প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নজরুলসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের অবদান
নজরুলসঙ্গীত বাংলাগানের আধুনিক ধারার একটি ঐতিহ্যগত রূপ। চর্যাপদ হতে আধুনিক পর্যন্ত বাংলাগানের আধুনিক ধারাকে সার্থকরূপে উপস্থাপিত করেছে কাজী নজরুল। নজরুলসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বর্তমানে পালন করছে তার মধ্যে রয়েছে বুলবুল একাডেমী অব ফাইন আর্টস, ছায়ানট, নজরুল একাডেমী, সরকারি সঙ্গীত কলেজ, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি ডেভলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, ঢাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ এবং বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নজরুলসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের অবদান । নজরুলের ভাবনা
আমি নিম্নে বুলবুল একাডেমী অব ফাইন আর্টসের (বাফা) নজরুলসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রটি তুলে ধরেছি মাত্র ।
বুলবুল একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালে যা ৭ নং ওয়াইজঘাট, সদরঘাট, ঢাকা-১১০০-এ অবস্থিত। নজরুলসঙ্গীত বিষয়ে ৪ বৎসরের সার্টিফিকেট কোর্সে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়া হয়। ৪ বৎসর পর সার্টিফিকেট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে।
৪ বৎসরের কোর্সে প্রথম থেকে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক প্রক্রিয়ায় খুব গুরুত্ব দেয়া হয়। এ ৪ বৎসরের তত্ত্বীয় ক্ষেত্রে নজরুলের ব্যবহারিক-জীবন, সঙ্গীত-জীবন, তার সৃষ্ট বিভিন্ন ধারাবাহিকতায় তত্ত্বীয় বিষয় পড়ানো হয় এবং ব্যবহারিক ক্লাসে নজরুলের বিভিন্ন পর্যায়ের গান, যেমন কাব্যগীতি, দেশাত্মবোধক, উদ্দীপনামূলক, কীর্তন, ভজন, ভক্তিমূলক, শ্যামা, সৃষ্টি রাগ, রাগপ্রধান, নজরুল সৃষ্ট রাগ, তালের গান ইত্যাদি শেখানো হয়ে থাকে।
উল্লেখ যে, নজরুলসঙ্গীতের পাশাপাশি ৪ বৎসরেই শাস্ত্রীয়সঙ্গীত আবশ্যিক হিসেবে পড়ানো হয়। যার তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক পরীক্ষা প্রত্যেক বৎসর শিক্ষার্থীকে দিতে হয়। কাজী নজরুলের জন্ম এবং মৃত্যু বার্ষিকী বাফা সব সময়ই পালন করে থাকে। সে হিসাবে বলা যায় নজরুলসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে বুলবুল একাডেমীর অবদান স্মরণযোগ্য।

বর্তমানে বুলবুল একাডেমী ৪টি শাখায় (ওয়াইজঘাট, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও মিরপুর) তাদের এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে যেখানে শিক্ষাদান করছেন এদেশের বরেণ্য নজরুলসঙ্গীত শিল্পীরা। এ ছাড়া নজরুলের গীতিনাট্যগুলো বাফার নৃত্যবিভাগ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করে থাকেন।
