বাংলা লোকসঙ্গীত বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্তঃপ্রাণ এক ধারাবাহিক শিল্পরূপ। এটি বাংলার মাটি, মানুষ ও সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি। এ সঙ্গীতে প্রকাশ পায় গ্রামীণ মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না, শ্রম-সংগ্রাম ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির রূপায়ণ। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সঙ্গীতে এই লোকজ ধারাকে এমনভাবে আত্মস্থ করেছেন যে, তাঁর রচিত লোকগানসমূহে একদিকে যেমন দেশজ মাটির ঘ্রাণ, তেমনি অপরদিকে উচ্চতর সঙ্গীতরসের পরিপূর্ণতা দেখা যায়।
নজরুল ছিলেন একাধারে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাধক, অপরদিকে বাংলার লোকজ সঙ্গীতেরও এক অনন্য রূপকার। তিনি ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি, গম্ভীরা, ঝুমুর, সাঁওতালী ইত্যাদি আঞ্চলিক ধারার সুর ও ভাব গ্রহণ করে তাঁর গানে এক স্বতন্ত্র পরিচয় সৃষ্টি করেন। তাঁর লোকসঙ্গীত শুধু লোকধারার অনুসরণ নয়; বরং তা তার আত্মাকে ধারণ করে, নতুন প্রাণ ও শিল্পরূপে প্রকাশিত হয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলামের লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য
কাজী নজরুলের লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য নিম্নে প্রদত্ত হলো-
নজরুলের লোকসঙ্গীতের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
১। বিচিত্র পর্যায়ের গান রচনা – নজরুল কেবল একটি ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি পল্লীগীতি, ঝুমুর, সাঁওতালী, গম্ভীরা, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া—সব ধারায় গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন। এতে তাঁর সঙ্গীতচিন্তার ব্যাপ্তি ও বহুমাত্রিকতা প্রকাশ পেয়েছে।
২। প্রাদেশিক সঙ্গীতের প্রভাব – নজরুলের লোকসঙ্গীতে পূর্ববাংলা (ময়মনসিংহ, কুমিল্লা) ও পশ্চিমবাংলার (বর্ধমান, বীরভূম, মেদিনীপুর) সঙ্গীতধারার ছাপ রয়েছে। স্থানীয় ভাষা, ছন্দ ও সুর তিনি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন।
৩। লোকজ বিষয়বস্তু – তাঁর গানের মূল কেন্দ্রে ছিল গ্রামীণ মানুষ। কৃষক, মজুর, রাখাল, নৌকার মাঝি, প্রেমে-বিরহে পীড়িত নারী—এই সকল চরিত্র তাঁর লোকগানের প্রাণ।
৪। সুর বৈচিত্র্য ও মৌলিকতা – নজরুল লোকসুরকে কেবল অনুকরণ করেননি; তিনি সেগুলোকে নিজের ভাব ও রাগসঙ্গীতের সঙ্গে মিশিয়ে অনন্য সুর সৃষ্টি করেছেন।
৫। বাণীর সাধারণতা ও নান্দনিকতা – তাঁর গানের ভাষা সরল, কিন্তু গভীর আবেগপূর্ণ। সহজ শব্দে তিনি হৃদয়ের গোপন অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
৬। সাঁওতালী পর্যায়ের গান রচনা – আদিবাসী সংস্কৃতির ছোঁয়ায় নজরুল রচনা করেছেন “ঝুমুর” ও “সাঁওতালী” ধাঁচের গান। এতে উপজাতীয় জীবনের সরল আনন্দ ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনবোধ ফুটে উঠেছে।
৭। ঝুমুর ধারা – ঝুমুর গানে নজরুল সৃষ্ট করেছেন অনন্য ছন্দের দোলন। “রনন ঝুমুর ঝুমুর বাজে” বা “তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়” ধরনের গান তাঁর লোকসঙ্গীতের ছন্দময় উদাহরণ।
