নজরুলের সঙ্গীত রচনার নন্দনতাত্ত্বিক দিক বাংলা গানকে কতটা সমৃদ্ধ করেছে : সাহিত্যিক হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় ও ব্যাপকতা অনেক অংশে কম। শুধুমাত্র সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তার গানের ব্যাপকতা সার্বিকভাবে পরিপূর্ণ।

নজরুলের সঙ্গীত রচনার নন্দনতাত্ত্বিক দিক বাংলা গানকে কতটা সমৃদ্ধ করেছে
বাংলাগানের সাহিত্যিক মূল্যায়ন করতে গেলে নজরুল সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সেখানে সংযোজন আবশ্যিক। নন্দনতাত্ত্বিক ধারায় নজরুল সাহিত্যের বৈশিষ্ট বিচার করতে গেলে সাঙ্গীতিক নন্দনতত্ত্বই বাংলা গানে প্রাধান্য পাবে। সে কারণে সাহিত্যিক নজরুলের সৃষ্টিকে বিশ্লেষণ করলে তার সাহিত্য কর্মের নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়।
মন্তব্য : (১) নারায়ন চৌধুরী রচিত “নজরুল সাহিত্যের মূল্যায়ন” গ্রন্থে প্রভাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য সাহিত্যিক মূল্যাবোধে এবং নন্দন তত্ত্বের সংজ্ঞা অনুসারে নজরুল সাহিত্যেও সঙ্গীত শুধু নান্দনিক বৈশিষ্ট্যের অনুসারি ।
নজরুল সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্ব :
আমরা জানি যে-কোনো শিল্পের বাহ্যিক উপস্থানপনই নন্দনতত্ত্ব। সে আলোকে নজরুল সৃষ্ট সাহিত্য-কর্মের বৈশিষ্ট্য বিচার করতে গেলে বাংলা গানকে সন্মানিত করেছে তার সঙ্গীত। সঙ্গীতে বিভিন্ন পর্যায়ের গান বাংলা গানের ধারাবাহিকতাকে বিভিন্নভাবে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। সাহিত্যিক মূল্যবোধে নজরুল সৃষ্ট সাহিত্য নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশেষ মহত্বপূর্ণ। তাঁর কাব্য প্রতিভা তার কবি জীবনকে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিল।
নজরুল সাহিত্য কর্মের প্রেক্ষাপট ও উৎস
১৯০৫ সাল থেকেই মোটামুটিভাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দালন বঙ্গভঙ্গ সবকিছু মিলিয়ে উপমহাদেশে একটি প্রতিবাদের দৃঢ় প্রত্যয় বিন্যাসিত হচ্ছিল। কবি নজরুল ছোটবেলা থেকেই সুধী বৈষ্ণব সঙ্গীত, অনুরাগী, প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি অবস্থান করতেন। সে কারণে নজরুল রচনায় প্রেক্ষাপট (হোক সঙ্গীত, কাব্য, গল্প, প্রবন্ধ) বিদ্রোহ অনুভব, সাঙ্গীতিক বিচরণ, সর্বক্ষেত্রেই উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো সংযোজিত হয়েছে। নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য গানে ও কাব্যে সঠিকভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। যার ফলে পঞ্চ-গীতি কবির সঙ্গীত বিশ্লেষণ সাপেক্ষে নজরুলের গানের বিচরণ সর্বোপরি ।
বাংলা গানে নজরুলের সাহিত্য ও সঙ্গীতের অলংকার প্রসঙ্গ :
সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ নারায়ণ চৌধুরী নজরুলের কাব্য ও গানের অলংকার প্রসঙ্গ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। কিন্তু সেখানে বাংলা গানের সমৃদ্ধি বা বাংলা গান কতটুকু সফল নজরুল রচনায় তার এতটা উল্লেখ পাওয়া যায়নি। কিন্তু নজরুল সাহিত্য ও সঙ্গীত বাংলা গানের বিবর্তনে একটি অলংকার প্রক্রিয়া। বিশেষ করে সঙ্গীতের বৈচিত্রতা বাংলা গানকে আধুনিক ধারায় অনুপ্রাণিত করেছে। যদিও নজরুল সাহিত্য তার চেয়ে পিছিয়ে। নজরুলের কাব্য গল্প গান প্রবন্ধ ছন্দগত ও অলংকারিক দিক দিয়ে সাফল্য জনক। নজরুল রচনা সর্বোপরি না হলেও বাংলা গানের ব্যাপ্তিতে নজরুলসঙ্গীত পরিপূর্ণভাবে সার্থক।

নন্দনতত্ত্বের আলোকে নজরুলসঙ্গীতের পর্যায়ভিত্তিক সুর বিশ্লেষণ :
