কাজী নজরুল ইসলামের হাসির গান নিয়ে আজকের আলোচনা। নজরুল সঙ্গীতের অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক বিভাগগুলির মধ্যে হাসির গান বিশেষ বৈচিত্র্যে দাবি রাখে। গানগুলি সংখ্যায় বিস্তর না হলেও, কবি স্বল্প সংখ্যক হাসির গানের মধ্যে দিয়েই প্রকাশ করেছেন তাঁর সুতীক্ষ্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক অনুভূতি শক্তিকে।

কাজী নজরুল ইসলামের হাসির গান
নজরুল ইসলাম রচিত ‘চন্দ্রবিন্দু’ এবং ‘সুর সাকি’ সঙ্গীত গ্রন্থ দুটিতেই হাসির গানের সম্ভার পরিবেশিত হয়েছে। তাঁর রচিত হাসির গানগুলিকে যদি কয়েকটি বিভাগে চিহ্নিত করি, তাহলে কবির দৃষ্টিভঙ্গীর যথার্থ মূল্যায়ন করা সম্ভব।
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত হাসির গানের বিভাগ:
১. পরিবারকেন্দ্রিক
২. সামাজিক ও রাজনীতি বিষয়ক
৩. প্রেম বিষয়ক
8. বিচিত্র হালকা হাসির গান
ক. মানুষ ও পশুর কুশ্রী চেহারাকেন্দ্রিক ব্যঙ্গসঙ্গীত মানুষের হাস্যকর আচরণ কেন্দ্রিক গান
খ. হাস্যকর ঋতুবর্ণনা
গ. খাদ্যরসিকতা
ঘ. কমিক প্যারোডি

হাসির গানের বিষয় যাই হোক না কেন, প্রত্যেক বিষয়ের পেছনেই আছে কিছু অসঙ্গতি,- তা সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক অথবা ব্যক্তি কেন্দ্রিক-ই হোক না কেন। মানুষের জীবনে পরিবারের স্থান যেহেতু সকলের আগে, তাই শৈশব থেকেই পারিবারিক অসঙ্গতিগুলি মানুষকে যেমন পীড়া দেয়, তেমনই সৃষ্টি করে সুক্ষ্ম ব্যঙ্গ বিদ্রুপের অনুভূতি। আপন মনের বিরক্তিও প্রকাশিত হয় বিচিত্র ব্যঙ্গের মাধ্যমে।
কাজী নজরুল ইসলমের পারিবারিক সমস্যা কেন্দ্রিক হাসির গানগুলিতে এমনই কতকগুলি সমস্যাকে হালকা করে তোলার প্রচেষ্টা লক্ষিত হয়। এ ধরনের গানগুলিকে ইংরেজি পরিভাষিক শব্দের ঠিক কোন শ্রেণীতে ফেলা যায়, তা পরিষ্কার নয়, তবে আমাদের বাংলার মানুষের মনের ভাবগত দিক থেকে বিচার করলে যদি গানগুলিকে কোনো তাত্ত্বিক শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত না করে শুধু মাত্র হাসির গান বলেই চিহ্নিত করি তাহলে বোধহয় নির্মল হাসির সুযোগ পাওয়া যাবে তাড়াতাড়ি। যেমন :
বিয়ে করে গদাই
দেখলে সে আর উড়তে নারে
ভারী ঠেকে সদাই
সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক :
ব্যঙ্গাত্মক গানগুলির মধ্যে বিচার করে দেখলে সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক গান সৃষ্টিতে নজরুল ইসলাম সিদ্ধহস্ত। সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে সমাজ ও রাজনীতি বিষয়টি কবির কাছে ছিল অতি সহজ বক্তব্যের বস্তু- এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নজরুল ইসলামের ইতিহাস চেতনাও। ‘চন্দ্রবিন্দু’ সঙ্গীত গ্রন্থে ‘প্রাথমিক শিক্ষাবিল’, ‘সাইমন কমিশনের রিপোর্ট’, ‘সর্দা বিল’, ‘ডোমিনিয়ন স্টেটাস’, ‘লীগ অব নেশন’ ও ‘রাউণ্ডটেবিল কনফারেন্স’ – এই গুলি কাজী নজরুল ইসলামের সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতার ইঙ্গিত বহন করে।
সমাজে জাত বিভাজনের যে সমস্যা, তা শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমানদের ধর্মবিরোধ নয়, হিন্দু ধর্মের বর্ণাশ্রমের দ্বারা যে বিভেদনীতি মানুষের মনে গাঁথা হয়ে গেছে-, তারই ফলে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব কোনো অস্বাভিক কথা নয়, অথচ সমাজেসত্যি কি একে অপরকে ছেড়ে জীবন যাপন করা সম্ভব, – সেই প্রশ্নই করেছেন নজরুল ইসলাম তাঁর ‘জাতের জাতিকল’ গানটিতে।
– মেথরানীটা বললে,” “বাবু, জাত জান কি তোমার মায়ের?

