বাংলা লোকসঙ্গীত : বাংলা সঙ্গীতের ধারাবাহিকতার প্রাচীনতম নিদর্শন বাংলা লোকসঙ্গীত। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এর শ্রেণীবিন্যাস বাংলা গানকে অলংকৃত করেছে। আঞ্চলিকতার প্রশ্নে বাংলা লোকসঙ্গীতের বিভক্তি করা সম্ভব বলে ধরে নেয়া যায়। যাতে করে প্রাচীতম সঙ্গীত হিসাবে এর বিন্যাস, ব্যাপ্তি লঘু সঙ্গীত হিসাবে বয়ে চলছে।

বাংলা লোকসঙ্গীত । নজরুলের ভাবনা
ইতিহাস পড়লে জানা যায় এদেশের লোকের মুখে মুখে যে গান ঘুরে বেড়ায় যার লিখিত কোনো রূপ নেই, যা বংশ পরম্পরায় গীত হয়ে এসেছে, গীত লেখক বা সুরকারের পরিচয় যেখানে অবলুপ্ত যার গায়কীতে আছে এমন একটি বিশেষ রূপ যা- কে লোকসঙ্গীত বলে। অর্থাৎ নগরের রুঢ় ও যান্ত্রিক সভ্যতার বহুদূরে প্রকৃতির অকৃপণ শ্যামলীমার মধ্য থেকে বেড়ে ওঠা মানব-মানবীর মনের কথায় রচিত গীতরীতিকে লোকসঙ্গীত বলে ।
(১) গীরিশ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বাংলা লোকসঙ্গীত নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন “বাংলা গানের আধুনিক ধারা প্রবাহিত হলেও এর মূল ভিত্তি লোকসঙ্গীত হতে। কারণ চর্যাপদেও লোকসঙ্গীতের প্রভাব সুবিন্যস্ত ।
সঙ্গীতের মাধ্যমে চিরকাল বাঙালি তার সকল চিন্তাধারাকে প্রকাশ করেছে। লোকসঙ্গীতের প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে, এই গান মৌখিকভাবে রচিত হয়ে মৌখিকভাবেই প্রচার লাভ করে। সমাজের মধ্যে এর শিক্ষা বিস্তার লাভ করলেও এই গান লিখে রাখার সংস্কার গড়ে ওঠেনি। প্রবাহমানকালের মধ্য দিয়ে লোক সঙ্গীতের প্রাণ শক্তি রক্ষা পায় ।
লোকসঙ্গীতের আরো একটি বিশেষত্ব এই যে, কোনো দেশেই, কোনো কালেই লোকসঙ্গীতের অনুশীলনের বিধিবোধ্য ব্যবস্থা ছিল না। কীভাবে এই গান রচনা করতে হয়, স্মৃতিপটে রক্ষা করতে হয়, কীভাবে এই গানের সুর আয়ত্ত রকতে হয় তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রণালী নেই। যারা এই গান আয়ত্ব করে থাকেন তারা তাদের স্বভাব দক্ষতার গুণে তা আয়ত্ত করে থাকেন। যে জাতির জীবন যত বিচিত্র সে জাতির লোক সঙ্গীতও বিষয়ের দিক থেকে তত বিচিত্র এবং রসের দিক থেকেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ । বাংলার লোকসঙ্গীত চিরকালই বাংলার সম্মান রক্ষা করেছে। যেমন :

(১) ভাওয়াইয়া :
রংপুর জলপাইগুরী, কুচবিহার অঞ্চলের আঞ্চলিক লোকসঙ্গীত হচ্ছে ভাওয়াইয়া। প্রেমই এই গানের উপজীব্য। সেই সূত্রে এটা আঞ্চলিক সঙ্গীত হওয়া সত্ত্বেও প্রেম সঙ্গীতের অন্তর্ভুক্ত। উত্তর বঙ্গের দূর্গম তড়াই অঞ্চলের শুদ্ধতা এবং দ্রুত প্রবাহিত নদ-নদীর ক্ষীপ্রগতির মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের অধিবাসীর একটি বিশিষ্ট গুণ প্রকাশ পেয়েছে।
এই সঙ্গীত এই অঞ্চলের আঞ্চলিক চরিত্র গুণে অন্তর নিবিষ্ট। প্রকৃতির স্তব্ধতার মধ্য হতে ভাওয়াইয়ার দীর্ঘ টানের জন্ম। এই দীর্ঘ টানের কিংবা চড়া সুর সম্পূর্ণ ভাটিয়ালির মতো নয় ৷
ভাওয়াইয়া গানে দীর্ঘ চড়া সুরের মধ্যে একটি ভাজ আছে। এই ভাজ তাল প্রধান সঙ্গীতের মতো স্পষ্ট নয়। ভাজের ভেতর দিয়েও একটানা চড়া সুরের গতি ব্যবহৃত হয় না।
প্রেম সঙ্গীতের কেবল মাত্র বিরহ বিচ্ছেদের অংশ নিয়েই ভাওয়াইয়া গান রচিত হয়। এমন কি মিলনের মধ্যেও বিচ্ছেদের আশঙ্কা প্রকাশ পায়। বৈষ্ণব কবি যেমন লিখেছেন-
“দুহু কোরে দুহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভরিয়া।”
