বাংলা গানের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্যসাধারণ গীতিকার ও সুরকার, যিনি তাঁর চার হাজারেরও বেশি গানের মাধ্যমে মানুষের মুক্তি, ভালোবাসা, মানবতা এবং সাম্যবাদের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতা বেতার কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার পর তাঁর সঙ্গীতচর্চায় আসে নতুন মাত্রা। বেতারের জন্য তাঁকে নিয়মিত লিখতে হতো হারামণি, নবরাগমালিকা ও গীতিবিচিত্রার মতো জনপ্রিয় আয়োজনের জন্য গান—যেখানে তিনি বাংলা সঙ্গীতকে রাগ–রাগিণীর নতুন দিগন্তে নিয়ে যান। ‘হারামণি’ অনুষ্ঠানে নজরুল লুপ্তপ্রায় রাগ–রাগিণীর পরিচিতি দিতেন এবং সেই রাগে নতুন গান পরিবেশন করতেন। এজন্য তিনি নবাব আলী চৌধুরীর ‘আরিকুন নাগমাত’ এবং আমীর খসরুর ফারসি রচনার মতো ঐতিহাসিক সঙ্গীতগ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। তাঁর এই জ্ঞানসাধনা শুধু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দক্ষতা বৃদ্ধিই করেনি, বরং সঙ্গীতরূপে তাঁর মানবতাবাদী চিন্তা প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

একটি সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির গানের ভাবার্থ । নজরুলের ভাবনা
নজরুলের গানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান, যা তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবিকতার অন্যতম উজ্জ্বল প্রমাণ। তাঁর মানব–দর্শন ছিল—মানুষই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পরিচয়, ধর্ম বা জাতিভেদ মানুষের মূল পরিচয় নয়। এই চিন্তাধারাই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় তাঁর বিখ্যাত গান “জাতের নামে বজ্জাতি সব”–এ, যা দ্রুত দাদরা তালে রচিত হলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তা গভীর, দার্শনিক ও সমাজ–উদ্বোধনী।

গানটির ভাবার্থ বিশ্লেষণে দেখা যায়, নজরুল জাতিভেদ–প্রথার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন—‘জাত’ মানুষের জন্মগত বা সৃষ্টিগত পরিচয় নয়; এটি সমাজের মনগড়া বিভাজন মাত্র। তিনি জাতীয়তাবাদী কণ্ঠে বলেছেন—মানুষ জাত দানে যোগ্য বা অযোগ্য হয়ে ওঠে না; মানুষের মূল্য নির্ধারণ হয় তার আচরণ, চরিত্র ও মানবতার দ্বারা। গানটির মূল বার্তা হলো: “জাতের নামে যে বিভেদ সৃষ্টি করা হয় তা আসলে মানুষের অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশ—একটি ‘বজ্জাতি’।’’ নজরুল এখানে সমাজকে সতর্ক করেছেন যে জাতি–ধর্মের নামে বিভাজন মানুষের অন্তর্নিহিত ঐক্যকে ধ্বংস করে।

গানে তিনি আরও দার্শনিক সুরে ব্যাখ্যা করেন—সত্যিকারের ধর্ম কখনো ছোঁয়াছুঁয়িতে নষ্ট হয় না, কারণ ধর্মের ভিত্তি মানবতায়, নিষ্ঠায়, সত্যে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা সম্প্রদায়ের নন; তাঁর কোনো জাত–পরিচয় নেই। তাই জগন্নাথ, নারায়ণ কিংবা আল্লাহ—কোনো দেবতাই অশুচি হন না, আর ধর্মকেও অশুচি করা যায় না। অশুচি হতে পারে মানুষের মন, যদি সেখানে বিদ্বেষ, ভেদাভেদ ও সংকীর্ণতা বাসা বাঁধে।
নজরুল মানবজাতিকে আহ্বান করেছেন—জাতিভেদ ভুলে এক পতাকার নিচে দাঁড়ানোর জন্য। তাঁর মতে, মানুষের প্রকৃত শক্তি নিহিত ঐক্যে; বিভাজনে নয়। যখন একটি সমাজ জাতি–ধর্মের সংকীর্ণতা ছাড়িয়ে মানবতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়, তখনই সে দৃঢ়তার সঙ্গে পৃথিবীর বুকে দাঁড়াতে পারে। তাঁর গান তাই শুধু সংগীত নয়; এটি সামাজিক সংস্কার, মানবিক শিক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরকালীন বার্তা।
সব মিলিয়ে, “জাতের নামে বজ্জাতি সব” গানটি নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনবদ্য দলিল। তাঁর কাব্য ও সঙ্গীত আজও আমাদের শেখায়—মানুষের একমাত্র পরিচয় সে মানুষ, আর ঐক্যই একটি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি।
