হারামনি অনুষ্ঠানগুলিতে গীত গানগুলোর সুরের উৎস ও রাগ

হারামনি অনুষ্ঠানগুলিতে গীত গানগুলোর সুরের উৎস নিয়ে আজকের আলোচনা। সকল নজরুলগীতি ১০টি ভাগে বিভাজ্য। এগুলো হলোঃ ভক্তিমূলক গান, প্রণয়গীতি, প্রকৃতি বন্দনা, দেশাত্মবোধক গান, রাগপ্রধান গান, হাসির গান, ব্যাঙ্গাত্মক গান, সমবেত সঙ্গীত, রণ সঙ্গীত এবং, বিদেশীসুরাশ্রিত গান।

 

হারামনি অনুষ্ঠানগুলিতে গীত গানগুলোর সুরের উৎস

 

হারামনি অনুষ্ঠানগুলিতে গীত গানগুলোর সুরের উৎস

হারামণির অনুষ্ঠানগুলিতে গীত গানগুলির সুরের উৎস নিম্নে আলোচনা করা হলো।

১. রাগ আহির ভৈরব :

‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী’ গানটির সুর গীতা বসুর রেকর্ড হিসাবে বর্তমানে প্রচলিত সুরটি ঠিকই আছে। সামান্য গায়কীর পার্থক্য থাকলেও সেটি ধর্তব্য নয়।

২. রাগ আনন্দ ভৈবর :

জয় আনন্দ ভৈরব’ গানটির সুর লুপ্ত হতে বসেছিল। গীতা বসুর রেকর্ড থাকবার কারণে লুপ্ত হওয়ার হাত থেকে সুরটি রক্ষা পেয়েছে ।

৩. রাগ বসন্ত মুখারী :

‘বসন্ত মুখর আজি’ গানটির সুরের একটি স্বরলিপি, স্বরলিপি গ্রন্থে প্রথম প্রকাশ করেন কাজী অনিরুদ্ধ। কিন্তু সুরটির প্রমাণ্যতা সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ১৩.৫৯ সংখ্যার বেতার জগতে গানটির (রম্যগীতি হিসাবে উল্লেখিত) একটি স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছিল।

ঐ স্বরলিপিতে সুরকার হিসাবে শৈলেশ দত্তগুপ্তের নাম রয়েছে। কাজী অনিরুদ্ধের স্বরলিপি, বেতার জগতের ঐ স্বরলিপিটির হুবহু অনুকরণে রচিত। সুরতাং কাজী অনিরুদ্ধের স্বরলিপি ধৃত সুর শৈলেশ দত্তগুপ্তের সুরের ভিত্তিতে সঠিক বলা যেতে পারে। আর শৈলেশ দত্তগুপ্ত যদি নজরুলের সুর নিজের নামে প্রকাশ করেন, তাহলে সব ঠিকই আছে ধরতে হবে। গানটি ১৯৫৯ মার্চ মাসের প্রতি মঙ্গলবার রাত্রি ১০টায় আকাশবানী কলিকাতা থেকে রম্য গীতি অনুষ্ঠানে প্রচারিত হত।

 

হারামনি অনুষ্ঠানগুলিতে গীত গানগুলোর সুরের উৎস

 

৪. রাগ সৌরাষ্টে ভৈরব:

‘মদালস ময়ূর বীণা কার বাজে’ গানটির সুর প্রথমে পাই বরদাগুপ্তের। গীতা বসুর কাছে একই সুরে গানটি শোনার ফলে নিশ্চিত যে, সুরটি সঠিক। এই সুরের স্বরলিপি ‘নজরুল স্বরলিপি’ দশম খণ্ডে (হরফ) রয়েছে।

৫. রাগ বিরাট ভৈরব :

‘জাগো বিরাট ভৈরব যোগ সমাধি মগ্ন’ গানটির বাণী ও সুর উভয়ই গীতা বসুর রেকর্ড আছে। ফলে গানটি অবলুপ্তির কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে।

৬. রাগ শিবমত ভৈরব :

‘আধার ভীত এ চিত’ গানটি এইচ, এম, ডি থেকে ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। রেকর্ড নং এইচ, টি, ৭৬ বাংলার ছেলেমেয়ে। রেকর্ডে শিল্পীবৃন্দের মধ্যে সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় ছিলেন। জগতঘটককৃত স্বরলিপি গ্রন্থ *বেনুকা’ তে এর স্বরলিপি রয়েছে।

৭. রাগ বাঙাল ভৈরব :

