নজরুল সঙ্গীতে দক্ষিণী রাগের প্রয়োগ

নজরুল সঙ্গীতে দক্ষিণী রাগের প্রয়োগ নিয়ে আজকের আলোচনা। উত্তর-ভারতীয় ও দক্ষিণ ভারতীয়-এই উভয় সঙ্গীত পদ্ধতির মধ্যে শাস্ত্রীয় রীতি-নীতির পার্থক্য থাকলেও উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির অন্তর্গত খেয়ালীধারার যোগ্য উত্তরসুরী হিসাবে নজরুল তাঁর গানে সুরের বৈচিত্র্যতা মিশিয়ে যেভাবে বাংলাগানকে সমৃদ্ধির শীর্ষে আরোহণ করাতে সমর্থ হয়েছিলেন সেই কৌশলগত রঙ্গার, বৈশিষ্ট্যময় ও মাহাত্মপূর্ণ সুরৈশ্বর্যের স্পর্শজাত গায়কী শৈলীর সাথে কর্ণাটকী সুর ও গায়নরীতির বড় ধরবনের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

 

নজরুল সঙ্গীতে দক্ষিণী রাগের প্রয়োগ 

 

নজরুল সঙ্গীতে দক্ষিণী রাগের প্রয়োগ

এখানে নজরুল- সঙ্গীতে কর্ণাটকী সঙ্গীতের রাগ তথা রাগসুর ও গায়কী যেভাবে প্রয়োগ হয়েছে তার কিছু মৌলিক ও স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা হলো। বৈশিষ্ট্যগুলি যথাক্রমে :-

১. নজরুল- সঙ্গীত খেয়ালীধারাপুষ্ট। পক্ষান্তরে কর্ণাটকী সঙ্গীত ধ্রুপদীয়া ধারাপুষ্ট।

২. কর্ণাটকী সঙ্গীত কমবেশী রক্ষণশীল, শাস্ত্রের কঠিন নিয়মবদ্ধ-যা পরিবর্তন বিমুখ কিন্তু নজরুল-সঙ্গীতে কর্ণাটকী রাগসুর প্রয়োগ হয়েছে উত্তর-ভারতীয় খেয়ালীধারার স্বাধীন সুরবিস্তারের স্বাতন্ত্র্যে।

৩. নজরুল-সঙ্গীতে কর্ণাটকী রাগসুর প্রয়োগ কেবল রাগের নাম ও স্বর পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্যে কিন্তু সেই রাগের স্বর-সঙ্গতি, সুর-শৈলী ও রাগ প্রকাশের ভঙ্গি নির্দিষ্ট হয়েছে উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির স্বাতন্ত্র্যে।

৪. দক্ষিণী রাগে ১২টি স্বরের যে-স্বরূপ, সেই স্বরূপ নিয়ে নজরুল-সঙ্গীতে দক্ষিণী রাগ প্রয়োগ হয়নি।

নজরুল সঙ্গীতে দক্ষিণী রাগের প্রয়োগ

৫. রাগের সাথে দক্ষিণী কোন তাল নজরুল-সঙ্গীতে প্রয়োগ হয়নি। তবে দক্ষিণী তালের লয়-পদ্ধতির সাথে কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

৬. দক্ষিণী রাগ নজরুল-সঙ্গীতে প্রয়োগের ফলে বিকাশের স্বাধীনতা পেয়েছে যা স্বগোত্রে ছিল রক্ষণশীল অবস্থায় ।

৭. তান, আলাপ, বিস্তার, গমক প্রভৃতি অলংকারাদি দ্বারা নজরুল-সঙ্গীত দক্ষিণী রাগের বিকাশ বা স্ফুরণ ঘটেছে উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীতে গায়কীভঙ্গির আদর্শে।

৮. ঊনিশ শতকে উদ্ভূত কর্ণাটকী লঘু-সঙ্গীত ‘জাবলি’ শ্রেণীর গীতধারার সা নজরুল-সঙ্গীতের রচনা ও গায়কীগত বৈশিষ্ট্যের সর্বাধিক সাদৃশ্য আছে।

৯. নজরুল-সঙ্গীতের বাণীভাগের ‘কাব্যিকমূল্য’ কর্ণাটকী রাগের বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্ণাটকী রাগের নাম প্রকাশক শব্দের উপস্থিতি বর্তমান ।

১০. দক্ষিণী রাগ-সুরের উপর অধিকাংশ নজরুল-সঙ্গীত ‘আগে সুর পরে বাণী’-এই আদর্শের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে। বাংলাগানে দক্ষিণী রাগের অনুপ্রবেশে নজরুলের অবদান সবার শীর্ষে। দেশী-বিদেশী রাগ-রাগিনী নিয়ে নজরুলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কর্মকাণ্ডটি ছিল ব্যাপক ও বাস্তবভিত্তিক। ফলে তাঁর গান সুরের বৈচিত্র্যতা প্রকাশে অনন্য ।

 

নজরুল সঙ্গীতে দক্ষিণী রাগের প্রয়োগ 

 

সঙ্গীতময় জীবনে নজরুল তাঁর সৃষ্টিশীল তরীটিকে কখনো একই ঘাটে বেঁধে রাখেননি। চলার পথে সে তরীটিকে তিনি দক্ষিণ-ভারত বিধৌত কাবেরী নদীর তীরেও ভিড়িয়েছেন। সেখান থেকে দক্ষিণী সঙ্গীতের রসদ এনে আমাদের বাংলা- সঙ্গীতকে করেছেন সমৃদ্ধ। সেইসাথে কঠোর নিয়মবদ্ধ রীতি-নীতির নিগড়ে আবদ্ধ কিছু দক্ষিণী রাগকে ছিনিয়ে এনে পদ্মা-মেঘনা-গঙ্গা-যমুনা বিধৌত উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীতধারায় ছেড়ে দিলেন, অবাধ সন্তরণের পথ বাতলিয়ে দিয়ে। তাই দক্ষিণী-রাগ নজরুল-সঙ্গীতে মিশে যেন তার নবজীবন ফিরে পেয়েছে।

 

google news logo

 

যেমন : কাবেরী নদী জলে কে গো বালিকা

রাগ কর্ণাটি-সামন্ত

তাল : ত্রিতাল

গ্রন্থ বুলবুল ২য় খণ্ড।

গীতি আলেখ্য : কাবেরী তীরে।

শিল্পী : সুপ্রভা ঘোষ

প্রকাশকাল: ১৯৪১ রেকর্ড নং : এইচ-৮৭৬।

Leave a Comment