কাজী নজরুলের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস

কাজী নজরুলের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস নিয়ে আজকের আলোচনা। নজরুল নিজে জন্ম-স্বাধীন এক ব্যক্তিসত্তা হলেও যে দেশে, যে সমাজে তিনি জন্মেছিলেন তা এক ব্রিটিশ উপনিবেশ। সেই উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়াই ছিল নজরুলের আজন্মের ধ্যানজ্ঞান। তাই ‘বড় কথা বড় ভাব’ মাথায় খুব একটা আসতো না তাঁর। অনন্ত ছিল তাঁর খেদোকি। তিনি যে নান্দনিক সৌন্দর্যচর্চার ক্ষেত্রে সহজ প্রবেশাধিকার পাননি, তারও মূল কারণ এই উপনিবেশ। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিল তৎকালীন সামাজিক-রাজনীতিক অস্থিতিশীলতা, যা মূলত হিন্দু-মুসলমানের হানাহানি থেকে সৃষ্টি।

কাজী নজরুলের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস

কাজী নজরুলের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস

নজরুল এই ধারণার অনুবর্তী হতে শেখেননি। সৌন্দর্যের অবিচল অচঞ্চল রূপের নান্দনিক ধারণার মূলে রয়েছে সৌন্দর্যচিন্তার আবশ্যকীয়তা। কিন্তু প্রথাগত পথে ন তিনি পাননি। বরং সৌন্দর্যের ধারণাকে বার বার পাল্টে নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। খুব সীমিত পরিসরে হলেও নজরুল তাঁর সৌন্দর্যভাবনার স্ব-উদ্ভাবিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘আমার সুন্দর’ শীর্ষক নিবন্ধে।

সত্য ও সুন্দরের ধারণা সম্পর্কে, তাঁর কাব্যবাণী সম্পর্কে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’সহ অন্য অনেক রচনায় তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য থাকলেও নজরুলের নন্দনচিন্তার কাঠামো বয়ানে সর্বাগ্রে বিবেচ্য ‘আমার সুন্দর নিবন্ধের প্রতিটি বাকবন্ধ ও উচ্চারণ এবং তাঁর অনুচ্চারিত মনোভঙ্গি। নজরুল এই নিবন্ধে সুন্দরের বহুরূপময়তার ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। যাপিত জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই তিনি প্রদান করেছেন এই ব্যাখ্যা।

 

কাজী নজরুলের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস

 

কখনো কখনো এ-সব ব্যাখ্যা আপাত- বিরোধী সংজ্ঞা বলেও ভ্রম পতে পারে। এমনকি এই ব্যাখ্যায় তিনি পূর্ব-চেতনা বা প্রিকনসাসনেসের উপরও গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তবে পূর্বলব্ধ জ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি। খানিকটা নীরব। ‘সংহার-সুন্দর’ বা ‘প্রলয়-সুন্দর’ ইত্যাকার বাকবন্ধে তিনি যে ডায়ালেকটিক্সের ইশারা দেন, তা তাঁর বৈরী সময়ের গর্ভজাত বৈপরীত্য, যেখানে প্রলয় বা সংহার বা হত্যা বা দাঙ্গাহাঙ্গামার মতো ঘটনাবলির ভেতর তিনি আধার- বাহিত সৌন্দর্যের উদ্ভাস লক্ষ্য করেছেন।

জীবনের ইতিবাচকতাই কেবল সুন্দরতা নয়, পরিপ্রেক্ষিত সম্মত নেতিবাচকতার মধ্যেও সুন্দরের দৃশ্যকল্প সনাক্তযোগ্য। জীবনের ঘটনাবলীর অন্তরালেখ্য রচনা করতে গিয়ে তিনি এভাবে উপলব্ধি করেছেন দুর্যোগ-দুঃসময়ে সুন্দরের বিপরীত চেহারার দ্বান্দ্বিক সহাবস্থান। প্রিয় পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পর তাই তাঁর কাছে সুন্দর আসে ‘শোক-সুন্দর’ হয়ে।

কাজী নজরুলের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস

‘আমার সুন্দর’ নিবন্ধে- নজরুল এ ধরনের বিপরীতমুখী বা সম্পূরক সুন্দরের কমপক্ষে ষোলটি প্রকারভেদ বর্ণনা করেচেন : ১. শক্তি-সুন্দর ২. অন্তরতম সুন্দর ৩. প্রকাশ সুন্দর ৪. যৌবন-সুন্দর ৫. প্রেম-সুন্দর ৬. শোক- সুন্দর ৭. স্নেহ-সুন্দর ৮. শিশু-সুন্দর ৯. প্রলয় সুন্দর ১০. সংহার-সুন্দর ১১. ধ্যান-সুন্দর ১২. ধরিত্রী-সুন্দর ১৩. পুষ্পত সুন্দর ১৪. সৃষ্টি-সুন্দর ১৫. বিষ-সুন্দর ১৬. স্বর্নজ্যোতি সুন্দর ইত্যাদি।

 

google news logo

 

যাপিত জীবনের বাঁকবদলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সুন্দরের এই বহুরূপী অবয়বমালা। কখনো বৈপরিত্যসূচক, কখনো সমরূপী বিভিন্নতাচারী এইসব সৌন্দর্য ভাষা। তবে আপাত-বিরোধী ব্যাখ্যার আধিকা থাকলেও চূড়ান্ত বিবেচনায় এ-সব সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের স্ট্রাকচারাল লেজিটিমেশন বা কাঠামোগত বৈধতা। এ-কারণে নজরুল তাঁর সর্বশেষ অভিভাষনে (‘যদি আর বাঁশি, না বাজে’) যথার্থই বলেছিলেন ‘অভেন সুন্দর সাম্য- এর কথা। মাত্র বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ বছরের তুমুল জাগরন জীবনে ঘটেছে নানা উত্থান-পতন, যা তাঁর নান্দনিক বোধক করে রেখেছে সংঘাতমধুর।

Leave a Comment