নজরুলের সাপুড়ে বাণী চিত্র

বাংলা সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাট্যকলা যেমন নজরুলের প্রতিভায় সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি চলচ্চিত্র জগতেও তিনি রেখে গেছেন অমলিন স্বাক্ষর। তাঁর বহুমুখী শিল্পীসত্তা শুধু কাগজ–কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রে আধুনিক সঙ্গীতধারার অন্যতম প্রবর্তক। এই সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন তাঁর ‘সাপুড়ে’ বাণীচিত্র—যা ১৯৩৯ সালের মে মাসে চলচ্চিত্রায়িত হয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রে নজরুল ছিলেন কাহিনীকার ও সঙ্গীতস্রষ্টা, যা তাঁর সৃষ্টিশীলতার আরেকটি অসামান্য দিক প্রকাশ করে। ছবির নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন খ্যাতনামা শিল্পী কাননবালা দেবী, যিনি সেই সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে নজরুলের দুটি গান—“আকাশে হেলান দিয়ে আছি” এবং “কথা কইবে না বউ”—প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা পায় এবং বাংলা চলচ্চিত্রসঙ্গীতের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে।

 

নজরুলের সাপুড়ে বাণী চিত্র

 

নজরুলের সাপুড়ে বাণী চিত্র । নজরুলের ভাবনা

 

নজরুল শুধু ‘সাপুড়ে’র মতো বাণীচিত্র রচনা করেই থেমে থাকেননি। তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের সুরকারদের একজন, যিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গীতকে আধুনিক ঢং, রাগভিত্তিক বিন্যাস ও দেশীয় লোকঘরানার মিশ্রণে নতুন ভাষা দান করেন। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ধূপছায়া’—বাংলায় এমন একটি ছবি, যেখানে তিনি শুধু পরিচালনা করেননি, বরং একটি চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। সাহিত্য, সঙ্গীত, নাট্যকলা ও অভিনয়—চলচ্চিত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁর শিল্পীসত্তার বিস্তৃতি প্রমাণ করে।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

১৯৩১ সালে নির্মিত প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’–এর সঙ্গীতায়োজনে নজরুল যুক্ত ছিলেন, যা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক মাইলফলক। একই বছর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী থেকে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রেও তিনি সুরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নজরুলের সুরায়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—শাস্ত্রীয় রাগের পরিস্কার ব্যবহার, সুললিত কণ্ঠকে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা, এবং নাটকীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই সুরের আবহ রচনা।

পরে তিনি ১৯৩৩ সালের পায়োনিয়ার ফিল্মস প্রযোজিত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন; এটি ছিল বাংলা পৌরাণিক সিনেমার সঙ্গীতে এক যুগান্তকারী সংযোজন। তাঁর সুরে তৈরি হয় ১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’, ১৯৩৫ সালের ‘পাতালপুরী’, এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ১৯৩৮ সালের ‘গোরা’—যেখানে তিনি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তাঁর নন্দনচেতনা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। এসব কাজই প্রমাণ করে যে বাংলা চলচ্চিত্রসঙ্গীতে নজরুল শাস্ত্রীয় রাগ, বাউল–কীর্তন–লেটো সুর এবং আধুনিক কাব্যসঙ্গীতের মিশ্রণে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন।

অন্যদিকে তিনি ছিলেন বহু ছবির গীতিকার। ‘রজত জয়ন্তী’, ‘নন্দিনী’, ‘অভিনয়’, ‘দিকশূল’—এই চলচ্চিত্রগুলোতে তাঁর লেখা গান চলচ্চিত্রসঙ্গীতের শিল্পমানকে আরও সমৃদ্ধ করে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর কাজ ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রে—যেখানে তিনি শুধু গীতিকার নন, বরং সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালকও ছিলেন। যদিও ‘চৌরঙ্গী’ ছিল হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র, নজরুল তবুও এর জন্য সাতটি হিন্দি গান রচনা করেন। তাঁর হিন্দি গানের বাণীতেও ছিল বাংলা কাব্যভাষার সৌরভ এবং হিন্দুস্থানী রাগের শাস্ত্রীয় অলংকার, যা ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে নজরুলের স্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠা করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে নজরুলের সমগ্র চলচ্চিত্রযাত্রা তাঁকে শুধু বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবিই নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রসঙ্গীতের অন্যতম ভিত্তিনির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর সুরে ছিল নাটকীয়তা, কাব্যিক প্রতিভা, রাগসঙ্গীতের শৈল্পিকতা এবং লোকরীতির প্রাণশক্তি—যা বাংলা চলচ্চিত্রকে দিয়েছে নতুন ভাষা, নতুন ছন্দ এবং নতুন সাংস্কৃতিক পরিচয়।

Leave a Comment