নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তার পেছনে মতামত উপস্থাপন । নজরুলের ভাবনা

নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তা : বাংলা গানের ক্ষেত্রে যারা নাম কিনেছেন তাদের মধ্যে নজরুল অন্যতম। তার গানের ভাণ্ডার বাংলা গানকে দিয়েছে পরিপূর্ণতা। বাংলা গানের বিবর্তনে এমন কোনো শাখা নেই সেখানে তিনি বিচরণ করেননি। ফলে নজরুল সঙ্গীত পেয়েছে গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যাপকতা।

 

নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তার পেছনে মতামত উপস্থাপন

 

নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তার পেছনে মতামত উপস্থাপন । নজরুলের ভাবনা

বাংলা গানে নজরুল সঙ্গীতের প্রভাব

১৯৪৭ পরবর্তী বাংলা গানের বিভক্তি যেমনটি ছিল বিবর্তনের ধারায় তা ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে আজ পর্যন্ত অনেক কিছু দিয়েছে যার সফল রূপকার কাজী নজরুল। নজরুল সঙ্গীত প্রভাবিত করেছে সকল পর্যায়ের সঙ্গীতকে। পরিবেশনের আঙ্গিক ভিন্ন হবার কারণে এবং অন্য সুরকারের সমন্বয়ের কারণে নজরুল সঙ্গীত বৈচিত্র্যমুখি প্রসার লাভ করেছে।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত নজরুলসঙ্গীত :

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারায় নজরুলের সঙ্গীত রচনা বেশ প্রাধান্য পেয়েছে। এর মধ্যে ধ্রুপদ, ধামার, ঠুমরী, টপ্পা শাস্ত্রীয় শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করেছে। যার ফলে নজরুল সঙ্গীত বাংলা গানের পরিসরে বিখ্যাত বলে ধরে নেয়া যায় হয়তো।

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নজরুলসঙ্গীতের আয়োজক নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী কবি। তার বিদ্রোহী সত্ত্বাকে প্রাধান্য দিয়ে রচিত কাব্য ও সঙ্গীত ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের ভাষা নজরুলের কাব্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে। নজরুল চেয়েছিলেন অসুন্দরকে পরিহার করে সুন্দর ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে।

তার রচিত সঙ্গীত যেমন : “জয় হোক জয় হোক সত্যের জয় হোক” এবং কাব্য :“বিদ্রোহী”, “আনন্দময়ী আগমন,” মুক্তি ইত্যাদি।

 

নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তার পেছনে মতামত উপস্থাপন

 

সনাতন ধর্ম বিষয়ক নজরুলসঙ্গীতঃ

নজরুল ছিলেন একাধারে গীতিকার সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী। গান রচনার বৈচিত্র্যতা এবং সুর সংযোজনের ক্ষেত্রে নজরুল প্রতিভা বিরল। বিশেষ করে হিন্দু মাইথোলজি প্রয়োগে নজরুল যে গানগুলি রচনা করেছেন ভজন, কীর্তন, শ্যামা, ভক্তিমূলক তাতে করে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে তার জনপ্রিয়তা বেশ বেড়েছে। তৎকালীণ সময় থেকেই বিষয়ভিত্তিক রচনার কারণে নজরুলসঙ্গীতের ব্যাপ্তি আজও সুন্দরভাবে প্রবাহমান।

নজরুলের ইসলামি গান :

নজরুলের ইসলামিক গান তার রচনার একটি সার্থক প্রকাশ। পর্যায়ভিত্তিক ইসলামি গান রচনার কারনে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ নজরুলকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। যার মধ্যে ছিল রমজান মক্কা, মদিনা, মসজিদ, ঈদ প্রভৃতি প্রসঙ্গ। যেদিন থেকে নজরুল ইসলামী গান রচনা করেন ঠিক তখন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে নজরুলের ইসলামী গানের প্রচার, প্রসার একটি আধিপত্য বিস্তার লাভ করে।

নবরাগ সৃজনে কাজী নজরুল

সৃষ্টির রহস্য চিরদিনই মানুষ ধারণ করে আছে। এই ক্ষেত্রে নজরুলকে সহযোগিতা করেছিল সুরেখ চক্রবর্তী। আকাশ বাণী থেকে প্রচারিত নবরাগ এবং হারামনি এই দুটি অনুষ্ঠান সুরেখ চক্রবর্তী কর্তৃক প্রচারিত হয়েছিল। নতুন রাগ সৃষ্টি এবং অপ্রচলিত রাগের প্রয়োগের কারণে নজরুলসঙ্গীত দর্শক স্রোতাদের কাছে আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়েছে।

 

নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তার পেছনে মতামত উপস্থাপন

 

নজরুল সৃষ্ট তাল :