‘নৃত্যকালী শঙ্কর সঙ্গে’ গানটির সুর বরদা গুপ্তের রেকর্ড রয়েছে। তিনি পেয়েছিলেন যন্ত্রীসংঘের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্র লাল দাসের নিকট (যাকে তিনি ঠাকুর্দা বলে ডাকতেন)। এই সুরের স্বরলিপি আমার কৃত ‘নজরুল স্বরলিপি, দশম খণ্ড (হরফ) স্বরলিপি গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত।

৮. রাগ ধানেশ্রী (ভৈরব ঠাট):

‘সন্ধ্যা মালতী যবে ফুলবনে ঝুরে’ গানটির স্বরলিপি প্রথম প্রকাশিত হয় ভারতবর্ষ পত্রিকার মাঘ, ১৩৪৫ সংখ্যায়; স্বরলিপিকার ছিলেন যথারীতি জগতঘটক। পরে তাঁর স্বরলিপি গ্রন্থ ‘বেনুকা’য় স্বরলিপিটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র গানটির রেকর্ড করেছিলেন ১৯৪৪ সালে অর্থাৎ নজরুল যখন সুস্থ ছিলেন না। এই গানটিকে কল্পতরু সেনগুপ্ত তাঁর সম্পাদিত ‘নজরুল গীতি অন্বেষা” পুস্তকে ‘সন্ধ্যামালতী’ রাগে রচিত বলে জানিয়েছিলেন (পূর্বাভাষ)। এই বইটি পদে পদে বিভ্রান্তিকর তথ্যে পরিপূর্ণ। ‘সন্ধ্যামালতী’ রাগে রচিত গানটি স্বতন্ত্রে গান (শোন ও সন্ধ্যামালতী)।

 

হারামনি অনুষ্ঠানগুলিতে গীত গানগুলোর সুরের উৎস

 

৯. রাগ প্রতাপবরালী:

‘নিশিরাতে রিম ঝিম্ ঝিম বাদল নূপুর’ গানটি শ্রীতমী রাধারানী কলম্বিয়া থেকে ১৯৪০ সালের আগস্ট মাসে রেকর্ড করেছিলেন (জি. ই. ২৫৫১)। গানটির স্বরলিপি, নজরুল স্বরলিপি, পঞ্চম খণ্ড (হরফ) গ্রন্থে রয়েছে।

১০. রাগ পঠমঞ্জরী:

‘আমি পথ মঞ্জরী ফুটেছি আধার রাতে গানটির স্বরলিপি জাঘটক, ভারতবর্ষ পত্রিকার ভাদ্র, ১৩৪৫ সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলেন। তার আগে গানটির রেকর্ড ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ণজ্যোতি ভট্টাচার্য দ্বারা গীত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

১১. রাগ রামদাসী মল্লার:

‘কার ঝর ঝর বর্ষণ বাণী’ গানটির রেকর্ড কুমারী গীতা বসু ও ধীরেন দাস কর্তৃক গীত হয়ে ১৯৩৫ সালের আগস্ট মাসে টুইন কোম্পানী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

১২. রাগ নৌরোচকা:

‘বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে’ গানটির সুরে কোন প্রামাণ্য উৎস নেই। কাজী অনিরুদ্ধ কৃত স্বরলিপির সুরটিই এখন প্রচলিত। কিন্তু এই সুরের কোন ভিত্তি নেই। তিনি গানটিকে ‘গজল’ অঙ্গের ধরে নিয়ে সেইমত সুর করেছেন। “নভরোচিকা”ই অপভ্রংশে নৌরোচকা। অপ্রকাশিত নজরুল প্রথম খণ্ড (হরফ) গ্রন্থে নজরুলের হস্তলিপিতে বেলাবল ঠাটের অন্তর্ভুক্ত রাগসমূহের মধ্যে এর পরিচয় দেওয়া আছে।

মধ্য সপ্তক ও মন্ত্র সপ্তকে এর বিচরণ বেশি। পারস্য দেশ হতে আগত এই রাগটিকে এ কারণে নজরুল ‘ইরানের স্বপ্ন’ অনুষ্ঠানেও ব্যবহার করেছিলেন। গানটির মধ্যে এজন্য ‘তরুণ ইরান কবি শব্দগুলি প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রচলিত স্বরলিপির সুরে ক্ষ-ধ-ন-র্স ও ‘হ্ম-গ-র-স; এই স্বরমালিকা বার বার রয়েছে যা নভরোচিকা বা নৌরোচকা রাগে ব্যবহার করা যায় না। গীতা বসুর সুরটি নৌরোচকা রাগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ।

 

হারামনি অনুষ্ঠানগুলিতে গীত গানগুলোর সুরের উৎস

 

১৩. রাগ রক্তহংস সারং:

