রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে নজরুল সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পান

কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কবিতায় নয়, সঙ্গীত, নাটক, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর স্বকীয় মেধা ও বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন। বিশেষত চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অবদান বাংলা সিনেমার প্রারম্ভিক যুগকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি শুধু গীতিকার বা সুরকারই ছিলেন না, বরং চলচ্চিত্র পরিচালনা, অভিনয় থেকে শুরু করে সঙ্গীত পরিচালনা পর্যন্ত বিভিন্ন দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ধূপছায়া’ বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যেখানে তিনি নিজেও অভিনয় করেছিলেন। ১৯৩১ সালে তিনি প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’–এর সঙ্গীতে যুক্ত ছিলেন এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রের সুরকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে নজরুল সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পান

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে নজরুল সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পান

পরবর্তীতে নজরুলের সুরকার জীবন আরও সমৃদ্ধ হয় ১৯৩৩ সালের ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমে। এই ছবিতে তাঁর কাজ বাংলা চলচ্চিত্রে প্রাচীন রাগভিত্তিক সঙ্গীত ব্যবহারের নান্দনিক সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ১৯৩৭ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস নির্মিত ‘গ্রহের ফের’ চলচ্চিত্রেও তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করে প্রশংসা কুড়ান। তাঁর সুর করা ১৯৩৫ সালের ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রও সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে নজরুল সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পান

 

তবে নজরুলের চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাইলফলক হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ১৯৩৮ সালের চলচ্চিত্র ‘গোরা’–র সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া। রবীন্দ্রনাথের মতো মহত্তম সাহিত্যিকের উপন্যাসে নির্মিত চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া নজরুলের সঙ্গীত–প্রতিভার একটি বিশেষ স্বীকৃতি। কারণ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং তাতে সঙ্গীত সৃষ্টির দায়িত্ব অত্যন্ত মর্যাদার বিষয় ছিল। রবীন্দ্র–চেতনার গভীরতা, দার্শনিকতা, মানবতাবাদ ও সামাজিক বোধ ধারণ করতে সক্ষম এমন শিল্পীরাই এমন দায়িত্ব পেয়ে থাকেন। কাজেই ‘গোরা’ চলচ্চিত্রে নজরুলের উপস্থিতি শুধু তাঁর সাঙ্গীতিক সামর্থ্যের পরিচয় নয়, বরং সমকালীন বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধারও উজ্জ্বল উদাহরণ।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার, গীতিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল নিজেই। কাননবালা দেবীর কণ্ঠে তাঁর সুরারোপিত গান “আকাশে হেলান দিয়ে” ও “কথা কইবে না বউ” সে সময় বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া ‘রজত জয়ন্তী’, ‘নন্দিনী’, ‘অভিনয়’, ‘দিকশূল’ চলচ্চিত্রের গীতিকার হিসেবে এবং ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রে গীতিকার-সুরকার-সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তিনি চলচ্চিত্র–জগতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। ‘চৌরঙ্গী’ হিন্দি ভাষায় নির্মিত হলেও নজরুল সেখানে সাতটি হিন্দি গান রচনা করেন—যা বাংলা সঙ্গীতশিল্পীর জন্য সে সময় এক অসাধারণ কৃতিত্ব হিসেবে গণ্য হয়েছিল।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে নজরুল সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পান

 

নজরুলের লেটোদলে সক্রিয় থাকা সময় থেকেই তাঁর সাঙ্গীতিক বোধের সূচনা ঘটে। গ্রাম্য গানের ছন্দ, নাট্যগানের ঢং, রাগভিত্তিক সুর, কবিগান—এসবের সমন্বিত অভিজ্ঞতা তাঁকে পরবর্তীতে চলচ্চিত্র সঙ্গীতের জগতে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করে। তাঁর সঙ্গীতে ছিল দেশজ সুরের সহজতা, রাগানুগ গানের মাধুর্য, আর কবিত্বভিত্তিক বাণীর তীব্র অভিব্যক্তি। এই কারণেই চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজকরা তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার প্রতি বিশেষ আস্থা রেখেছিলেন।

সুতরাং বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে নজরুল সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া ছিল তাঁর শিল্প–জীবনের এক সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, যা বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক মূল্যবান সংযোজন হয়ে আছে। এটি শুধু নজরুলের সঙ্গীত দক্ষতার স্বীকৃতিই নয়, বরং রবীন্দ্র–নজরুল যুগের সাংস্কৃতিক ঐক্য ও আন্তসম্পর্কের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

Leave a Comment