ভাওয়াইয়া গানের পল্লী কবিগণ তেমনি প্রেমে বিরহই একমাত্র সত্য বলে মনে করে নর-নারীর পার্থিব প্রেমের মধ্যে স্বর্গীয় মহিমা অনুভব করেছেন। ভাওয়াইয়া গানের প্রেমিক নায়ক, মইশাল তার হাতে আছে দোতারা এই দোতরার শব্দে সে পল্লীবালাকে আকর্ষণ করেছে। মইশাল যেমন ভাওয়াইয়া গানের নায়ক তেমনি উত্তর বাংলার দূস্তর পার্বত্য নদীর নৌকার মাঝিও এই গানের নায়ক ।
তিস্তার নদীর বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমিতে কোনো দূর গ্রাম থেকে মইশালেরা মহিষ চড়াতে আসে। গ্রাম্য যুবতীরা অরণ্যে কাঠ কাটতে যায়। নিভৃত অরণ্যের স্তব্ধ নির্জনতার মধ্যে দুজনের সাক্ষাত; প্রেম। তখনই প্রেমিকা গেয়ে ওঠে
“তিস্তা নদীর পারে ও মোর না জানি মইশাল বন্ধু মোর ভাইরে
মইশ চরে বেরাস রে।”
উত্তর বাংলার নদ-নদীর প্রকৃতির সাথে পূর্ব-বাংলার নদ-নদীর প্রকৃতিগত পার্থক্য উত্তর বাংলার মাঝি ক্ষর-স্রোতা নদীর মাঝি। নদীর ক্ষীপ্রগতির সাথে যে তাল ও ছন্দ ফুটে ওঠে তাই সেখানকার সঙ্গীতে প্রকাশ পায় ।
ভাওয়াইয়া গান বিচ্ছেদের গান। ব্যর্থ প্রণয়িনী নারীর বেদনার্থ হৃদয়ানুভূতির অভিব্যক্তি এই গানের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। প্রেমে অপূর্ণতার বেদনাই এই অনুভূতির বিষয়। এই গান নিরবচ্ছিন্ন বিচ্ছেদের গান,যার মাধ্যমে গভীরতম মনের ভাবের প্রকাশ পায়। বাংলার লোকসঙ্গীতের মধ্যে করুণতম বলে মধুরতম বোধ হয় এ গান ৷
“ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চাহিয়ারে
ধিক ধিক মইশাল বন্ধুরে।”

(২) ভাটিয়ালি :
প্রত্যেক দেশের লোকসঙ্গীত সে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, সমাজ ও মানুষের পটভূমিকায় জন্ম লাভ করে। তাই নদীমাতৃক পূর্ব বাংলাও ভাটিয়ালির অন্তর্গত। শুধু নদীর সাথে এ গানের তুলনা করা হয় তা নয়, বিশাল প্রান্তরের দিগন্ত প্রসারিত বিস্তার তার উপর দিয়ে নিঃসঙ্গ অলস মন্থর গতির প্রদযাত্রা প্রকৃতির মধ্যে উদাসী বিষণ্ণ বৈরাগীর রূপ এ সমস্ত বিষয় এই গানের প্রেরণা দান করে। এ গান মানব জীবনের পার্থিব সুখ-দুঃখকে সার্থক রূপ দিয়েছে।
পূর্ব বাংলার বাউল, মারফতী, দেহতত্ত্বের কথাও এ গানে আছে। এ গানের বিশেষত্ব এই যে, দু তিনটি শব্দ দিয়ে একটি শব্দগুচ্ছ রচিত হয়। এরপর এটা গীত হয়ে প্রকাশ পায়। এর সুনির্দিষ্ট পরিমাপ নেই। গায়কের মেজাজ ও রুচি অনুযায়ী যে কোনো সীমায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। সুদীর্ঘ একটানা একটা সুর আন্দোলন যুক্ত হয়ে প্রকাশ ঘটে এ গানে ৷
ভাটিয়ালি গানের প্রধান বিষয় প্রেম। তরুণ নায়কের কণ্ঠে তার ব্যক্তিগত প্রণয়, জীবনের আশা ও নৈরাশ্যের সুর এ গানের মধ্যে দিয়ে ধ্বনিত হয়ে থাকে। তেমনি পরিণত বয়সেও আধ্যাত্মিক সুর ধ্বনিত হয়ে থাকে। সেজন্য লোকসঙ্গীতের মধ্যে আঞ্চলিক গান আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ। বাংলার লোকসঙ্গীত এর মধ্যে এ গান কেবলমাত্র প্রাচীনতমই নয়, সমগ্র বাংলার লোকসঙ্গীতের ইতিহাসে ও মৌলিক গুণ প্রকাশ পায়। এ গান একক কণ্ঠের গান হিসাবে প্রচলিত। ভাটির দেশের গানের নাম ভাটিয়ালি ।
“নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা”
“আমায় ভাসাইলি রে।”

(৩) জারি :
মুসলমান সম্প্রদায়ের মহররম উপলক্ষ্যে যে গান গীত হয় তাকে জারি গান বলে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমান সমাজে জারি গান প্রচলিত থাকলেও ময়মনসিংহ জেলার জারি গান ঐ অঞ্চলের লোকসঙ্গীত হিসাবে একটি বিশেষত্ব লাভ করেছে। এই গান নৃত্য সম্বলিত হলেও সমগ্র বাংলার লোকসঙ্গীতের মধ্যে এ গানে পৌরুষের স্পর্শ অনুভব করা যায়।
