কাজী নজরুল ইসলামের শিয়ারশোলে ফেরা । নজরুলের ভাবনা

কাজী নজরুল ইসলামের শিয়ারশোলে ফেরা : মানবতার অবর্ণীয় দারিদ্র্যতার ছায়াতলে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছে বটে কিন্তু তার বিরল প্রতিভার স্মৃতিবিজাড়িত স্থান বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল: তার-ই একটি নাম ময়মনসিংহ। অবস্থাপন্ন সচ্ছল পরিবারের পাঠার্থীদের মতো ছাত্রজীবন না পেলেও বিচ্ছিন্ন বিদ্যালয় জীবনে নজরুল মেধাবী ও পাঠানুরাগী হিসাবেই চিহ্নিত হয়েছেন।

 

কাজী নজরুল ইসলামের শিয়ারশোলে ফেরা

 

কাজী নজরুল ইসলামের শিয়ারশোলে ফেরা

বাইরের জ্ঞান ছিল অপরিমেয় আরবি- ফরাসি ভাষায় ভালো দক্ষতা ছিল। ইংরেজি, সংস্কৃত ও তথৈবচ। পরীক্ষার ফল বরাবরই ভাল হয়েছে নজরুলের। ডবল প্রমোশন পাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

কাজী নজরুলের জীবনে দারিদ্র্যতার কারণে নজরুল স্কুলের ধাধন কেটে বেরিয়ে পড়েছেন। ময়দা মেখেছেন। রুটি সেঁকেছেন। ফেলে রাখা বাসী কাপড়ের মতো যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু চোখ ভরা কৌতুহল কণ্ঠভরা গান, বুকভরা উৎসাহ সর্বদাই নজরুলকে সকলের কাছে প্রিয় করে তুলতো।

 

কাজী নজরুল ইসলামের শিয়ারশোলে ফেরা

 

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের শেষে ময়মনসিংহ থেকে ফিরে আসার কিছুকালের মধ্যেই শিয়ারশোল রাজস্কুলে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সম্ভবত ১৯১৫ সালের প্রথম দিকের কথা। রাজস্কুলে ভর্তির প্রাথমিক চেষ্টা নজরুলের ব্যর্থ হয়। এরপর নজরুল ২য় বার আবেদন করেন। এবারের আবেদন পত্রটিতে নজরুলের শব্দচয়নতা ও বাক্য সমন্বয়ে খুব নান্দনিকতা প্রদর্শিত হয়।

আবেদনকারীর ভাষাগত মুনসি আনায় সন্তুষ্ট হয়ে প্রধান শিক্ষক নজরুলকে রাজস্কুলে ভর্তি করে দেন। একই সময়ে রাণীগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্র শৈলজানন্দের সাথে নজরুলের সখ্যতা গড়ে ওঠে। রানীগঞ্জ স্কুল জীবনে নজরুলের আর একজন সমপাঠী বন্ধু ছিল শৈলন্দ্রকুমার ঘোষ।

 

কাজী নজরুল ইসলামের শিয়ারশোলে ফেরা

 

শৈলজানন্দ হিন্দু ব্রাহ্মণ, শৈলেন্দ্র ছিলেন খ্রিস্টান। শৈলজা-শৈলেন মুসলমান ব্রাহ্মণ খ্রিস্টানের এই সংস্কারমুক্ত প্রীতি নজরুলের উদার মনের অনুকূল হয়েছিল। রাজবাড়ি থেকে নজরুল মাসিক ৭ টাকার একটি বৃত্তি পেতেন। সেই অর্থেই তাঁর পড়াশুনা নির্বাহ হতো। এই বৃত্তির টাকা দিয়ে মারলা মাঝে মাঝে চুরুলিয়া বাড়িতে ভাই আলী হোসেনকেও টাকা পাঠাতেন।

শিয়ারশোলে রাজস্কুলে পনেরো থেকে সতেরো পেরিয়ে আঠার বয়ঃসন্ধির এই সেরা সময়টি কেটেছিল নজরুলের লেটোর গ্রাম্যসঙ্গীত থেকে সম্ভবত ধীরে ধীরে তার সঙ্গী রচনার ক্ষেত্রটি প্রসারীত হয় প্রণালীবদ্ধ সঙ্গীতে। হয়তো রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাধুর্যে তখন থেকেই তিনি কোনোভাবে আকৃষ্ট হতে থাকেন।

 

কাজী নজরুল ইসলামের শিয়ারশোলে ফেরা

 

নজরুল স্কুল জীবনে যে দুজন সঙ্গীত গুরু পেয়েছেন তাঁদের মতে একজন সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল এবং অন্যজনের নাম হাফিজ নুরুন্নবী। সতীশচন্দ্র কাঞ্চিলালের নিকট নজরুল পেয়েছিলেন নানাসঙ্গীতের স্থান এবং হাফিজ নুরুন্নবীর কাছে নজরুল নেন ফার্সীর তালিম।

স্কুল পরিবেশেই মূলত নজরুলের সাহিত্য চর্চার ভিত্তি স্থাপিত হয়। নজরুল রাজ হাইস্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়াশুনা অবস্থায় ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল এবং ১৩ জুলাই দুজন প্রধান শিক্ষক মৌলবি আবদুল গফুর ও ভোলানাথ কর্মকার বিদায় গ্রহণ করেন।

 

google news logo

 

নজরুল দুজনের বিদায় উপলক্ষে দুটি কবিতা লিখেন-

যেমন করুন গাঁথা
নয়ন গলিয়া বয় তপ্ত অশ্রুনীর
অশ্রু নয়, সে যে ভগ্ন মরম রুবীর।
নয়গো চোখের দেখা হৃদয়ে হৃদয়ে আঁকা
ভিজায়ে সেনেহক্ষীরে ভূষিত সোহাগ ভরে।

ফলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে শিয়ারশোল স্কুলে ফিরে নজরুল শৈশব ও কৈশোরের এটুকুন সময়ের মধ্যে তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

Leave a Comment