ ও নবীর প্রতি ভক্তি প্রকাশ,
২. মানবতার প্রতি ভালোবাসা ও ন্যায়ের আহ্বান,
৩. ইসলামী রীতিনীতি, উৎসব ও ইতিহাসের প্রতিফলন।
তিনি কুরআন ও ইসলামী ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে লিখেছেন এমন সব গান, যা সাধারণ মানুষকে ঈমান, ন্যায়, সহমর্মিতা ও ত্যাগের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।

নজরুল সঙ্গীতে ইসলামী গানের ৪টি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ
১. খুশি লয়ে খোশরোজের
গ্রন্থ: জুলফিকার
প্রকাশকাল: ১৯৩২
প্রকাশনা: পত্রিকা জয়তী
রেকর্ড নং: N-7027
স্বরলিপি: নজরুল স্বরলিপি – ৫ম খণ্ড
শিল্পী: মোহাম্মদ কাশেম
পর্যায়: ইসলামী গান
রাগ: কাফি
তাল: কাহারবা
এই গানটি ইসলামী উৎসব “ঈদ” উপলক্ষে রচিত। “খুশি লয়ে খোশরোজের” গানে নজরুল আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার বার্তা দিয়েছেন। মুসলমানদের পবিত্র ঈদের দিনে মানুষে মানুষে মিলনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গানের কথায় আছে আল্লাহর কৃপা ও দয়ার অনুভব, যা ঈদের আনন্দকে মানবিকতা ও ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করেছে।
২. খোদা এই গরীবের শোন আহ্বান
গ্রন্থ: বনগীতি
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯
পর্যায়: ইসলামী গান
রেকর্ড নং: F.T. 12971
স্বরলিপি: নজরুল স্বরলিপি – ৩য় খণ্ড
শিল্পী: আব্বাস উদ্দীন আহমদ
তাল: কাহারবা
এই গানটি ইসলামি মানবতাবাদের এক অনন্য প্রকাশ। নজরুল এখানে দুঃখী, দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত মানুষের কণ্ঠে আর্ত প্রার্থনা প্রকাশ করেছেন। “খোদা এই গরীবের শোন আহ্বান” গানে কবি দেখিয়েছেন — আল্লাহর দরবারে ধনী-গরীবের ভেদ নেই; আল্লাহ সকলের প্রার্থনাই সমানভাবে গ্রহণ করেন।
গানটির সুর মরমি ও অনুনয়পূর্ণ, তাল ও গতি ধীর অথচ আবেগে পূর্ণ। এটি একদিকে সমাজসচেতনতা, অন্যদিকে আধ্যাত্মিক অনুভবের প্রতিফলন।
৩. চলরে কাবার জিয়ারতে
গ্রন্থ: নজরুল গীতি
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর, ১৯৩৬
রেকর্ড নং: F.T. 4571
শিল্পী: আব্বাস উদ্দীন আহমদ
পর্যায়: ইসলামী গান
তাল: কাহারবা
স্বরলিপি: নজরুল সুর সংকলন
এই গানটি ইসলামী তীর্থযাত্রা “হজ”-এর আবেগ ও পবিত্রতার প্রতিচ্ছবি।
গানে কবি আহ্বান জানিয়েছেন—“চলরে কাবার জিয়ারতে”—অর্থাৎ চল আল্লাহর ঘরে, পাপমুক্ত হতে, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে। এটি শুধু ধর্মীয় আহ্বান নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও ঈমানের পথে আহ্বান।
এই গানে আরবি শব্দের সংমিশ্রণ, তালের জোর ও সুরের গতিময়তা একে এক আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতীক করেছে।
৪. জরীন হরফে লেখা
গ্রন্থ: অখণ্ড নজরুল গীতি
প্রকাশকাল: মার্চ, ১৯৩৯
রেকর্ড নং: F.T. 12737
শিল্পী: আব্বাস উদ্দীন আহমদ
পর্যায়: ইসলামী গান
তাল: দাদরা
এই গানটি ইসলামি ঐতিহ্য, জ্ঞানের মহিমা ও পবিত্র কুরআনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। “জরীন হরফে লেখা” — অর্থাৎ সোনালী অক্ষরে লেখা আল্লাহর বাণী, যা মানুষের জীবন আলোকিত করে।
নজরুল এই গানে আল্লাহর কিতাবের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন এবং মানুষকে ন্যায় ও সত্যের পথে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
দাদরা তাল ও কোমল সুরে পরিবেশিত এই গান শ্রোতার মনে গভীর শান্তি ও শ্রদ্ধার সঞ্চার করে।
ইসলামী গানে নজরুলের অবদান ও প্রভাব
কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী গানে ধর্মীয় ঐক্য, মানবতা, সামাজিক ন্যায় ও ভালোবাসা—এই চারটি মূল ভাব সর্বদা বিরাজমান।
তিনি ইসলামী গানের ধারা সৃষ্টি করে মুসলমান সমাজকে আত্মমর্যাদাবোধ ও শিল্পসচেতনতার নতুন দিগন্তে নিয়ে গিয়েছিলেন।
আব্বাস উদ্দীন আহমদের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের মাধ্যমে তাঁর গানে মুসলমান সমাজের নবজাগরণ ঘটে।
নজরুলের ইসলামী গানে আরবি-ফারসি শব্দের স্বাভাবিক ব্যবহার, কাহারবা ও দাদরা তালের সুরধ্বনি, এবং আধ্যাত্মিক অনুরণন — সবই মিলে এক নতুন ধারার সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে, যা আজও বাংলা ইসলামী গানের শিকড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী গান শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং তা মানবতার সর্বজনীন সংগীত। তাঁর গান মুসলমান সমাজে আত্মজাগরণ ঘটিয়েছে এবং ধর্মকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের আলোয় ব্যাখ্যা করেছে।
তাঁর ইসলামী সঙ্গীত আজও রমজান, ঈদ, মিলাদুন্নবী বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় — কারণ নজরুলের গান কেবল ধর্ম নয়, তা এক অনন্ত শান্তির আহ্বান, এক আলোকিত মানবতার সংগীত।