জারি গানের বিষয়বস্তু কারবালার যুদ্ধ বৃত্তান্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও জারি গান নিরবচ্ছিন্ন বীরসাত্মক সঙ্গীতই শুধু নয়, এই গানে যুদ্ধ বিষয়ের বীর রসের অন্তরাল দিয়ে করুণ রসের একটি ধারা প্রবাহমান আছে। শত্রু দ্বারা ফোরাত নদীর তীর অবরোধ করা হলে ঈমাম হোসেনের তৃষ্ণার্থ ছেলে এক ফোঁটা জলের জন্য আর্তনাদ করছিল, তখন শত্রু শিবির থেকে নিক্ষিপ্ত একটি তীর শিশু জয়নালের বুকে এসে বিদ্ধ হয়।
যুদ্ধ বৃত্তান্তের মধ্যে স্বভাবতই যে-সব কাহিনী থাকে এই গানের বক্তব্য-কে বিশেষভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। জারি গান দীর্ঘ কাহিনীমূলক আনুষ্ঠানিক আঞ্চলিক লোক গান। এই গানে থাকেন একজন মূল গায়েন। তিনি গানের সুরে মূল বক্তব্য শ্রোতার কাছে তুলে ধরেন এবং সাথে কয়েকজন গায়েন ধুয়ো ধরেন। এরা নৃত্যের তালে তালে কাহিনী অগ্রসর করতে সাহায্য করেন ।
“হানিফ বলে আয় মোর বাছাধন
যেওনা যেওনা নাথ আমারে ছাড়িয়া।”
(৪) মুরশিদি :
মুরশিদি গান আধ্যাত্মমূলক লোক সঙ্গীত। এ গানকে কোনো অঞ্চলের পর্যায়ে ফেলা যাবে না। সূফী সাধকগণ এ গানের স্রষ্টা। গুরুর মাহাত্ম ও আদর্শ এ গানের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কোনো একজন গুরুকে উদ্দেশ্য করে তার গুণগান গেয়ে তাঁর পথ ধরে মূল গন্তব্যে পৌছানোর লক্ষ্যই হচ্ছে তাদের দর্শন। তাই মুরশিদি গান আধ্যাত্মপূর্ণ ধর্মীয় গান। ফকির, দরবেশের কণ্ঠে এই গান অপূর্ব আধ্যাত্মিক রসের সুর তোলে ৷
“পার কর হে মুরশিদ আমার কেশে ধরে
গুরু ভজ্ব বলে ছিল বাসনা।”

(৫) বিচ্ছেদ :
এ গান লোকসঙ্গীতের অন্তর্গত প্রেমমূলক গান। প্রেমিক-প্রেমিকার ভেতরকার বিচ্ছেদ এই গানের মূল উপজীব্য। তবে শুধু মানবিক বিচ্ছেদ এই গানের মূল বিষয় নয়। বিচ্ছেদী গান পরমাত্মা, স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির যে বিচ্ছেদ অর্থাৎ ভক্ত ও ভগবানের সাথে বিরহ বিচ্ছেদ এ বিষয়টিও এই গানের আলোচ্য বিষয়।
মুরশিদি গানের সাথে এই গানের কিছুটা মিল আছে এই অর্থে বিচ্ছেদী গান ও কোনো কোনো সময়ে আধ্যাত্মিক লোকসঙ্গীত রূপে গণ্য হয়। বিচ্ছেদী গানে প্রতীক সম্পর্কের ব্যবহার যথেষ্ট পরিমাণে আছে। মরমী গুণ সম্পন্ন হওয়ার কারণে বিচ্ছেদী গানে কখনও অস্পষ্টতা ও দৃঢ়তার ব্যঞ্জনা দেখা যায়। রাধাকৃষ্ণের প্রণয়ের সম্পর্কের বিরহের দিকটিও ব্যবহার করা হয় এ গানে।
“ধিক ধিক আমার এ জীবনে প্রাণনাথ বিহনে”
(৬) রাখালী :
আমাদের মাঠে মাঠে গান, গাঁয়ের রাখালের বাঁশিতে গান, নদী পথে নৌকার ছৈয়ের গান, পথচারী পথিকের গান, উদাসী বাউলের একতারাতে বিষন্ন গান আরও আছে গাঁয়ের আসরের গান। এদেশের রাখাল যে সারাদিন গরু চড়ায়, কখনও মেষ, সে কদমতলায় বসে করুণ সুরে বাঁশি বাজায়, সে বাঁশির সুরের কারণে গ্রাম্যবালাদের মন গলে যায়, কখনও রাখাল বাজায় সারিন্দা, আবার কখনও দোতরা।
রাখালী গানের প্রধান উপজীব্য উৎসর্গকৃত প্রেম। সমস্ত কিছু প্রেমিকের পায় বিসর্জন করে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা এই গানগুলোতে মূর্ত ।
“সোনা বন্ধুরে, বিকাইলাম ঐ রাঙা পায়
বিকাইলে কি করবে বাপ মায়।”
(৭) চটকা :
ভাওয়াইয়ার অপর রূপ চটকা। চটুল থেকে চটকা। যদিও এর বাণী চটুল নাও হতে পারে। হালকা সুর ও লঘুতাল এর বৈশিষ্ট্য, আবার সামাজিক অনেক বক্তব্যও এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। এই ধরনের গানে আছে বৈষ্ণব পদাবলির ভাব, আবার পল্লীবালাদের মনে পরকীয়া প্রেমের বিষয়, ভাবনা মূর্ত হয়। চটকা গান সমাজের অনেক অজানা কথা, নারী নিপীড়ণের অনেক অকথিত ইতিহাস হাসিচ্ছলে ব্যক্ত করেছে। দুটি জনপ্রিয় চটকা গান-
‘প্রেম জানে না রসিক কালাচাঁদ।”
যে জন প্রেমের ভাব জানে না”

(৮) কীর্তন :
