নজরুল সঙ্গীতে অনুপ্রাস ও কেবল রূপক

বাংলা গানের এক উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র অধ্যায় হলো নজরুল সঙ্গীত, যেখানে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যবোধ, সঙ্গীত–সৃজনশীলতা এবং ভাষাশৈলী এক অনন্য সুরেলা সমন্বয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর আবির্ভাব ঘটে রবীন্দ্রযুগে, কিন্তু নজরুল রবীন্দ্রনাথের চেতনা–বলয়ের বাইরে দাঁড়িয়েও নিজের স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ গীতিধারা গড়ে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও ছিলেন একই সঙ্গে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক; তবে শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, সুর–তাল–ছন্দে অভিনবতার দিক থেকেও নজরুল ছিলেন এক অবিরাম উদ্ভাবক। তাঁর গানে রয়েছে বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় ঘরানা থেকে আরবি–পারসি ধাঁচের সুর, ধ্রুপদ–ঠুমরি থেকে কীর্তন–বাউল—সবধরনের সঙ্গীত উপাদান। তাই নজরুলের গান বাংলা সংগীতকে দিয়েছে এক বিস্তৃত পরিসর, বৈচিত্র্যময় কাঠামো ও নবরসের মেলবন্ধন। শ্রোতাপ্রিয়তার বিচারে তাঁর গান আজও সমান জনপ্রিয়—যেমন বিবিসি বাংলার জরিপে কারার ওই লৌহকপাট এবং চল্‌ চল্‌ চল্‌ ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল গান দুটি সর্বকালের সেরা বাংলা গানের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

 

নজরুল সঙ্গীতে অনুপ্রাস ও কেবল রূপক

 

নজরুল সঙ্গীতে অনুপ্রাস ও কেবল রূপক । নজরুলের ভাবনা

নজরুল সঙ্গীতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ভাষার কাব্যমাধুর্য, যেখানে অলংকারের বিভিন্ন রূপ—বিশেষত অনুপ্রাসকেবল রূপক—অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। নজরুলের গান শুধু সুরের কারুকার্যেই সমৃদ্ধ নয়; শব্দের ধ্বনি, ছন্দের পুনরাবৃত্তি এবং চিত্রকল্পের গভীরতা মিলিয়ে তা হয়ে ওঠে এক বিশেষ নান্দনিক অভিজ্ঞতা। অনুপ্রাস ব্যবহারে তিনি ধ্বনির সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলেছেন, আর রূপকের প্রয়োগে বাণীর ভাবগভীরতা প্রকাশ করেছেন। তাঁর গানগুলোতে আবেগ, প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা, বেদনা কিংবা উচ্ছ্বাস—সবকিছুরই প্রকাশ অলংকারের সাহায্যে আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

উদাহরণস্বরূপ, গীতিশতদলে ব্যবহৃত লাইন—“হায় ঝরে যায় মোর আশা–কুসুম বারে বারে”—এখানে ধ্বনির চারবার পুনরাবৃত্তির ফলে সৃষ্টি হয়েছে কাব্যিক সুরমাধুর্য, যা বৃত্তানুপ্রাসের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আবার আশাকে কুসুম বা ফুল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে রূপকার্থে, যা কেবল রূপক হিসেবে আশার ভঙ্গুরতা ও কোমলতাকে গভীরভাবে ব্যক্ত করে। একইভাবে অখণ্ড নজরুল–গীতির “বেদনার পারাবার করে হাহাকার তোমার আমার মাঝে প্রিয়তম”—এখানে ধ্বনি সাতবার ও ধ্বনি চারবার ব্যবহৃত হওয়ায় ধ্বনিগত এক স্বর্গীয় অনুরণন তৈরি হয়েছে, যেন বেদনা ঢেউ তুলে উঠছে হৃদয়ে। পাশাপাশি বেদনাকে পারাবার হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে; এই রূপক বেদনার অসীমতা ও গভীরতার এক শক্তিশালী চিত্র নির্মাণ করে।

তৃতীয় উদাহরণে—“কথা কও কথা কও, থাকিও না চুপ করে। মৌন গগনে হের কথার বৃষ্টি ঝরে।”—এখানে , ধ্বনির পুনরাবৃত্তি কাব্যের ছন্দে ও সুরে প্রবাহ তৈরি করেছে, যা শ্রুতিমধুরতার দিক থেকে অনুপ্রাসকে এক উঁচু স্তরে নিয়ে যায়। আর “কথার বৃষ্টি” রূপকটি বাণীর আবেগময় লাবণ্যকে বাড়িয়ে তোলে—যেন অপ্রকাশিত অনুভূতিগুলো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে মৌন আকাশে। নজরুলের রূপক তাই শুধু শব্দের অলংকার নয়; তা তাঁর জগতদর্শন, আবেগবোধ ও কাব্য–অনুভূতিরই প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নজরুল সঙ্গীতের ভাষা অলংকারসমৃদ্ধ হলেও তা কখনো জটিল বা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে না। বরং অনুপ্রাসের ধ্বনি–ঝংকার ও রূপকের ভাবব্যঞ্জনা মিলিয়ে তাঁর গান হয়ে ওঠে একই সঙ্গে সুরেলা, আবেগপূর্ণ ও দার্শনিক। কাব্যরস, সুরের প্রবাহ এবং অলংকারের শিল্পরীতির এই অনন্য সমন্বয় নজরুল–গীতিকে বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর সৃষ্টিতে অলংকার কেবল ভাষার সাজসজ্জা নয়, বরং বেদনা, প্রেম, আশাবাদ, সংগ্রাম—মানুষের মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলিকে সবচেয়ে জীবন্তভাবে ব্যক্ত করার এক শক্তিশালী কাব্যিক উপকরণ। তাই নজরুল সঙ্গীতের অনুপ্রাস ও রূপকের বিশ্লেষণ শুধু ভাষাতাত্ত্বিক অনুশীলন নয়, বরং তাঁর কাব্য–সৃজনশৈলীর গভীরে প্রবেশের এক আন্তরিক প্রয়াস।

Leave a Comment