পর্যায়ভিত্তিক সঙ্গীত রচনা ও সঙ্গীত বিশ্লেষণে নজরুল সবার শীর্ষে। এখানে মোটামুটি ১০টি পর্যায় ভিত্তিক রচনার বিশ্লেষণ দেখানো হলো
(১) কাব্যগীতি :
কাব্যগীতি হলো নজরুলের যে-সকল গানের বাণী এবং সুর সমপ্রাধান্য ভাস্বর। নন্দনতত্ত্বের সংজ্ঞা অনুসারে বাণী এবং সুরের বাহ্যিক প্রকাশ কাব্যগীতিতে সার্বিকভাবে পরিপূর্ণ যা বাংলাগানের বিবর্তনে নজরুলের নান্দনিক ধারা অব্যাহত রেখেছে।
(২) রাগপ্রধান :
নজরুল সৃষ্ট সঙ্গীতের বিশেষ একটি পর্যায় হলো নজরুলের রাগপ্রধান গান। রাগপ্রধান হলো রাগশ্রী কাব্যগীতি। যা কোনো রাগের উপর নির্ভর করে রচিত। পঞ্চ-গীতি কবির গানের নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনায় আমরা দেখেছি। রাগপ্রধান গানের মতো অন্য কোনো গীতিকারের গান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারা অনুসারে এটা নান্দনিকতা অর্জন করেন নি। সে কারণে নজরুলের গানে রাগপ্রধান গানশাস্ত্রীয়ভাবে সমাদৃত ।
(৩) শ্যামা :
পর্যায়ভিত্তিক গান রচনার মধ্যে নজরুলের শ্যামা সঙ্গীত একটি ভিন্ন গীতরীতির পরিচায়ক। কালী বিষয়ক ভক্তিমূলক গানকে শ্যামা সঙ্গীত বলে। শ্যামা সঙ্গীতের আংশিক রামপ্রসাদী গানের ভিত্তি যদিও, তবুও নজরুল সৃষ্ট শ্যামা সঙ্গীতের সুরের আঙ্গিক, গায়কী সবকিছু ভিন্নধর্মী যা বাংলা গানের ধারায় একটি ভিন্ন গীতিশৈলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
(৪) দেশাত্মবোধক গান
দেশাত্মবোধক গানের ক্ষেত্রে বাংলা গানের বিবর্তনের পঞ্চ কবির গীত রচনায় সার্থক সুর বিন্যাস বহমান। এক্ষেত্রে রবী ঠাকুরের গান সার্থক নান্দনিকতা লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশাত্মবোধক গানের সুর এবং বাণীর বিশ্লেষণ বৈচিত্র্যমুখী। যা সাধারণ মানুষের কাছে বিন্যাসিত এবং সুর সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য । নজরুলের দেশের গানও তেমনি সমানভাবে সমাদৃত ।
(৫) খেয়াল :
শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুসারে তাল সহযোগ মুক্ত স্বর বিন্যাসই খেয়াল। নজরুল সৃষ্ট খেয়াল গানের সুর বিশ্লেষণ নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ সার্থক। কারণ এর বাণী বিন্যাস, গায়কী পূর্ণ একটি খেয়ালের অবস্থান বহন করে। যে কারণেই বাংলা গানের বিবর্তনে নজরুলের খেয়াল গান একটি পরিপূর্ণ গীতরীতি।

(৬) নজরুলের ধ্রুপদ পর্যায়ের গান :
পর্যায়ভিত্তিক রচনার একটি অধ্যায় নজরুলের গ্রুপদ অঙ্গের গান। যদিও সংখ্যায় অনেক কম। তবুও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারায় এর ব্যাপ্তি অনেক যা বাংলা গানকে করেছেন সার্থক পরিপূর্ণ। নজরুলের ধ্রুপদ অঙ্গের গান বিশেষ করে বাণী প্রধান।
সুরের আঙ্গিক মোটামুটি সাধারণভাবে বিন্যাসিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধ্রুপদ অঙ্গের গান নজরুলের ধ্রুপদ অঙ্গের গান সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। নজরুলের ধ্রুপদ অঙ্গের গান আমরা স্বাধীনভাবে নিজের গায়কী উপস্থাপন করতে পারি যা রবীন্দ্রনাথের গানে সম্ভব নয়। সে প্রেক্ষাপটে বাংলা গানের বৈচিত্র্যতায় নজরুলের ধ্রুপদ অঙ্গের গান নান্দনিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
(৭) ধামার :
নজরুল ধামার পর্যায়ের গান তেমন রচনা করে যেতে পারেননি। তবুও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল ভাণ্ডারের একটি অধ্যায় বাদ যাতে না যায় সে কারণে হয়তো-বা তাঁর ধামার পর্যায়ের গান সৃষ্টি। সুরের বিশ্লেষণের দিক দিয়ে মোটামুটি সহজভাবে বিন্যাসিত তালের দিক দিয়ে ধামার এবং চৌতালের সার্থক সমাবেশ দেখা যায়। রবীঠাকুরের ধামার এবং নজরুল সৃষ্ট ধামার বিশেষভাবে বাংলা গানকে অলংকৃত করেছে।