“নামলীলা গুনদিনং উচ্চৈ ভাষাতু কীর্তনং” অর্থাৎ ঈশ্বরের নামগুণ এবং লীলা বিষয়ক গানই হচ্ছে কীর্তন। অর্থাৎ কীর্তনের সংজ্ঞা হচ্ছে, ঈশ্বরের নামগুণ ও লীলা বিষয়ক পদসুর এবং তাল-বদ্ধ হয়ে উচ্চ কণ্ঠে গীত হলে তা কীর্তন হয়। আসলে কীর্তন বলতে একটি বিশিষ্ট্য সঙ্গীত শৈলীকে বোঝায়। কীর্তন দুই প্রকার।
(ক) নাম কীর্তন বা গুণ কীর্তন (খ) রস কীর্তন বা লীলা কীর্তন ।
(ক) নাম কীর্তন বা গুণ কীর্তন :
ভগবানের নাম এবং গুণ একই সাথে বিভিন্ন সুরে বার বার গাওয়া হয়। যেমন-
“হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে
রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”
নাম কীর্তনে কাব্যের বিষয় নেই কিন্তু সুরে অনেক বৈচিত্র্য। এক নাগারে তার নাম-জপ অষ্ট প্রহর ধরেই চলে।
(খ) রস কীর্তন বা লীলা কীর্তন :
লীলা কীর্তনে রাধা কৃষ্ণের প্রেম লীলা নিয়ে যে পদগীত হয় তা হচ্ছে লীলা কীর্তন। লীলা কীর্তনে রাধা কৃষ্ণের লীলার বিভিন্ন পর্যায় পালাক্রমে গীত হয়ে থাকে। কীর্তনের পাঁচটি অঙ্গ-
(১) কথা (২) দোঁহা (৩) আখর (৪) তুক (৫) ছুট
(১) কথা : কথা বলতে বোঝায় গানের ভাষা এবং গানের কোনো অংশের অর্থ। কীর্তনীয়া যখন বিশ্লেষণ করেন তখন তাকে কথা বলা হয় ।
(২) দোহা : দোঁহা বলতে বোঝায় শ্লোকভঙ্গিমা রচনা। যে-গুলো কীর্তনীয়াগণ আবৃত্তি করেন।
(৩) আখর : আখর হচ্ছে কীর্তনের বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক কীর্তনের পদবাহিত ভাবকে কীর্তনীয়া যখন তার রচিত কথার সাহায্যে মূর্ত করে তোলেন তখন তাকে বলা হয় আখর । আখর শব্দটিকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “কথার তান”।
(৪) তুক :- অনুপ্রাস বহুল ছন্দময় মীলাত্মক গাঁথাকে তুক বলে অভিহিত করা হয়। কীর্তন গায়কেরা এ সমস্ত তুক রচনা করেন মূল গানের সাথে যুক্ত করে।
(৫) ছুট : ছুট বলতে বোঝায় তাল বা পদের অংশ বিশেষ ।
(৯) হাম্দ :
আল্লাহর প্রশংসা করে যে গান গাওয়া হয় তাকে বলে হাম্দ। পুঁথিসাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কবিরাই আল্লাহর প্রশংসা অর্থাৎ হাম্দ না বলে তাদের পুঁথি আরম্ভ করতেন না। তারপরই পড়তেন দরুদ অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (স:) এর প্রতি শান্তিবাণী, কখনও নাত-ই রাসুল। শত বৎসর এভাবে পল্লীগ্রামে পুঁথি সাহিত্যের মাধ্যমে মুসলমনাদের ধর্মীয় ভাব হাম্দ ও নাতের মধ্যে ক্রিয়ারত ছিল।
বাংলা ভাষায় প্রথম ইসলামী গানের প্রবর্তক কাজী নজরুল ইসলামের হাম্দ সর্বপ্রথম সার্থক হাম্দ এবং এই গান বাংলার লক্ষ কোটি মুসলমানদের বাড়িতে বাড়িতে রেকর্ডের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্ব বাংলার প্রথম মুসলমান কণ্ঠ শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদের। বাংলার মুসলমান উপলব্ধি করল এই বাংলা ভাষার গানে কত সুন্দর ভাবেই না আল্লাহর প্রশংসা উচ্চারিত হয় এবং কতনা আপন সুরের উচ্চারণে ।
“এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি” “ফুলে পুছিনু বল্, বল ওরে ফুলে”

(১০) নাত :
নাত প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (স:) এর প্রশংসা। মুসলমানদের সকল প্রশংসার। মালিক আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন ও তার পরেই রাসূল অর্থাৎ শান্তি প্রেরিত হয় রাসূলের মাধ্যমে। প্রসিদ্ধ আল কসীদাতুল বোরদা রচনা করেছিলেন হাম্মাদুল বুসাইরী (রা:)।
কথিত আছে তার নাত রচনায় মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং রাসূল(স:) স্বপ্নে এসে তার গায়ে চাদর জড়িয়ে দেন। যার ফলে তার অবস রোগ ভালো হয়ে যায়। এই থেকে সারা মুসলিম জাহানে তার লেখা নাত-ই রাসূল কাসিদা ও বোরদা অর্থাৎ চাদরের কাসিদা গাওয়া হয়ে আসছে সাতশত বছর ধরে।