নজরুলসঙ্গীতের সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষার ক্ষেত্রে বুলবুল একাডেমী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বাফা থেকে যারা পাশ করে বের হচ্ছেন তারাও নজরুলসঙ্গীতের শুদ্ধতা প্রশ্নে সর্বদা সতর্ক থাকেন। সুতরাং বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রতিষ্ঠানিক নজরুলসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে বুলবুল একাডেমীর অবদান অপরিসীম এবং নান্দনিক।
সংজ্ঞা লিখ :
কাব্যগীতি :
যে গানের বাণী এবং সুর সমপ্রাধান্য ভাস্বর তাকে কাব্যগীতি বলে। উদাহরণ : আরো কতদিন বাকি।
বিদেশী সুরের গান :
মধ্যপ্রাচ্যের সুরের আধারে কবি যে গানগুলো রচনা করেছেন তাকে বিদেশী সুরের গান বলা হয় । যেমন : রুমঝুম ঝুমঝুম ঝুমরুমঝুম
লোকসঙ্গীত :
প্রকৃতির অকৃপণ মানুষের মনের কথায় রচিত গীতরীতিকে লোকসঙ্গীত বলে। যাতে রয়েছে পল্লীগ্রামের আঞ্চলিক সুর বৈভব সমৃদ্ধ মানুষের মনের কথা। উদাহরণ : কাণ্ডারীগো কর কর
ভজন :
ঈশ্বর ভজনার উদ্দেশ্যে মানবমনের সুরারোপীত বাণী যা তাল সংযুক্ত তাকে ভজন বলে। উদাহরণ : অন্তরে তুমি আছ চিরদিন

ভক্তিগীতি :
ভক্তমনের ভক্তি উৎসর্গকৃত ভাষা, রসাত্মক সুর যা ভক্তমনকে এক অপার্থিব জগতের সন্ধান দেয় তাকে ভক্তিগীতি বলে। উদাহরণ : মধুর আরতি তব বিশ্ব সভাতে ৷
ইসলামিক গান :
ইসলাম ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে রচিত গীতরীতিকে ইসলামিক গান বলে ৷
শ্যামা সঙ্গীত :
কালি বিষয়ক ভক্তিমূলক গানকে শ্যামা সঙ্গীত বলে । উদাহরণ : আমার হাতে কালি
হামদ :
আল্লাহর গুনাবলি বর্ণনায় রচিত গীতিরীতিকে হামদ বলে। উদাহরণ : আল্লাহকে যে পাইতে চায়
নাত :
নবীদের গুনাবলি বর্ণনা রচিত গীতরীতিকে নাত বলে। উদাহরণ : মোহাম্মদ নাম যতই
কাজরী :
উত্তর প্রদেশের অন্যতম লোকসঙ্গীত কাজরী বা কাজলী। এই গানের বিষয়বস্তুতে প্রধানত পাওয়া যায় রাধাকৃষ্ণের লীলা, বর্ষাঋতু এবং বিরহের বর্ণনা। উদাহরণ : শাওন আসিল ফিরে।
খেয়াল :
নানাবিধ তানবিস্তার ইত্যাদি দ্বারা বিভিন্ন তালে রাগ গায়নকে খেয়াল বলে। উদাহরণ : এসো প্রিয় আরো কাছে ।
ভাওয়াইয়া :
উত্তরবঙ্গের রংপুর, দিনাজপুর, কুচবিহার প্রভৃতি অঞ্চলের গান হচ্ছে ভাওয়াইয়া মূলত উত্তর বাংলার ভাওয়াইয়া সম্প্রদায় কর্তৃক গীত হবার কারণে এ গানকে ভাওয়াইয়া গান বলে ।
রাগপ্রধান :
রাগাশ্রয়ী কাব্যগীতিকে রাগপ্রধান গান বলে ।

গজল :
গজল শব্দটি আরবীয়। এর বিষয় হচ্ছে প্রণয় বিষয়ক কবিতা ।
কীর্তন :
শ্রী চৈতন্যদেবকে কীর্তনগানের প্রবর্তক বলা হয়। যে গানের আধারে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন বিষয় সংযুক্ত তাকে কীর্তন বলা হয়। অর্থাৎ কীর্তন হলো বহু তন্ত্রী, বহুবল্লভ, বহু ঝংকার, বহু ছন্দিত এক প্রকার গীতরীতি ।
