নজরুল চর্চার আঙ্গিক বিশ্লেষণ

নজরুল চর্চার আঙ্গিক বিশ্লেষণ নিয়ে আজকের আলোচনা। নজরুল বিষয়ে প্রথম গ্রন্থ আবুল ফজল রচিত ‘বিদ্রোহী কবি নজরুল’ ১৯৪৮ সালে মার্চ-এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়েই নজরুল-চর্চার যথার্থ সূত্রপাত। লক্ষণীয় বিষয়, ১৯৯৯ সালে নজরুল জন্ম শতবর্ষ পূর্তির পাশাপাশি নজরুল-চর্চারও পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়েছে।

নজরুল চর্চার আঙ্গিক বিশ্লেষণ

নজরুল চর্চার আঙ্গিক বিশ্লেষণ

আবুল ফজলের এই ক্ষুদ্র পুস্তকে ‘মুখপত্র’ লিখেছেন ইব্রাহীম খাঁ। স্মৃতিকথা-নির্ভর এই মুখপত্রে নজরুলের সঙ্গে ইব্রাহীম খাঁ’র পরিচয়-সাক্ষাতের বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে। আবুল ফজল এ গ্রন্থের ভূমিকায় তাঁর রচনায় সীমাবদ্ধতার দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন, একটি হচ্ছে নজরুল রচিত অনেক গ্রন্থই দুষ্প্রাপ্য এবং দ্বিতীয় হচ্ছে নজরুল সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগৃহীত হয়নি।

লক্ষণীয় বিষয়, পরবর্তীকালে দীর্ঘকাল পর্যন্ত নজরুল বিষয়ে রচিত অধিকাংশ গ্রন্থে সীমাবদ্ধতার এই কারণ বর্তমান। এ-গ্রন্থে বিভিন্ন অধ্যায়ের শিরোনাম হচ্ছে জীবন- কথা, মানুষ নজরুল, কাব্য পরিচয়, গল্প-উপন্যাস-নাটক, সঙ্গীত ও কবির জবানবন্দী। আমি স্বল্প পরিসরে নজরুলের সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

নজরুল চর্চার আঙ্গিক বিশ্লেষণ

 

নজরুল বিষয়ে রচিত প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ কাজী আবদুল ওদুদ-এর ‘নজরুল প্রতিভা’। ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত ৫০ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র এ-পুস্তকে প্রথম প্রবন্ধ ‘নজরুল ইসলাম’ এবং ‘আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্ণিশ। পরিশিষ্টে (পৃষ্ঠা ৩০- ৩৫) আমরা আবদুল কাদির রচিত একটি প্রবন্ধ—’নজরুলের জীবন ও সাহিত্য’ পাই।

কাজী আবদুল ওদুদের প্রথম প্রবন্ধটি ১৯৪১ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নজরুল জয়ন্তীতে পঠিত হয়। কবি সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলেও তিনি পরে প্রবন্ধটি পড়েছিলেন। এবং আবদুল ওদুদের ভাষায় কবি বন্ধুর এই প্রীতি-নিবেদন সদয় ভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। লেখক নজরুলের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ অক্ষুণ্ণ রেখেই ‘নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধে ‘সত্য নির্ণয়ের চেষ্টায় শিথিলতা দেখাতে পারেন নি। কারণ, তাহলে তিনি সমালোচক হিসাবে ‘স্বধর্মচ্যুত’ হতেন।

উল্লেখ করা দরকার, কাজী আবদুল ওদুদ এ প্রবন্ধে নজরুলের সাহিত্য-জীবনকে তিনটি স্তরে চিহ্নিত করেছেন, তা যথাক্রমে প্রাক-বিদ্রোহী পর্ব, বিদ্রোহী পর্ব ও সঙ্গীত রচনার পর্ব। পরিশিষ্টে প্রদত্ত আবদুল কাদিরের প্রবন্ধে নজরুলের জীবন ধারাবাহিক আলোচনা করা হয়েছে, প্রবন্ধটি তথ্যবহুল।

 

নজরুল চর্চার আঙ্গিক বিশ্লেষণ

 