তেমনি বাংলার গ্রামে উর্দু আরবির নাত কাসিদা পড়া হয়েছে শত বছর ধরে গ্রামের মিলাদ ও ধর্ম সভায়। তবে এই নাত-ই রাসূলকে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর অসংখ্য ইসলামী গানের মধ্যে নাত-ই রাসূলের বাণী ও সুর প্রতিটি ঈমানদার মুসলমানদের অন্তরে নবী প্রেম জাগরুক করে। নজরুলের লেখা বিশেষ একটি গান-
“তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
নিশি পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোরে”
পরবর্তীতে কবি গোলাম মোস্তফাসহ আরও বেশ কিছু কবি এগিয়ে আসেন নাত- ই রাসূল রচনায়। গোলাম মোস্তফার নাত-ই রাসূল যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পায়। যেমন—
“ইয়া নবী সালাম আলাইকা”
(১১) মারফতী :
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বৎসরের নানা সময়ে ও অসময়ে বসে মেলা। এই মেলা চলে আসছে শত শত বৎসর ধরে পীরের ওরস উপলক্ষে, যে মেলায় এক শ্রেণীর ঘরছাড়া মানুষের আগমন ঘটে। যারা আসে শুধু গান করতে ও গান শুনতে। তারা বেশ কদিন ধরেই এই মেলার কাছেই তাদের ছোট বেড়ার বা তাবুর ঘর তৈরি করে নেয়। অনেক সময় তাদের পরিবারকে নিয়ে আসে।
রাত গভীর অবধি দোতারা, একতারা খঞ্জনী নিয়ে চলে এক প্রকার আধ্যাত্মিক গান। যাতে আছে মারফাত অর্থাৎ গোপন তত্ত্ব। যা কাউকে জানানো যাবে না। শুধু তাদের নিজের পথের পথিক যারা তাদেরকে শোনানো ও শেখানো হবে সে গান। গভীর অনুশীলনের কথা আছে এই মারফতী গানে। যদিও রেডিওতে টেলিভিশনে যে মারফতী গান পরিবেশিত হয় তার অধিকাংশই কৃত্রিম অর্থাৎ জোর করে বানানো গোপান তত্ত্বের গান। বাংলাদেশের অন্তত পঁচিশটি আখড়া আছে যেখানে নিয়মিত এই গানের মাহফিল বসে। প্রতি বৎসর হাজার হাজার ভক্ত ও শ্রোতা এই গানের রস উপলব্ধি করেন। যেমন :
“ভবের কামাই ভবে থুইয়া মানুষ খালি হাতে যায় ওরে”

(১২) বাউল :
অতি প্রাচীন গীভরীতি এই বাউল আত্মভোলা ও ভাবের পথিক, মনের মানুষের অন্বেষায় বাউল সমাজ প্রচলিত নিয়ম মানে না, যায় না মন্দিরে-মসজিদে। বাউলদের ভক্তি, বিশ্বাস এবং সাধনাতে বৈষ্ণবদের ভক্তিবাদ ও ইসলামের সূফীমতের ভক্তিভাবের সংমিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়। এদের জীবনে সমাজের ধরাবাঁধা নিয়মবিধি ও আচার অনুষ্ঠানের স্থান নেই। এদের অনেকেই গুপ্ত রহস্য সাধনায় অংশ নেন।
এরা একতারা বাজিয়ে গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে বেড়ায়, দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাও মাগে ৷ কুষ্টিয়া ও যাশোর অঞ্চলেই বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ঘনবসতি লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্রনাথ বাউল গান সম্পর্কে লিখেছেন-
“এমন বাউলের গান শুনেছি, ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলে না, তাতে যেমন জ্ঞানের তত্ত্ব, তেমনি কাব্য চারনা, তেমনি ভক্তিরস মিলেছে। লোক সাহিত্যের এমন অপূর্বতা আর কোথাও পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করিনে।”
গান গাওয়ার সময় কোমরে একটি ডুগি বেঁধে ডান হাতে একতারা নিয়ে বাউল দণ্ডায়মান অবস্থায় নৃত্য ছন্দে দেহ দুলিয়ে গান গেয়ে চলে পথে প্রান্তরে। লালন শাহ, পাগলা কানাই বাউল গায়ক গণের গান এখন বাউলদের কণ্ঠে গীত হতে শোনা যায়।
“আমি একদিন না দেখিলাম তারে বাড়ির কাছে আরশি নগর”
(১৩) বিচার :