প্রেম বিষয়ক হাসির গান :
প্রেম বিষয়ক হাসির গানগুলিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি। রাধাকৃষ্ণ। ও মনুষ্যপ্রেম বিষয়ক সঙ্গীত ।
রাধাকৃষ্ণের প্রেম বিষয়ক হাসির গানে রাধা ও কৃষ্ণ চরিত্র দুটি একেবারেই বাস্তব জগতের। বৈষ্ণব পদাবলীর প্রেমতত্ত্ব এখানে বিরল, রাধা ও কৃষ্ণ একেবারেই আমাদের আশেপাশের গ্রাম্য চরিত্র, তার মধ্যে দেবত্ব আরোপের কোনো চেষ্টাই কবি করেননি। চরিত্রগুলি একেবাইে লৌকিক নায়ক-নায়িকার সাদামাটা বৈশিষ্ট্য নিয়ে বর্তমান, কখনো বা আলট্রা মডার্ন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত, ‘পূজারিণী’ নাট্যের গান, ‘আমার ক্ষম হে ক্ষম নম হে নম’র সুরে নজরুল ইসলাম রচনা করেন ‘ওহে শ্যামো হে শ্যামো প্যারোডিটি। কবি শ্যামকে চিরাচরিত ‘কদম্বডাল’ থেকে নামিয়ে আনতে চেয়েছেন ব্যস্ত আধুনিক জগতে। কারণ একজন শ্যামের উদ্দেশ্যে আর রাধা, চন্দ্রাবলী, ললিতা, বিশাখা, বৃলাদূতী সকলের কাজ ছেড়ে ঘুরে বেড়াবার সময় নেই। আধুনিক প্রেক্ষাপটে যমুনার বদলে কলকাতা আর ঢাকার লোকের নমুনাকেই কবি যথেষ্ট বলে মনে করেছেন। সুতরাং ব্যস্ততম জগতে শ্যামকে নামতে হবে কদম্বডাল ছেড়ে
“ওহে শ্যামো হে শ্যামো, নামো হে নামো, কলম্ব ডাল ছাইড়ে নামো,
তুমি দুপুর রোদে বৃথাই ঘামো/ব্যস্ত রাধা কাজে,
ললিতা দেবী সলিতা পাকায়, বিশাখা স্কুলে হিল শাখায়,
বিচিত্র হালকা হাসি:
রাধাকৃষ্ণ প্রেম বিষয়ক ব্যঙ্গসঙ্গীতে কবি কখনো কখনো নেমে এসেছেন কঠিন বাস্তবিক মূল্যবোধের হাস্যকর বক্তব্য প্রকাশে। তখন গানে রাধা ও কৃষ্ণ শুধুমাত্র দেবত্ব ত্যাগ করেনি, পরিণত হয়েছে মনুষ্যেতর জীবে। “আমি দেখেছি তোর শ্যামে গানটিতে আয়ান ঘরণী রাধা বর্ণিত হয়েছে গাভীরূপে। সে রাখাল বালকের সন্ধান পেয়ে গোয়ালের দড়ি ছিঁড়ে চলে যায় কদমতলায়। ঘোষবংশজাত আয়ানের কাছে স্ত্রী রাধার চেয়ে বোধ হয় গোয়ালের গরুটির মূল্য অনেক বেশি, এমনই বাস্তুবিক ধারণাকে কাজে লাগিয়ে নজরুল ইসলাম তাঁর গানটিতে রাধা-গাভী- এমন এক আপাত হাস্যকর সমীকরণের সামাধান করলেন। যেমন :
“তুই মোর গোয়ালের ছিড়ে দড়ি
রাত-বিরেতে বেড়াস চড়ি
অতএব, জটিল জীবনের যা কিছু অভাববোধ ও অসঙ্গতি থেকে যে হাসির উদ্রেক, তা পুরোটাই ব্যঙ্গ জাতীয়, অর্থাৎ মস্তিষ্ক প্রণোদিত। সেখানে দিলখোলা নির্মল হাসির – পরিবর্তে আমাদের সামনে আসে তির্যক হাসির অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত। কিন্তু উপরে উল্লিখিত গানটিতে কবি যে হাসির ব্যঞ্জন বিতরণ করেছেন, তা আসলে অর্থপূর্ণ অথবা ইঙ্গিতবাহী হাসির চেয়ে অন্য কিছু নিয়ে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে। এক নিলখোলা হাসির দমকা হাওয়া এই বুঝি সত্যিকারর হাসি- সকল রূপ হাস্যরসের চরম পরিণতি ।

