ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও কাজী নজরুল । নজরুলের ভাবনা

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও কাজী নজরুল : কবি নজরুল যে স্বপ্ন দেখেছেন সেটা শুধু তাঁর নিজের স্বপ্ন নয়-সমগ্র বাঙালি জাতির স্বপ্ন” প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, নজরুল সভায় সম্বর্ধনার জবাবে এক জায়গায় বলেছিলেন : “আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তাঁর চোখে চোখভরা জলও দেখেছি।

শ্মশানের পথে, গোরস্থানের পথে তাঁকে ক্ষুধা-দীর্ণ মূর্তিতে, ব্যথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি। যুদ্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি, কারাগারের অন্ধকূপে তাঁকে দেখেছি, ফাঁসির মঞ্চে তাঁকে দেখেছি। আমার গান সেই সুন্দরকে রূপে রূপে অনুরূপ করে দেখার স্তব-স্তুতি” বস্তুত এখানেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য।

 

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও কাজী নজরুল

 

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও কাজী নজরুল । নজরুলের ভাবনা

নজরুল সম্পর্কে এ-পর্যায়ে আমার কথা হচ্ছে এই যে, পরাধীন ভারতে ইংরেজ শাসনের অত্যাচার যখন প্রতিকারহীন এবং নিপীড়ন সীমাহীন তখনও বাংলার তথা ভারতবাসীর হৃদ্-তন্ত্রীতে মিহিসুরের স্নিগ্ধ কোমল আবেশ বাঙালি জাতিকে তথা ভারতবাসীকে মোহচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, সেই ভারতের স্নিগ্ধশ্যাম কোলে বাংলার বুকে রুদ্রের মূর্তিতে অগ্নিবীনা হাতে হলো নজরুলের আবির্ভাব।

বিদেশী বণিক শাসকের প্রায় দু’শ বছরের নির্মম অত্যাচারে জর্জরিত ভারববাসীর শৃঙ্খলিত প্রাণের ফরিয়াদ এবং বন্দি আত্মার আর্তনাদ বিশাল ভারতের আকাশ-বাতাসকে যখন বিষিয়ে তুলেছে, সেই দুর্যোগের দিনে বিষজ্বালা বুকে “বিষের বাঁশি” হতে এলেন নজরুল; ধূমকেতুর মতন তাঁর আকস্মিক আগমন-অসাড়, নিষ্পন্দ, মৃতপ্রায় জাতির বুকে এনে দিল ঝঞ্ঝার বেগ। সন্বিতহারা অসহায় জাতির মর্মবেদনায় ব্যথিত ক্ষিপ্ত সেই বিদ্রোহী কণ্ঠে ধ্বনিত হ’ল :

বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমার নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির।
বল বীর- বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলকে ভেদিয়া খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাতৃর ।

 

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও কাজী নজরুল

 

ঝর্ণাধারার মতো ছন্দ-মাতাল অপূর্ব সেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পরাধীন জাতির সুপ্ত বুকে নব জাগরণের বহ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত করে দিল। ‘অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’ বুকে নিয়ে এবং রক্তিম দুটি ডাগর চোখে উদ্ধত উলঙ্গ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বিস্তার করে ব্রিটিশসিংহের প্রতি উপেক্ষার কটাক্ষ হেনে কবির কণ্ঠে ভাঙার গান ধ্বনিত হ’ল :

কারার ঐ লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট
রক্ত জমাট
শিকল-পূজোর পাষাণ-বেদী।

স্বাধীনতা তাঁর কাছে এতই সুমহান, এত বড় মূল্যবান জিনিস ছিল যে আজাদীহীন মানুষকে তিনি অভিশপ্ত, বিকলাঙ্গ, পঙ্গু বলে মনে করতেন। এবং সেজন্য তিনি তাঁর কাব্যের অমরত্ব পর্যন্ত বিসর্জন দিতে কুণ্ঠিত ছিলেন না।

 

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও কাজী নজরুল

 

বন্ধুগো! আর বলিতে পারি না, বড় বিষজ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাহা যাহা আসে কই মুখে!
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা, তাই লিখে যাই এ রক্তলেখা
বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু যাহারা আছে সুখে!

উল্লেখিত পংক্তিই স্মরণ করিয়ে দেবে তাঁর আত্মত্যাগের মহিমাকে।

আমি বলব, ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে খাওয়া নির্মম শাসকের বিরুদ্ধে মসীর সাহায্যে সংগ্রাম ভারতের আর কোনো কবি সাহিত্যিক তাঁর মতো করেনি। এজন্যে ভারতের অধিবাসী তার কাছে শাশ্বসতকাল ঋণী থাকবে। আজ ভারত উপমহাদেশ বিদেশী অধীনতা ছিন্ন করেছে।

 

google news logo

 

স্বাধীনতা পেয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান। আজ তাই স্বাধীন জাতির কর্তব্য হিসেবে মনে হয় সেদিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বোত্তম বীরের মর্যাদা আজাদীর তুর্যবাদক বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকেই দেওয়া উচিত। তা না দিলে আমাদের হৃদয়ের কৃপণতা এবং অকৃতজ্ঞতাই শুধু প্রকাশ পাবে, অন্য কিছু নয়। আর সেদিনের সেই আন্দোলনের প্রতিফলন আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ ।

Leave a Comment