প্রবন্ধের শেষে নজরুলের সাহিত্য সম্পর্কেও সংক্ষিপ্ত মন্তব্য রয়েছে। নজরুলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আবদুল কাদির বলেছেন, ‘নজরুলের কবিতায় খুঁত থাকতে পারে, কিন্তু কৃত্রিমতা নেই, কারসাজি নেই-প্রাণের অদম্য আনন্দ-রসে তা বেগবান ও দীপ্যমান”।

নজরুল চর্চার গোড়া থেকেই যে প্রতিকূলতার উদ্ভব হয়েছিল, তা হচ্ছে নজরুলের সমগ্র রচনার দুষ্প্রাপ্যতা। ‘অগ্নিবীনা’ ‘সঞ্চিতা’ প্রভৃতি কয়েকটি জনপ্রিয় গ্রন্থ ছাড়া অধিকাংশ গ্রন্থই দীর্ঘকাল অপ্রকাশিত ছিল। কোন কোন গ্রন্থ নজরুলের সুস্থাবস্থায় দ্বিতীয় সংস্করণের মুখ দেখেনি। তদুপরি ৫টি গ্রন্থই ছিল নিষিদ্ধ। ফলে, এ-অবস্থা ছিল নজরুল-প্রতিভার সম্যক বিচারের প্রধান অন্তরায়।

সে কারণেই সাধারণ পাঠকদের পক্ষ থেকে নজরুল রচনাবলী প্রকাশের দাবী উঠেছিল। পূর্ব-পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় বাঙালা উন্নয়ন বোর্ড নজরুল রচনাবলী প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় নজরুল রচনাবলী’র তিনটি খ (১৩৭৩-৭৬) প্রকাশিত হয়। তাঁরই সম্পাদনায় পরবর্তী দুটি খণ্ড (১৩৮৪-৯১) বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত হয়।

 

google news logo

 

নজরুলের গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা-সমূহ কল করে আবদুল কাদির ‘নজরুল রচনা সম্ভাব’ (১৯৬১) নামেও একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। নজরুল রচনাবলী প্রকাশের ফল নজরুলের রচনা সমূহ একদিকে যেমন পাঠকের হাতের কাছে পৌঁছে যায়, অন্যদিকে নজরুল-প্রতিভার পরিচয়, ক্রমবিকাশ ও পরিণতির স্বরূপ অনুধাবনের পথও সুগম হয়।

পশ্চিমবঙ্গে আবদুল আজিজ আল আমানও ‘নজরুল রচনা সম্ভার’ নামে নজরুলের গ্রন্থ-সমূহ ও কিছু অপ্রকাশিত রচনা সংকলন করে কয়েক খণ্ডে প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে ‘অপ্রকাশিত নজরুল’ গ্রন্থেও তিনি অপ্রকাশিত রচনাসমূহ সংলকন করেন।

নজরুলের গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা সংগ্রহ বা সংকলন নজরুল চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। নজরুল সুস্থাবস্থায় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় যে সব রচনা প্রকাশ করেন, কিন্তু গ্রন্থকারে প্রকাশ করতে পারেন নি, সেসব রচনা সংগ্রহে বা সংকলনে গবেষকদের বিশেষ তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। এ ব্যাপারে আবদুল কাদির ও আবদুল আজিজ আল আমান অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

পরবর্তীকালে অনেকেই এ-ব্যাপারে উৎসাহিত হন। কিন্তু কোন কোন গ্রন্থকার বা প্রকাশক এসব রচনা একটি বিশষ গ্রন্থনামে চিহ্নিত করে নজরুল ইসলামের নামসহ প্রকাশ করেন, যা আদৌ সমীচীন নয়। কারণ, এসব গ্রন্থ নজরুলের পরিকল্পিত গ্রন্থ নয়। একজন লেখক তাঁর চিন্তা এবং পরিকল্পনা নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু রচনা একত্রে একটি বিশেষ গ্রন্থ-নামে প্রকাশ করেন। নজরুলের অপ্রকাশিত রচনাবলী সংকলন, ‘সংকলিত’ বা ‘সম্পাদিত’ বলে চিহ্নিত হওয়া বাঞ্ছনীয় ।

Leave a Comment