কাজী নজরুল ইসলামের পত্রিকা সম্পাদনার অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেনাবাহিনী থেকে বিদায় নেওয়ার পর তিনি যখন করাচিতে অবস্থান করছিলেন, তখন বিভিন্ন সামরিক প্রকাশনা, ব্যাটালিয়নের সংবাদপত্র ও রিপোর্ট তৈরির কাজের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতার প্রথম হাতেখড়ি হয়। গবেষকরা মনে করেন, এ সময়েই নজরুলের লেখনী সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয় শৈলী—সংবাদ বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন নির্মাণ, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে মতামত প্রকাশ—এসবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হয়। তাই করাচি থেকে ফিরে কলকাতায় এসে তিনি পেশাদার সাংবাদিকতার দায়িত্ব নিতে সক্ষম হন। এই পথ ধরেই ১৯২০ সালের মে মাসে তিনি শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত দৈনিক নবযুগ পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, যা তাঁর রাজনৈতিক–সাংবাদিকতা জীবনের এক নতুন সূচনা।

নজরুলের নবযুগ পত্রিকার দায়িত্বভার গ্রহণ
নবযুগ প্রথম প্রকাশিত হয় ১২ জুলাই ১৯২০ সালে একটি সান্ধ্য দৈনিক হিসেবে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তুমুল উত্তাল সময়—অসহযোগ আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন, এবং উপনিবেশিক দমননীতির প্রতিবাদ—এই পত্রিকার জন্ম ঘটে ঠিক সেই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই। পত্রিকাটি কেবল সংবাদপত্র ছিল না; এটি ছিল সময়ের রাজনৈতিক চেতনা, জনগণের আকাঙ্ক্ষা আর বিদ্রোহী মনোভাবের এক অগ্নিপতাকা। নজরুল এই পত্রিকার মাধ্যমে বিস্ফোরিত শক্তির মতো আবির্ভূত হন। তাঁর লেখা সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ ও সংবাদ বিশ্লেষণে প্রকাশ পেত সমাজ–রাজনীতির গভীর পর্যবেক্ষণ, অন্যায়–অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও মানবিক ন্যায়ের প্রতি অবিচল অবস্থান।

নবযুগে যোগ দেওয়ার পর নজরুল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে উপলব্ধি করেন। তিনি লেখেন নির্যাতিত মানুষের পক্ষে, সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে, ব্রিটিশ প্রশাসনের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে—যা স্বাভাবিকভাবেই সরকারের নজরে আসে। বিশেষ করে “মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে” শীর্ষক তাঁর প্রবন্ধ ক্ষমতাসীনদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। প্রবন্ধে তিনি খোলাখুলিভাবে সরকারের ব্যর্থতা ও মুসলিম শরণার্থীদের হত্যাকাণ্ডের দায় তুলে ধরেছিলেন। এর ফলস্বরূপ পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত হয় এবং নজরুল পুলিশের নজরদারির আওতায় আসেন। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই নজরুল অনুভব করেন—স্বাধীনতার সংগ্রামে সাংবাদিকতা কতটা শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে কতটা বিপজ্জনক একটি অস্ত্র।
নবযুগে কাজ করার ফলে নজরুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে বিপ্লবী–চিন্তাবিদ মুজফ্ফর আহমদের, যিনি তাকে রাজনৈতিক আলোচনার পরিধিতে নিয়ে আসেন। দু’জনে একসঙ্গে অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা, সমিতি, বিপ্লবী আড্ডা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। এসব অভিজ্ঞতা নজরুলের চিন্তাজগৎ বদলে দেয়—তিনি সাম্যবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবমুক্তি ও শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। নবযুগের কলমই তাঁকে পরবর্তীতে ধূমকেতু পত্রিকার বিদ্রোহী সম্পাদক হওয়ার সাহস দেয়—যেখানে প্রকাশিত তাঁর অনেক লেখা ব্রিটিশ দমননীতির বিরুদ্ধে ঝড় তুলেছিল।
নবযুগের সময়ই নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত চেতনারও বিকাশ ঘটে। যদিও তখনো তিনি নিজের গান সুর করা শুরু করেননি, তবুও তাঁর কবিতার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ছিল। ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা তাঁর কয়েকটি কবিতায় সুর দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশ করেন—এর মধ্যে ছিল হয়তো তোমার পাব দেখা ও ওরে এ কোন স্নেহ–সুরধুনী। এই ঘটনাই নজরুলকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে, এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেই সুরারোপে হাত দেন। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গান “বাজাও প্রভু বাজাও ঘন”, যা বাংলা সঙ্গীতে নজরুলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের পথ তৈরি করে।
সব মিলিয়ে, নবযুগ পত্রিকা নজরুলের ব্যক্তিজীবন, সাহিত্যজীবন এবং রাজনৈতিক সত্তাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। এখানে কাজ করেই তিনি হয়ে ওঠেন এক পরিপূর্ণ সাংবাদিক, সমাজ সচেতন লেখক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও সংস্কৃতিবাদী শিল্পী—যার পরিণত রূপ আমরা দেখি তাঁর পরবর্তী বিদ্রোহী রচনা, অসংখ্য গান এবং সাম্যবাদী মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। নবযুগ শুধু একটি পত্রিকার দায়িত্ব ছিল না; এটি ছিল নজরুলের অন্তর্জাগরণের সেই মুহূর্ত, যেখান থেকে তিনি ক্রমে হয়ে ওঠেন সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর।