লোকসঙ্গীতের বিচার গান হলো হেয়ালীর মতো। আধুনিক কবিতার মতোই খানিকটা দুর্বোধ্য কথার আড়ালে গানের বিষয়বস্তু গোপন করে মজা উপভোগ করেন বিচার গানের গায়ক । বিচার গানের বহু অংশ হেয়ালীর উপর রচিত। তাই শ্রোতাদের দারুন ইচ্ছা জাগে এর ব্যাখ্যা শোনার। যেখানে সেখানে এর ব্যাখ্যা শুনতে নেই। তাই পীরের কাছে মুরিদ হতে হয় ব্যাখ্যা নেওয়ার জন্য।
এই গান বর্তমান কালে এসে আধুনিকতার স্পর্শ পেয়েছে। বিচার গানের আছে অনেক বিভাগ। যেমন— সৃষ্টিতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, নারীতত্ত্ব, যৌবন তত্ত্ব। বিচার গানের সুর খুবই সুন্দর। তবে দ্রুত লয়ে গাওয়া হয় এ গান। বিচারের উদ্দেশ্য তত্ত্বকথা প্রচার। অনেক ক্ষেত্রেই এই গানের রচয়িতারা দার্শনিক বনে যান। এর মধ্যে কবিত্বও পাওয়া যায় তবে এর উদ্দেশ্য কাব্য করে কথা বলা নয়।
কুষ্টিয়া জেলায় বিচার বা তর্জ্জা গানের প্রচলন আছে। বিচার গান বা তর্জা গান লোক চক্ষুর আড়ালে আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে গ্রাম সমাজে রাজ্য বিস্তার করে চলেছে।
“নদীর কুলে বটবিরিক্ষি তাহার তলে চিতা”
“গাড়ি চলছে আজব কলে”

(১৪) সারি :
সবাই মিলে যে গান গাওয়া হয়, তাই সারি গান। সারি অর্থাৎ সমস্বরে সবাই মিলে। সারি গানই একমাত্র গান যা একসঙ্গে গীত হয়ে এসেছে এবং পল্লীগ্রামের মানুষ বিশেষ করে মাঝি মাল্লারা সারি গান গাওয়ার মুহুর্ত যখন আসে তখন যার যেমন গলা হউক, কণ্ঠ মিলিয়ে থাকেন। সারি কাজের গান কর্মসঙ্গীত। এতে কাজ করার ক্লান্তি দূর হয়, এক সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় সারি গানে ৷
মধ্যযুগে বারভূইয়াদের আমলে এবং পরে স্বাধীন ভূস্বামীদের সকলেরই। নৌকাবহর ছিল। তাদের নৌকার দুই ধারে দুই সারি করে পঞ্চাশ থেকে একশ জন সশস্ত্র মাঝি থাকতেন। এরাই বৈঠা দিয়ে পানি অতিক্রম করতে করতে গান করত। সারি গানের প্রাচীন বৈশিষ্ট্য এর তাল। সারি গানে অশ্লীলতা অপবাদ অত্যন্ত প্রাচীন।
অশ্লীল গান বলে অনেক গানে এখন আর গাওয়া হয় না। হারিয়েও গেছে। কিন্তু এখনও তাই বলে সারিগান সংগ্রহের দাবিদার নয় একথা মানা যায় না। সারি গানের মধ্যে বিখ্যাত গান-
“ও মাঝিরে
আজি ঝড় তুফানে চালাও তরী” -জসীমউদ্দিন
“পীরিত রতন পীরিত যতন পীরিত গলার হার
পীরিত কইরা যে জন মরে সার্থক জনম তার রে”
(১৫) গম্ভীরা :
মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও রাজশাহী অঞ্চলে গীত বিশিষ্ট লোকসঙ্গীতের নাম গম্ভীরা গান । এটি দেশজ শব্দ, সংস্কৃতে নাই। জলপাইগুড়ি ও কুচবিহার জেলায় গম্ভীরা গানের সন্ধান পাওয়া যায় তবে তার প্রকৃতি আলাদা। চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবে গম্ভীরার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। গম্ভীরা অর্থে বোঝানো হয় শিবকে। চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবও শিবের উদ্দেশ্যেই অনুষ্ঠিত হয়। তবে গম্ভীরা গানের সবই শিব বিষয়ক নয়। সামাজিক অবস্থা, সাংসারিক অভাব-অনটন, এমনকি রাজনৈতিক হালচাল ও গম্ভীরায় বর্ণনা করা হয়। অনেক গম্ভীরা গানে সারা বৎসরের চাওয়া পাওয়ার একটা বর্ণনাও পাওয়া যায় । গম্ভীরার গায়করা বিশেষ পোষাক ব্যবহার করেন । “বলব কি গান ওহে শিব বাগানে নাই আম গাছে গাছে বেরিয়ে দেখছি নূতন পাতা সব সমান”
(১৬) বারমাসী :
বাংলাদেশে চট্টগ্রামে গাওয়া হতো নিমাইয়ের বারমাসী। বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত বারটি মাসের উল্লেখ আছে এ গানে। বারমাসী মানেই যে বারমাসের সবগুলো মাসের নামই সেই গানে থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। পাট চাষীরা কত কষ্ট করে দেশের জন্য সোনালী আঁশ উৎপাদন করেন তিনটি মাস ধরে। তাদের মুখে একই সুরে খানিকটা পৌনঃপুনিক ঢঙে শোনা যায় বারমাসী গান।