৮। গৌরাঙ্গভক্তি ও গৌরীয় প্রভাব – পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বৈষ্ণব লোকসঙ্গীতের প্রভাব নজরুলের গানে প্রবল। প্রেম, ভক্তি ও ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা তাঁর গানে লোকভাবনার সঙ্গে মিশেছে।
৯। দেশপ্রেম ও মাতৃভূমির সৌন্দর্যচিত্র – তাঁর লোকগানে দেশপ্রেম, মাটির টান ও গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়েছে—“ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা” তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
১০। জাগতিক ও ঐশ্বরিক মানবদর্শন – নজরুলের লোকসঙ্গীতে মানবপ্রেম, ঈশ্বরপ্রেম ও জীবনদর্শনের সমন্বয় ঘটে। মানুষের মধ্যে তিনি দেখেছেন ঈশ্বরের রূপ।
১১। শাস্ত্রীয় নিয়মের বাইরে স্বাধীনতা – লোকসঙ্গীত পরিবেশনে কোনো কঠোর রাগতাল বা বিধিনিষেধ মানা হয় না। নজরুলও এই স্বাধীনতাকে সঙ্গীতসৃষ্টির প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
১২। তালের বৈচিত্র্য – নজরুলের লোকগানে কাহারবা, দাদরা, কাহারী, তেওড়া, একতালসহ নানা তালের ব্যবহার দেখা যায়, যা তার সুরকে প্রাণবন্ত করেছে।
১৩। বাংলা কাব্যগীতির ধারাবাহিকতা – রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে নজরুল কাব্যগীতি ও লোকসঙ্গীতের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করেন।
১৪। আধ্যাত্মিকতা ও ভক্তি ভাব – তাঁর অনেক লোকগান ভক্তিমূলক, যেমন শ্যামা সংগীত, কীর্তন, ইসলামি ভজন ইত্যাদি। এসব গানে আধ্যাত্মিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ রয়েছে।
১৫। অন্য সুরকারের প্রভাব ও সংমিশ্রণ – বাংলা, হিন্দুস্তানি ও আরবি-পার্সি সুরের সংমিশ্রণে নজরুল তাঁর লোকসঙ্গীতকে আরও বহুরূপী করে তুলেছেন।
১৬। প্রকৃতিনির্ভরতা – গ্রামীণ জীবনের আনন্দ-বেদনা, নদী, মাঠ, আকাশ, বৃষ্টি, ফুল, গাছপালা—সবকিছু তাঁর গানে সজীব হয়ে উঠেছে।
১৭। মৌখিক রচনা-প্রেরণা – লোকসঙ্গীতের মতোই নজরুলের অনেক গান মুখে মুখে প্রচারিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে।
১৮। আঞ্চলিক বৈচিত্র্য – তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষা ও উচ্চারণ ব্যবহার করেছেন, যা গানকে স্থানীয় আবেদন দিয়েছে।
১৯। লোকগীতি: গানের আদিরূপ – গবেষকদের মতে, নজরুলের লোকসঙ্গীত বাংলা গানের প্রাচীন ঐতিহ্যের পুনরুত্থান।
২০। মানবদর্শনের প্রতিফলন – তাঁর গানে মানুষ ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা, প্রেম, ঐক্য ও সাম্যের আহ্বান বারবার ফিরে আসে।
২১। ভাষার সরলতা – সহজ, মাটির ঘ্রাণময় ভাষা তাঁর লোকগানের প্রাণ।
২২। নিয়মহীন গতিময়তা – লোকগানের স্বতঃস্ফূর্ত ভাব নজরুল সযত্নে রক্ষা করেছেন। তাঁর গানে স্বাভাবিক ছন্দের দোল দেখা যায়।
২৩। আঞ্চলিক সুরের প্রভাব – প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সুরধারাকে তিনি গ্রহণ করেছেন, ফলে তাঁর লোকগানে এক বৃহৎ ভূগোলের প্রতিফলন ঘটেছে।
২৪। সার্বজনীনতা – নজরুলের লোকসঙ্গীত জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণি-পার্থক্য অতিক্রম করে মানুষের সার্বজনীন আবেগকে স্পর্শ করেছে।
