নজরুলের শেষ ভাষণ

বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের পরিধিতে কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতি যেমন যুগান্তকারী, তেমনি তাঁর জনজীবন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও ছিল বিস্ময়করভাবে বহুমাত্রিক। সেই অসাধারণ জীবনের শেষ প্রকাশ্য ভাষণটি তিনি প্রদান করেন ১৯৪১ সালের ৫ এপ্রিল, কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউটে মুসলিম সাহিত্য সমিতির রজতজয়ন্তী উৎসবে। এই ভাষণ ছিল তাঁর উদ্দীপ্ত চিন্তা, মানবতাবাদী বাণী ও সাহিত্যসম্ভারের প্রতি অনুরাগের শেষ স্বরভঙ্গি—যার পর শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা তাঁকে জনসম্মুখ থেকে সরিয়ে দেয় অনেকটা আকস্মিকভাবেই। গবেষকেরা বলেন, ওই ভাষণে তিনি সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা এবং মানবকল্যাণের আদর্শ নিয়ে গভীর মনোজ্ঞ আলোচনা করেছিলেন। যেন তাঁর পুরো সাহিত্যদর্শন ও মানবিকতাবোধ একত্র হয়ে শেষ বারের মতো মানুষের সামনে উচ্চারিত হয়েছিল।

নজরুলের শেষ ভাষণ

 

নজরুলের শেষ ভাষণ । নজরুলের ভাবনা

১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময় থেকেই নজরুলের স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি শুরু হয়। হঠাৎ করেই তিনি বাকশক্তি হারাতে থাকেন—যা তাঁর অসুস্থতার সবচেয়ে দুঃসময়ের সূচনা। জুলাইয়ের দিকে অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তিনি এক গভীর স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা তখন তাঁকে হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক এবং বিভিন্ন দেশীয় চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল পরিস্থিতির কারণে বিদেশে উন্নত নিউরো-সার্জারি করানো সম্ভব হয়নি; ফলে চিকিৎসা যথাযথ পর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং ১৯৪২ সালের শেষ দিকে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। সাহিত্য, সঙ্গীত ও সমাজচিন্তার যে প্রবল স্রোত এক সময় তাঁর মধ্যে প্রবাহিত হত, তা যেন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে নজরুল পরিবার দীর্ঘ দশ বছর ভারতের বিভিন্ন স্থানে নিভৃত জীবনযাপন করেন। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তাঁরা প্রায় নির্জন অবস্থায় কাটিয়েছেন। পরে কবি ও তাঁর পত্নী প্রমীলাকে রাঁচির মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয় চিকিৎসার আশায়। নজরুলের আরোগ্যের লক্ষ্যে গঠিত ‘নজরুল চিকিৎসা কমিটি’ এবং তৎকালীন বরেণ্য রাজনীতিবিদ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই উদ্যোগ গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কবি সেখানে প্রায় চার মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন, যদিও তাঁর অসুস্থতা আর পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করেনি। এরপরের জীবন কাটে নিভৃততা, নীরবতা এবং স্মৃতিভারাক্রান্ত এক দীর্ঘ অন্ধকার ঘেরাটোপে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্র তার জাতীয় কবিকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। ঢাকায় তাঁকে প্রদান করা হয় নাগরিকত্ব, সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরম পরিচয়। কিন্তু তাঁর শারীরিক সুস্থতার আর কোনো উন্নতি হয়নি। ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি আবারও তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি দেখা দেয় এবং জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়)। সেখানে তিনি নীরব, অভিব্যক্তিহীন, তবু জাগ্রত স্মারকের মতো উপস্থিত ছিলেন—যেন তাঁর সমগ্র সাহিত্যকীর্তি, গান, বিদ্রোহ ও মানবতার বাণী তাঁরই নীরব শরীরের মাধ্যমে যুগযুগান্ত ধরে কথা বলে যাচ্ছিল।

মোটকথা, ১৯৪১ সালের সেই শেষ ভাষণই ছিল নজরুলের জনসমক্ষে উচ্চারিত শেষ প্রজ্জ্বলিত বাণী—যার পর তাঁর কণ্ঠ থেমে গেলেও, তাঁর সাহিত্য, সঙ্গীত, বিদ্রোহ ও মানবতার অমোঘ বার্তা আজও অম্লান হয়ে বেঁচে আছে বাঙালির হৃদয়ে।

Leave a Comment