বারমাসীতে প্রায়শই যা মূর্ত তা হলো নারী হৃদয়ের আকুতি বিরহব্যথা, হাহুতাশ এবং সবচেয়ে মজার এগুলো রগায়ক হলো পুরুষচাষী, যিনি হাল চাষ করছেন পাটক্ষেতে নিড়ানি দিচ্ছেন, পাট জাগ দিচ্ছেন, পাট ছাড়িয়ে নিচ্ছেন এবং তিনিই এই গানগুলো গাইছেন।
“তুমি যাইবা দূর দ্যাশে বন্ধু এই না ফাগুন মাসে”

(১৭) টুসু :
কোনো কোনো অঞ্চলে শস্যের দেবীকে বলা হয় টুসু। টুসু দেখতে মেয়ে পুতুলের মতো, মাথায় রাংতার গয়না। মাটির সরায় তুষ ভরে তার ওপর নৈবেদ্য সাজিয়ে টুসুকে নিবেদন করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে চলে গানের মাধ্যমে টুসু বন্দনা। মেয়েদের গীত উৎসব সম্পন্ন করতে হয়। বীরভূম, বাকুড়া পুরুলিয়া, বর্ধমান ইত্যাদি জায়গায় শোনা যায়।
নব্বান্ন উৎসবে টুসু পূজা ও গান হয়ে থাকে। টুসুকে কোনো কোনো স্থানে বলা হয় তোষলা, তুষষলী। প্রধানত মেয়েদের দ্বারাই টুসু গান রচিত হয়। এ গানে টুসু বন্দনা ও টুসুর মাহাত্ম বর্ণনা ছাড়া মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনের নানা সুখ-
দুঃখ বিবৃত হয়ে থাকে ।
(১৮) কাজরী বা কাজলী :
উত্তর প্রদেশের প্রচলিত লোকগীতিরগুলির মধ্যে কাজরী একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে। ভাদ্র মাসে কৃষ্ণাতৃতীয়ার দিন উত্তরপ্রদেশের রমনীরা কাজরী ব্রত উদযাপন উপলক্ষ্যে সারারাত্রি ধরিয়া শৃঙ্গার রস প্রধান কাজরী গেয়ে থাকে। বারানসীতে ভাদ্রমাসে ছটপরবের সময়েও কাজরী গীত হয়।
হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই কাজরী গানের আসরে সমবেত হয়। ভক্তির রসাত্মক কিছু কাজরী রচিত হলেও কাজরী গানের বিষয়বস্তু বিরহ ও মিলনের ভিন্ন অবস্থা। বাংলাদেশের কীর্তন গানের পদ্ধতির মতোই কাজরী গাওয়ার পদ্ধতি। সাধারণত দলের প্রধান যিনি তিনিই স্থানীয় ভাষায় নুতন নূতন কাজরী রচনা করে দলের সকলকে শিক্ষা দেন ।
(১৯) চৈতী :
বিহার প্রদেশের লোকগীতিগুলির মধ্যে চৈতি প্রধানতম। ইহা চৈত্র মাসের গান । গানগুলো বিরহ বিষয়ক এবং শৃঙ্গার রসাত্মক, রামসীতার লীলা প্রসঙ্গই চৈতী গানের প্রধান উপজীব্য।
(২০) ঝুমুর :
ছোটনাগপুর এবং সাঁওতাল পরগণার আদিবাসীগণের মধ্যে প্রচলিত একশ্রেণীর লোকসঙ্গীত ঝুমুর নামে অভিহিত হয়। এদেশের সাঁওতাল গণের মধ্যেই ঝুমুর গান সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ঝুমুর গানের সুরের একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। মাদলের বোল এবং বাঁশির সুরের সহিত ঝুমুর গাওয়া হয়।
গানগুলো সাধারণত আকারে সংক্ষিপ্ত হয়। লৌকিক যে কোনো বিষয় অবলম্বনেই ঝুমুর রচিত হতে পারে, তবে প্রেম বিষয়ক পদই বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। একটি সাঁওতালী ঝুমুর এইরূপ- “ছোট মোট রাঙন বেটি ডারায় পরে চুল মোচরে বান্ধিতে কেশ কদম ফুলের পারা”
(২১) জাগ গান :
উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলে প্রচলিত এক শ্রেণীর লোকসঙ্গীতের নাম জাগ গান। রাজশাহী এবং পাবনা অঞ্চলেও জাগ গান শুনতে পাওয়া যায়। রাত্রি জেগে এই গান গেয়ে যেতে হয় বলে এর নাম জাগ গান। সঙ্গীতের মাধ্যমে লৌকিক আখ্যায়িকা পরিবেশন করাই জাগগানের উদ্দেশ্য। উত্তরবঙ্গে প্রচলিত অধিকাংশই সোনাপীর নামে এক মুসলমান ফকিরের কীর্তন। শ্রীকৃষ্ণ এবং চৈতন্য বিষয়ক জাগ গানেরও প্রচলন আছে, উত্তর বঙ্গের কৃষক বালকগণ দল বেঁধে পৌষমাসের রাতে জেগে জাগ গান গেয়ে থাকে । জাগ গানে সোনাপীরের মাহাত্ম বর্ণনা করে বলা হয়েছে-
“জিন্দা চার যুগের সার
মারিয়া জিলাতে পার অপার মহিমা তোমার ।

(২২) বহাগ :
বহাগ মানে বৈশাখ। বৈশাখ মাসের গান । “অতি মরমরে মুগারে মহুয়া অতি মরমরে মাকু।”