নজরুল তাঁর গানে বৈচিত্র্য সাধনের জন্য তাল প্রবর্তনের ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ৬টি তাল সৃষ্টি করেছেন এবং তার সঠিক প্রয়োগ করেছেন তার গানে। যেমন : প্রিয়া ছন্দ/সাত মাত্রার তাল। ছন্দ-২/৩/২। গানের কথা, “মহুয়া বনে বন পাপিয়া।”

ভাল বৈচিত্রের কারণে নজরুলসঙ্গীত অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। যদিও অনেক সঙ্গীত গবেষকগণ নজরুল সৃষ্ট ভালকে ছন্দ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

নারী জাগরণের গান :

নারী জাগরণের গান নজরুলের সঙ্গীত রচনায় একটি অন্যতম দিক। যা নজরুলের পূর্বে এতটা দেখা যায়নি। নজরুলের এই সঙ্গীতের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের মুক্তির ক্ষেত্রে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীরা বিদ্রোহী ভূমিকা পালন করেছিল।

যেমন : “জাগো নারী জাগো”।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান : ১৯০৫ সালের পর থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা প্রকট আকার ধারণ করে। বালক নজরুল তখন থেকেই অসাম্প্রদায়িতকা প্রসঙ্গ নিয়ে নিজেকে তৈরি কনে। তিনি সাম্প্রদায়িকতা ভুলে সকল শ্রেণীর মানুষকে এক পতাকা তলে নিয়ে আসার জন্যে নিজেকে দেশবাসীর হিতার্থে উৎসর্গ করেছিলেন। তাই তিনি রচনা করেছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান। যেমন “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম” ।

 

নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তার পেছনে মতামত উপস্থাপন

 

বাংলা কীর্তন ও কাজী নজরুল

শ্রী চৈতন্য দেবকে বাংলা কীর্তনের প্রবর্তক বলা হয়। কাজী নজরুল বাংলা কীর্তনকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়েছেন। বিষয় একই হলেও সুর সংযোজনের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল অন্যতম। কীর্তনের সুর বৈচিত্র্যে রয়েছে বিভিন্ন সুরের সমাহার যাতে করে নজরুলের কীর্তন পেয়েছে গায়কি বৈশিষ্ট্যের সার্থকতা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তথা নজরুল ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম :

নজরুল ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে সরকার তথা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি প্রতিষ্ঠান। যেখানে নজরুলের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা এবং সঙ্গীতের নানা দিক নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সঙ্গীতের জন্য রয়েছে সত্যায়ন বোর্ড, স্বরলিপি প্রকাশ, আদি রেকর্ড ভিত্তিক সুর ও বাণী প্রকাশ প্রভৃতি। আদি সুর ও বাণীতে নজরুলসঙ্গীতে প্রশিক্ষণ দেবার কারণে ক্রমান্বয়েই নজরুলসঙ্গীত জনপ্রিয়তার শীর্ষে। শুদ্ধভাবে নজরুলসঙ্গীতের প্রচারের জন্য বাংলাদেশ সরকারের এটি একটি মহৎ উদ্যোগ।

মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলসঙ্গীত চর্চাঃ

নজরুল রচনায় বিশেষ গুরুত্ব থাকার কারণে নজরুলের সৃষ্টিকে মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে শুরু থেকে নজরুলের রচনা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে জনমানুষের কাছে। জনগণের কবি হিসেবে নজরুলের স্বীকৃতি তার রচনার সার্থক রূপ।

নজরুলের বিভিন্ন বিষয়ে এম ফিল ও পি এইচ ডি প্রোগ্রামঃ

স্নাতকোত্তর শ্রেণীর পরের পর্যায়ে হলো এম. ফিল এবং পি এইচ ডি, প্রোগ্রাম। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলসঙ্গীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণার কার্যক্রম চলছে। এক্ষেত্রে যারা এ যাবৎ অবদান রেখে যাচ্ছে তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।

 

google news logo

 

জাতীয় গণমাধ্যমে নজরুলসঙ্গীতের প্রচার :

নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তা লাভ করার পিছনে প্রধান ও অন্যতম কারণ হলো গণমাধ্যম। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করবার কারণে তারা একমাত্র দুটি মাধ্যমেই নজরুলের গান শুনতে পান। জেলা শিল্প কলার মাধ্যমে নজরুলসঙ্গীত প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা থাকার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গীত পিপাসু মানুষ নজরুলসঙ্গীত শেখার সুযোগ পাচ্ছে। নজরুল ইনস্টিটিউট এবং কেন্দ্রীয় শিল্পকলা মুখ্য ভূমিকা পালন করলে নজরুলসঙ্গীত আরও প্রসার লাভ করবে বলে আমি মনে করি।

উপসংহার:

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, যে ধারাবাহিকতার আলোকে নজরুল সঙ্গীত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে তা মূলত পরিপূর্ণ সঙ্গীত হিসেবে। সঠিক ও সুন্দর ব্যবস্থাপনায় এটি আগামীর পথে আরো নান্দনিকতা লাভ করবে।

Leave a Comment