নজরুল একজন বিদ্রোহী কবি- কাব্যের মাধ্যামে প্রমাণ

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিদ্রোহী কবি পরিচয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বিদ্রোহী শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক অর্থে নন; তিনি বিদ্রোহী মানবমনের গভীরে প্রোথিত অন্যায়, বৈষম্য, কুসংস্কার, দাসত্ব, ধর্মান্ধতা এবং আত্মসমর্পণবোধের বিরুদ্ধে। নজরুল তাঁর কাব্য, গান, প্রবন্ধ ও জীবনদর্শনের মাধ্যমে এমন এক বিদ্রোহী মানবিকতার জন্ম দিয়েছেন, যা ঔপনিবেশিক শাসনের অমানিশায় ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল। তাঁর প্রথম কবিতা “মুক্তি” প্রকাশিত হয় ১৩২৬ সালের শ্রাবণ সংখ্যায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায়—সেখানেই প্রথম ধ্বনিত হয় মুক্তির আহ্বান, যা তাঁর পরবর্তী সৃষ্টির মূল সুর হয়ে ওঠে। নজরুল ছিলেন স্বাধীনতার কবি, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জাগরণের কবি, মানুষের অন্তর্গত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা এক অদম্য চেতনার প্রতীক।

 

নজরুল একজন বিদ্রোহী কবি- কাব্যের মাধ্যামে প্রমাণ

 

নজরুল একজন বিদ্রোহী কবি- কাব্যের মাধ্যামে প্রমাণ । নজরুলের ভাবনা

বিদ্রোহী কবি হিসেবে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত সম্পাদকীয় “অগ্নিশিখা”, যেখানে তিনি লিখেছিলেন—“বিদ্রোহের মতো বিদ্রোহ যদি করতে পার, প্রলয় যদি আনতে পার, তাহলেই নিদ্রিত শিব জাগিবে।” এই বাক্যগুলোতে নজরুলের বিপ্লবী মনোভাব, প্রতিবাদের আগুন এবং আত্মবিকাশের তীব্র আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টতই ফুটে ওঠে। এমন সাহসী উচ্চারণ তৎকালীন সমাজ–রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ছিল এক ব্যতিক্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এমন প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ নজরুলের কলম ছাড়া তখন খুব কমই কেউ দিতে পেরেছেন।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

১৯২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ধূমকেতু-র ‘গুজা’ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর ঐতিহাসিক কবিতা “আনন্দময়ীর আগমনে”, যা ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অগ্নিবর্ষণকারী এক রূপক–বিদ্রোহ। কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করা হয়, এবং নজরুলের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। রাজদ্রোহের অভিযোগে ১৯২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু কারাগারেও তিনি থেমে থাকেননি; বরং আরও জোরালোভাবে লিখেছেন প্রতিবাদের কবিতা, লিখেছেন কারাবন্দি জীবনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা—“কারার ঐ লৌহকপাট”—যা তাঁর রণসঙ্গীতের অন্যতম শিখর।

নজরুলের বিদ্রোহী পরিচয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ তাঁর অমর কবিতা “বিদ্রোহী”। ১৯২১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা থেকে কলকাতায় ফিরে এসে মোজাফ্ফর আহমেদের বাসায় তিনি মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই কবিতাটি রচনা করেন। ১৩২৮ সালের কার্তিক মাসে মোসলেম ভারত পত্রিকায় এটি প্রথম মুদ্রিত হলেও, জনসমক্ষে প্রথম পাঠিত হয় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক বিজলীতে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাটি সারা বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। “বিদ্রোহী” কবিতায় নজরুল নিজেকে কখনো বিশ্বতুল্য, কখনো মানবের অন্তর্লীন শক্তির প্রতিরূপ, কখনো প্রলয়, বজ্র, ঝড়, আগুন, কখনো প্রেমময়, কোমল, দয়াল—এভাবে মানবসত্তার সকল দ্বৈততাকে নিয়ে এক মহাজাগতিক বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠেন। কবিতাটি তার বর্ণনাভঙ্গি, চিত্রকল্প, অলংকার, ছন্দ এবং আবেগের শক্তির কারণে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করে।

এই কবিতা প্রকাশের পর নজরুল শুধু সাহিত্যিক নয়—সমগ্র জাতির নেতা, বিদ্রোহের প্রতীক, স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর হিসেবে চিহ্নিত হন। তাঁর পরবর্তী বহু রচনা যেমন—“সমাধি”, “প্রলয়োল্লাস”, “কুলি-মজুর”, “দারিদ্র্য”, “রমণীর অধিকার”—তাঁকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে একজন মানবতাবাদী বিদ্রোহী হিসেবে। সাম্যবাদ, নারীমুক্তি, শ্রমিক–কৃষকদের অধিকার—সবই নজরুলের বিদ্রোহের অন্তর্গত অংশ ছিল।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নজরুল শুধু রাজনৈতিক বিদ্রোহের কবি নন; তিনি ছিলেন মানবতার বিদ্রোহী কবি। তাঁর কবিতা সমাজের সকল শোষণ, পশ্চাৎপদতা, অজ্ঞতা, ধর্মান্ধতা, জাতিভেদ, ঔপনিবেশিক দাসত্ব—সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক তেজোদীপ্ত কণ্ঠ। তাঁর কলমের আগুন নিছক ধ্বংসের নয়; এটি ছিল জাগরণ, পুনর্জন্ম এবং স্বাধীনতার শিখা। তাই সাহিত্য–বিশ্ব একবাক্যে স্বীকার করে—কাজী নজরুল ইসলাম নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের চিরবিদ্রোহী কবি, এবং তাঁর কাব্যই এর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

Leave a Comment