‘বল রাঙা হংসদূতী তার বারতা’ গানটির স্বরলিপি জগৎ ঘটককৃত নবরাগ’ স্বরলিপি গ্রন্থে রয়েছে। যদিও বেতারে হারামণি অনুষ্ঠানে সহযোগী ছিলেন সুরেশ চক্রবর্তী, তথাপি এই রাগটির ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, উভয়ের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। সুরেশ চক্রবর্তী তাঁর ‘রাগ রূপায়ন’ গ্রন্থে এই রাগে কোমল নিষাদের প্রয়োগ দেখিয়েছেন; অন্যদিকে নজরুল তার বদলে শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহার করেছেন। কোমল নিষাদযুক্ত ‘রক্তহংস সারং’ই প্রচলিত। নজরুল শুদ্ধ নিষাদ যুক্ত বিলাবল ঠাটের ‘রক্তহংস সারং’ কোন্ সূত্র থেকে সংগ্রহ করেছেন তা বলা মুস্কিল। মনে হয়, কাদের বক্সের কোন বন্দিশ থেকে তিনি পেয়ে থাকতে পারেন।

১৪. রাগ বসন্ত পঞ্চম:

‘বসন্ত এল এল এল রে’ গানটি সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় টুইন কোম্পানী হতে রেকর্ড করেছিলেন (এফ.টি. ৪৮৩২) হারামনি অনুষ্ঠানে রেকর্ডের সুরটির কিছু পরিবর্তন করেছিলেন অর্থাৎ ‘বসন্ত’ রাগের মিশ্রন ঘটিয়েছিলেন। রেকর্ডের সুরটি ছিল ‘পঞ্চম’ রাগে ।

১৫. রাগ নীলাম্বরী:

‘নীলাম্বরী শাড়ি পরি নীল যমুনায়’ গানটির সুরের প্রামান্য উৎস নেই। গানটি হারামনি অনুষ্ঠানে প্রচারিত হবার আগে ৩.১২.৪০ তারিখে ‘কাবেরী তীরে’ অনুষ্ঠানে ও তারও আগে ৫ ১২.৩৯ তারিখে ‘হরপ্রিয়া’ অনুষ্ঠানে গীত হয়েছিল। ‘কাবেরী তীরে’ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন বিমলভূষণ। হরপ্রিয়া অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন শৈল দেবী।

১৯৪৩ সালের জুন মাসে এইচ, এ, ডি থেকে ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র গানটির রেকর্ড করেন (এন ২৭৩৭৮)। এই রেকর্ডের সুরটি যে প্রামাণ্য তার সমর্থন পাই বিমলভূষণের বক্তব্য হতে। বিমলভূষণ জানিয়েছেন কিছু গায়কীর পার্থক্য ছাড়া সুরটি মোটামুটি সঠিক। তিনি আরও জানিয়েছেন যে তিনি গানটি যেভাবে শিখেছিলেন তাতে তেহাই দিয়ে শুরু ছিল।

 

google news logo

 

১৬. রাগ হর্ষনকানাড়া:

‘ছেড়ে দাও মোরে আর হাত ধরে রাখিও না’ গানটি এইচ. এম. ভি থেকে ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিতাই ঘটকের সুরে রেকর্ড করেছিলেন সত্য চৌধুরী (এন ৩১০৭৭)। হাল্কাসুরের এই আধুনিক গানটিই প্রচলিত। এ গানটি যে হর্যকানাড়া রাগে রচিত সে তথ্য জানিয়েছেন জগতঘটক, তাঁর একটি প্রবন্ধে (চন্দননগর সংস্কৃতি সম্মেলন, ১৯৭২ স্মারক পত্রিকা)। প্রবন্ধটিতে তিনি প্রথম চরণের স্বরলিপি প্রকাশ করেছিলেন।

প্রবর্তক আশ্রম পরিচালিত এই সংস্কৃতি সম্মেলনের স্মারক পত্রিকায় প্রবন্ধটির নাম ছিল ‘সঙ্গীতমগ্ন নজরুলের সাহচর্য। এই প্রবন্ধে গানটির যে বাণী তিনি উদ্ধৃত করেছেন, তাতে দেখা যায় যে প্রচলিত বাণীর সাথে কোন কোন অংশে তার পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যগুলি এরূপ,

রেকর্ডের বাণী জগৎঘটক

১. যারে হৃদয়ে দিলে না ঠাঁই তার তরে কাঁদিও না দিলে না ঠাঁই তার তরে আঁখি জলে ঝুরিও না।

২. পিছু ডাকে আর ফিরায়ো না তুমি তারে। ফিরাতে চেয়ো না তারে।

সুতরাং রেকর্ডে গানটির সুর ও বাণী উভয়ই বিকৃত হয়েছে।

Leave a Comment