নজরুলের লেটোগান ও মেঠো কবিতা । নজরুলের ভাবনা

নজরুলের লেটোগান ও মেঠো কবিতা : ১৯৩৮ সাল নজরুলের বয়স যখন ঠিক ৯ তখনি তাঁর পিতৃ বিয়োগ ঘটে । নজরুল সবেমাত্র গাঁয়ের মক্তবের পর্ব শেষ করেছেন। পড়াশুনায় তাঁর মেধা ছিল বটে। কিন্তু প্রাথমিক পরীক্ষা পেরিয়ে বিদ্যালয়ে উচ্চতর মহলে উন্নীত হবার বৈষয়িক সামর্থ নজরুলের একবারেই ছিল না।ফলে ওই মক্তবেই প্রায় সমবয়সীদের পাঠের তালিম দেবার দায়ভার নিতে হলো দশ বৎসরের দুঃখুমিয়াকে, খুদে পাঠশালায় খুদে পণ্ডিত হয়ে রোজগারের সেই প্রথম ধান্দা।

 

নজরুলের লেটোগান ও মেঠো কবিতা

 

নজরুলের লেটোগান ও মেঠো কবিতা

চুরুলিয়া গ্রামের পাশেই পীরপুকুরের সুফী সাধক হাজি পালোয়ানের ১টি মাজার ছিল সেখানে নজরুল খাদেম এবং মসজিদে ইমামতির কাজও করেছেন। কারণ দরিদ্র পরিবারে ভরণপোষনের দায়িত্ব নজরুলকেই বহন করতে হয়েছিল। সৃষ্টির নির্মম কষাঘাতে নজরুল নিজেকে সত্যিকারের পরিবারের কল্যাণে সহায়ক হিসাবে সর্বদা নিয়োজিত রেখেছেন।

অনেকের ধারণা নজরুল ১৯১১ সালে রানীগঞ্জ মাথরুনের নবীন চন্দ্র ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন। মাথরুন স্কুলে পড়াশুনার সময় নজরুল সুপ্রতিষ্ঠিত লেটোদলের প্রতি আবেশ অনুভব করেন। লেটোনলের সাথে নারুলের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টি কিংবদন্তী হয়ে আছে।

 

নজরুলের লেটোগান ও মেঠো কবিতা

 

লেটোকে রাঢ় বাংলার কয়েকটি জেলায় প্রচলিত লোকসংস্কৃতি, কথকতা, পাঁচালী, যাত্রা, ভাদু, টুসু, ঘাটু প্রভৃতি ধারায় সহযাত্রী বলা হয়। লেটোগান একপ্রকার নৃত্য অভিনয় সম্বলিত গীতবহুল পালা গান, যাতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উৎকর্ষ বিচারের রীতিটি কৰি আখড়াই যুগের স্মারক মাত্র। লেটোগান মূলত ইতিহাস, পুরান, সমকালীন ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ের উপর রচিত এক প্রকার গীতরীতি।

তরজা জাত দু’দলে বিভক্ত হয়ে যেয়ে উত্তর-প্রত্যুত্তর মূলক এই গানে হাস্য কৌতূক ও রহস্য প্রায় সমগৌরবে প্রচলিত একপ্রকার গান হিসাবে তৎকালীন সময়ে শোভা পায়। মূলত লেটো গান হলো ধর্মাচার সংযুক্ত প্রমোদ পরিবেশনই এ গানের উদ্দেশ্যে। মূলত মুসলমান গায়কদের আগমন বেশি থাকায় ইসলাম ধর্মের প্রাধান্য বেশি ঘটেছিল।

 

নজরুলের লেটোগান ও মেঠো কবিতা

 

নজরুলের পিতৃব্য ফজলে করিম ছাড়া কাজী ফৈজাল আহমদ সিদ্দিকাও এই বংশেরই আরেক লেটো শিল্পী যিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। নজরুলের লেটো শুরু হিসাবে তিনি শেখ গোদাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মূলত বৈচিত্রময় প্রতিভার কারণে লেটোদলে নজরুলের কদর বেরেছিল।

নজরুলের রচনাবলীতে প্রমাণতথ্যের ভিত্তিতে যে পালাগুলো পাওয়া যায় সেগুলো প্রায় সবই হিন্দু পুরান ও সংস্কৃতি বিষয়ক। যেমন-শকুনিবধ, মেঘনাবধ, দাতাকর্ণ, যুধিষ্ঠি কালিদাস, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, চাষার সঙ, রাজপুত্র, ঠগপুরের সঙ, আকবর বাদশা ইত্যাদি।

 

google news logo

 

নজরুলের অসাধারণ পাণ্ডিত্যের জন্য তাকে লেটোদলের “ছোট ওস্তাদজি” লেটোদলের দলপতি বা উপদলপত্তি হিসাবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। শৈশব থেকেই নজরুলের মধ্যে সাঙ্গীতিক পাণ্ডিত্যের অবস্থান লক্ষ করা গিয়েছে। লেটো গান ও মেঠো কবিতা রচনায় তিনি নিজের প্রতিভাকে বিভিন্নভাবে প্রমাণ করেছেন। বর্ধমান বাকুরা ও বীরভূম এই তিন জেলার হিন্দু-মুসলমান শিক্ষিত-অশিক্ষিত পল্লীবাসীর মুগ্ধ দৃষ্টি ও শ্রবণ রসিক কানকে নজরুল এটুকুন বয়সে সুরসুধায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন।

নজরুলের লেটোগান ও মেঠো কবিতা

Leave a Comment