ঝুমুর :
পশ্চিমবঙ্গের সন্নিহিত ছোটনাগপুরের পূর্ব সীমান্তবর্তী অঞ্চলের যে লৌকিকপদাবলী বৈষ্ণব মহাজন পদাবলীর অনুকরণে গেয়ে থাকেন। সেই বিশেষ শ্রেণীর গানগুলো সাধারণভাবে ঝুমুর নামে পরিচিত।
উদ্দীপনামূলক গান :
বিদ্রোহী ভাবকে প্রাধান্য দিয়ে পরাধনিতার শৃঙ্খল হতে মুক্তির লক্ষ্যে রচিত গীতরীতিকে উদ্দীপনামূলক গান বলে। যাতে দেশবন্ধনা ও শ্রেণী সংগ্রামের বাণী লক্ষ করা যায়।
ভাটিয়ালি :
বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম লোকগীতির নাম ভাটিয়ালি । ভাটিয়ালির গীতিশৈলী পরিপূর্ণভাবে প্রাণবন্ত ।
গম্ভীরা :
গজল গানের মতো গম্ভীরা গানকেও এক ধরনের শীবসঙ্গীত বলা চলে ।
বাউল :
বাংলার বিশেষ এক ধর্মমতাবলম্বীদের বলা হয় বাউল। যা বাংলার অন্যতম একটি লৌকিক ধর্ম ।
মর্সিয়া :
কারবালা প্রান্তরের শোকগীতিকে মর্সিয়া পর্যায়ের গান বলে।
ধ্রুপদ :
ধ্রুপদ হতে ধ্রুপদ শব্দটির উৎপত্তি। ধ্রুপদকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান দেয়া হয়। গোয়ালিয়বের রাজা মানসিংহ তোমারকে ধ্রুপদের স্রষ্টা মানা হয় ।
ঠুমরী :
যে সকল গান টপ্পার রাগনীতে এবং আদ্ধা ও ঠুমরী তালে গীত হয় তখন তাকে ঠুমরী বলে। খেয়ালের মতো ঠুমরী রাগের যথাযথ নিয়ম মেনে চলে না। এখানেই ঠুমরী মহিয়সী।
টপ্পা :
ধ্রুপদ ও খেয়াল অপেক্ষা যে গান সংক্ষেপতর তাকে টপ্পা গান বলে। টপ্পা গানে দুটি বিভাগ থাকে স্থায়ী এবং অন্তরা এবং বাণী নিতান্তই অল্প ।
তারানা :
যে গান অর্থবিহীন বোল সংযোগে গাওয়া হয় তাকে তারানা বলে। খুব দ্রুতলায় এ গান গাওয়া হয় ।
ঋতুভিত্তিক গান :
৬টি ঋতুর প্রকৃতিগত যে গান রচিত তাকে ঋতুভিত্তিক গান বলে। এ বর্ণনায় পর্যায়ের গান রচনায় পঞ্চ-গীতি কবি অন্যতম। শুদ্ধরাগের গান : যে গান ১টি রাগের রূপরেখায় রচিত তাকে শুদ্ধরাগের গান বলে ৷
শালংক রাগের গান :
দুটি রাগের সমন্বয়ে যে গান রচিত তাকে শালংক শ্রেণীর গান বলে ।
সংকীর্ণ রাগের গান :
যে গান দুই বা ততোধিক রাগের মিশ্রণে রচিত তাকে সংকীর্ণ শ্রেণীর রাগের গান বলে।
সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির গান :
যে গানের বাণী অসাম্প্রদায়ীকতা আহ্বান করে এবং বন্ধন করে সম্প্রীতির তাকাতলে তাকে সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির গান বলে।
দেশাত্মবোধ গান :
দেশের প্রতি ভালোবাসা, মমত্ববোধ এবং প্রকৃতিগত বর্ণনায় রচিত গীতিরীতিকে দেশাত্মবোধক গান বলে ।
নারী জাগরণের গান :
সমগ্র নারী জাতিকে জাগ্রত করার লক্ষ্যে সুর সংযোজিত বাণীর বাহ্যিক প্রকাশকে নারী জাগরণের গান বলে। যে গানের প্রেরণায় ভারতীয় উপমহাদেশের তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