অর্থাৎ মুগা = রেশমের সূতা, মাকু = তাঁত বুনিবার যন্ত্রবিশেষ। মরমরে = প্রিয়। তাঁর অপেক্ষায় প্রিয় বৈশাখের বিহু। অতি প্রিয় বৈশাখের বিহু পালন না করে কি করে থাকব? এই হচ্ছে এই গানের অর্থ । বহাগ বিহুকে রঙালি বিহুও বলা হয়। কারণ এই বিহুতে আনন্দ-রঙ উৎসব বেশি।
(২৩) কবি গান :
অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিক থেকে সূচিত বাংলা গানের একটি বিশিষ্ট ধারার নাম কবিগান। এই গানের নাম কবিগান, কবিওয়ালার গান কেন হয়েছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। অনুমান এই যে, এই গীত ধারার রচয়িতাদের একাধারে পদরচনাশক্তি, সুর-লয়-অলংকার-ছন্দ-রস সম্পর্কে ব্যুৎপন্ন ও বাক্ বৈদগ্ধ সম্পন্ন হতো বলে তাদের সম্বোধিত করা হত কবি বলে। তাই তাদের গানকে বলা হয়েছে কবি গান ৷
ভবানী বিষয়, সখী সংবাদ, বিরহ ও খেউড় এই চার অঙ্গে কবি গান রচনা করা হতো। কবি গান দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগীতামূলকভাবে সম্পন্ন হয়। এতে প্রশ্ন- উত্তর ও জয়-পরাজয়ের ব্যবস্থা থাকে। প্রতি দলের একজন থাকে দলপতি বা কবিয়াল। তিনিই তাঁর দলের আসর নিয়ন্ত্রণ করেন। কয়েকজন গায়ক থাকেন কবিয়ালের সহায়তাকারী। এরা কখনো কবিয়ালের সাথে মিলিতভাবে গান গেয়ে, কখনো ধুয়ো ধরেন। আসর চলাকালীন সময়ে কবিয়াল নিজেও গান বাঁধেন।
কবি গানের বিষয়বস্তু মুখ্যত পৌরাণিক। কিন্তু বর্তমান কালে কবি গানের বিষয়সীমা প্রসারিত করে তার মধ্যে সমসাময়িক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক বিষয়াদির সমাবেশ করা হয় ।
(২৪) পটুয়ার গান :
পৌরাণিক বা লৌকিক কোনো কাহিনী বড় রকমের একখণ্ড লম্বা কাপড় বা কাগজে আঁকা হলে তাকে পট বলা হয়। যারা এই পট বহন করে তাদের বলা হয় পটুয়া । পটুয়ারা এইসব পট গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি নিয়ে যায় এবং পটটি টানিয়ে গীত বা কখনো নৃত্যগীত সহযোগে পটে অংকিত কাহিনী বর্ণনা করে। বিনিময়ে তারা পারিতোষিক পায়। কালক্রমে পটুয়াদের এই গানের বিস্তৃত ঐতিহ্য গড়ে ওঠে ও পট বিষয়ে বহু গান রচিত হয় । এই গানকে পটুয়ার গান বলা হয় ।
(২৫) ভাদু :
প্রধানত কুমারি মেয়েরা এ গান গেয়ে থাকেন। তবে বিবাহিত মেয়েরাও এই গান গেয়ে থাকে। ভাদ্র মাস জুড়ে এ গান গাওয়া হয়। সাধারণত ভাদ্রেশ্বরী বা ভাদুলি নামক মাটির প্রতিমার সামনে সারা মাস জুড়ে এই গান গাওয়া হয়। ভাদ্র থেকেই কথাটি এসেছে। কিংবদন্তী এই যে পঞ্চকোটের রাজার ভদ্রেশ্বী নামে এক কন্যা ছিল, যার বয়স বাড়লেও বিয়ের জন্য বর পাওয়া যায় নি।
ফলে অবিবাহিত অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়। কন্যার স্মৃতির জন্য রাজা একটি ব্রত পালন করেন এবং তা জনসমাজে বিজড়িত গীতোৎসব চলে। ভদ্রেশ্বরী অবিবাহিত থাকায় তার বিবাহ সঙ্গীতই এই উৎসবের মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কুমারী মনের আশা আকাঙ্ক্ষা ও বিবাহ বিষয়ই ভাদুর প্রধান উপজীব্য।
(২৬) লেটো :
পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলা অঞ্চলে প্রচলিত একটি গীত এই লেটো। নাট্য শব্দ থেকে লেটা কথাটি এসেছে বলে অনুমান করা হয়। এই গানে দুটি দল থাকে তরজার সাথে লেটোর সাদৃশ্য আছে। প্রতি দলেই একজন দলপতি থাকেন। তাকে দোগা কবি বলে। এই গানকে লেটো, লাটু বা লেট্যা গান বলতেও শোনা যায়। উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, বাংলা লোকগীতির শ্রেণীবিভাগ বাংলা লোকজগানকে সাঙ্গীতিকভাবে অলংকৃত, সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ করেছে।