কীর্তন :
নজরুলের কীর্তন পর্যায়ের গান বাংলা কীর্তন তথা বাংলা গানকে অনেকাংশে আলোকিত করেছে। নজরুল সৃষ্ট কীর্তনের গায়কী তথা সুর বৈচিত্র্য পঞ্চ- গীতি কবির গানের বৈশিষ্ট্যকে বাংলা গানের ধারায় সমৃদ্ধির সার্থকতা প্রদান করেছে।
উদ্দীপনামূলক গান :
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তথা বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের অনুপ্রেরণা অনেকাংশে যুগিয়েছিল নজরুলের উদ্দীপনামূলক গান।
১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে গানগুলি অনুপ্রেরনা যুগিয়েছিল।
যেমন (১) কারার ঐ লোহ কপাট। (২) বল নাহি ভয় নাহি ভয় ।

লুপ্তরাগ এবং দক্ষিণী রাগের গান :
নজরুল তার গানের বৈচিত্র্যসাধন ও বাংলা গানের ভাণ্ডারকে এগিয়ে নেবার জন্য তার গানে লুপ্ত রাগের ব্যবহার করেছেন যাতে করে সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্যতা, সুরের বিন্যাস, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি নজরুলসঙ্গীতে উপস্থাপিত হয়।
যেমন (১) দক্ষিণী রাগের গান কাবেরী নদী জলে কেগো বালিকা।
(২) লুপ্ত রাগের গান শুভ্র সমজ্জ্বল হে চির নির্মললাচ্ছাশাখ। যেহেতু বাক্যটি বাংলা গানের সমৃদ্ধি প্রসঙ্গ সে কারণে বাংলা গানের বিবর্তনের ক্ষেত্রে নজরুলসঙ্গীতই ব্যাপক অবদান রেখেছে। সঙ্গীতের নান্দনিক অবস্থান, সাঙ্গীতিক গ্রহণযোগ্রতাই বাংলা গানের ধারাবাহিকতাকে সার্থক রূপ দিয়েছে। নজরুলের কাব্য নান্দনিক দিক সুদৃঢ় হলেও তা বাংলা গানের ভাণ্ডারকে এতটা সার্থক রূপ দিতে পারেনি। শুধুমাত্র কয়েকটি কাব্য গানরূপে আত্মপ্রকাশ করে।
যেমন: ১. করার ঐ লৌহ কপাট
২. চল চল চল
(১) করার ঐ লৌহ কপাট-
অনেকে মনে করেছিলেন এই কবিতাটি অর্থাৎ এই গানটি কবির জেলে বসে লেখা। এই কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস সম্পাদিত “বাংলার কথা” পত্রিকার জন্যে। মূলত গানটি কবি লিখেছেন তৎকালীণ সময়ের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সোচ্চার প্রতিবাদ স্বরূপ।
প্রকাশকাল, ১৯২২ সালের ২০ জানুয়ারি।
(২) চল চল চল –
চল চল চল কবিতাটি মূলত তৎকালীন সময়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তথা তরুণ প্রজন্মকে ব্রিটিশ বিরোধী শাসনে জাগ্রত করবার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। এই কবিতাটি প্রথমে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরিবর্তীতে তা সঙ্গীতরূপে আত্মপ্রকাশ করে। প্রকাশ কাল ১৩৩৩।
প্রবন্ধ:
প্রবন্ধ মূলত বাংলা সাহিত্যের একটি অংশ। সেক্ষত্রে নজরুলের প্রবন্ধ তারই বৈশিষ্ট্য বহন করে। এ তথ্য প্রমাণিক। নজরুলের রচনার সমৃদ্ধির আলোচনা করতে গিয়ে নজরুলের প্রবন্ধকে আমরা মুল্যায়ন করতে পারি।
গল্প :
পঞ্চ-গীতি কবিদের মধ্যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুলই সাহিত্যের সকল বিভাগে আরোহন করেছিলেন। নজরুল সৃষ্ট গল্প তারই একটি অংশ। যার ভূমিকা বাংলা গানের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
উপসংহার :
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, বাংলা গানের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে নজরুলসঙ্গীতের ভূমিকা অপরিসীম। কাব্যের ভূমিকা সাধারণভাবে নান্দনিক ক্ষেত্রে আংশিক থাকলেও নজরুলের সাঙ্গীতিক অবকাঠামোই বাংলাগানের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে নান্দনিকত লাভ করেছে।

