নজরুলের লক্ষণগীত । নজরুলের ভাবনা

নজরুলের লক্ষণগীত : শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুসারে তাল সংযোগে সুরারোপিত বাণীর মাধ্যমে রাগলক্ষণ প্রকাশ করাকে লক্ষণগীত বলে ।

নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবনে ১৯৩৯ সাল থেকে নজরুল মূলত লক্ষণগীত রচনা করবার অনুভূতি প্রকাশ করেন। যদিও মাত্র ৬টি লক্ষণগীত তিনি রচনা করে গেছেন। অন্যান্য পর্যায়ের গানের মতো লক্ষণগীত রচনায় তিনি এতটা সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। আমরা নিয়ে নজরুলের লক্ষণগীত রচনা সম্পর্কে আলোচনা করব।

 

নজরুলের লক্ষণগীত

 

Table of Contents

নজরুলের লক্ষণগীত

তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া উপস্থাপন করবার মাধ্যমে নজরুলের লক্ষণগীত সম্পর্কে জানতে পারব।

(১) মন্তব্য: অমিত সুদন মৈত্রের “নজরুলের গান” নামক প্রবন্ধে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত নজরুলসঙ্গীত বর্ণনায় তিনি উল্লেখ করেছেন,

যদিও নজরুল ১৯৩৯-৪০ সালের দিকে লক্ষণগীত রচনা করেন। কারণ তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কোনো অধ্যায় বাদ রেখে যেতে চাননি।

(২) নজরুলের লক্ষণগীত নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীত প্রবর্তক ডি.এল. রায়ের পুত্র দিলিপ কুমার রায়। তিনি বলেছেন,

“কাজী নজরুলের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারার গানের অবস্থান কিছুটা সঠিক হলেও লক্ষণগীত রচনায় তাঁর খামখেয়ালী ছাড়া অন্যকিছু নয়” । “নজরুলের গান এবং বাংলা গানের ধারা” নারায়ণ চৌধুরী। পৃষ্ঠা নং-৩০১

(৩) শাস্ত্রীয় লক্ষণগীত এবং নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত :

লক্ষণগীতের সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করতে গেলে স্বাভাবিকভাবে বাণী, তাল, বাদী, সমবাদী, সময় প্রভৃতি বর্ণিত হয়। কিন্তু নজরুলের লক্ষণগীতে আমরা দেখেছি তিনি ভাতখণ্ড রচিত দশটি ঠাটকে নিজস্ব ধারা বা প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি ছয়টি লক্ষণগীত সৃষ্টি করেন। যার অবস্থান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের লক্ষণগীত থেকে ভিন্নধর্মী।

যদিও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের লক্ষণগীতের মতো নজরুল রচিত লক্ষণগীত পরিবেশন সম্ভব নয়। বিভিন্ন সঙ্গীত বিশেষজ্ঞগণ যদিও নজরুলের সুন্দর সৃষ্টিকে পরিবেশন করবার চেষ্টা করেছেন। ভারতীয় সঙ্গীত ধারায় শিক্ষাগ্রহণ করেছেন, যিনি ভারতীয় সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের একজন, ডঃ গৌরী মুখার্জি নজরুলের লক্ষণগীত নিয়ে গবেষণা করেছেন। যা ১৯৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সঙ্গীত একাডেমি পত্রিকায় প্রকাশ পায়।

তিনি লিখেছেন, “সুর বৈচিত্র্যতায় এবং বাংলাগানের ধারায় কোনো পর্যায় বাদ না রাখার কারণে নজরুল লক্ষণগীত নিয়ে ভিন্ন ধারার একটি রচনা উপস্থাপনা করেন। যদিও তা আলোচিত ও সমালোচিত।”

 

নজরুলের লক্ষণগীত

 

(৪) নজরুলের লক্ষণগীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের লক্ষণগীতের ব্যবহৃত তাল প্রসঙ্গ:

নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের লক্ষণগীত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের লক্ষনগীতে সর্বক্ষেত্রে তালের ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত শুধুমাত্র শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারায় দর্শন তাত্ত্বিক উপস্থাপন। কারণ নজরুলের লক্ষণগীত পরিবেশন করবার মতো নয়। লক্ষণগীত পরিবেশনের উপযোগী না হলেও তালের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।

(৫) বাণী বিন্যাস :

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে লক্ষণগীত বা বাণী তাল সহযোগে উপস্থাপিত হয়। বাণী সহযোগে রাগের পরিচিত প্রকাশ যদিও লক্ষণগীত। কিন্তু নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত বাণীবদ্ধ নয়। শুধু দশটি ঠাটের একটি ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা।

(৬) নজরুলের লক্ষণগীতের নান্দনিক আলোচনা :

নন্দনতত্ত্বের সংজ্ঞা হলো যে কোনো শিল্পের বাহ্যিক উপস্থাপন। নন্দনতত্ত্ব ও শিল্প দুটো স্বাভাবিকভাবে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। নন্দনতাত্ত্বিক দিক বিবেচনা করতে গেলে নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত যদিও একটি শিল্প ও ললিত কলার একটি অংশ কিন্তু নান্দনিকতায় তা পরিপূর্ণতা পায়নি। সে হিসেবে নজরুলের সৃষ্ট লক্ষণগীত আলোচিত ও সমালোচিত।

নজরুলের লক্ষণগীত

১৯৫৭ সালে “পশ্চিম বঙ্গীয় সঙ্গীত ও সাহায্য” সম্মেলনে সঙ্গীত বিশেষজ্ঞরা নজরুলের বিভিন্ন ধারার সঙ্গীত এবং রচনা নিয়ে গবেষণা করেন। সেখানে এই সিদ্ধান্ত হয় যে নজরুল শুধু তাঁর সঙ্গীত ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণ করবার জন্যে ৬টি লক্ষণগীত লিখে গিয়েছেন। যা শৈল্পীক দৃষ্টিতে কখনও পরিবেশিত হয়নি বা নান্দনিকতা পায়নি”

(৭) নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীতের ভাষা :

সাধারণত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে লক্ষণগীতের ভাষা হিন্দি ও ব্রজবুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়। কিন্তু ভাষাগত বিন্যাসে বা ভাষাগত অবস্থান নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীতে একেবারে নেই বললেই চলে। কারণ নজরুল তাঁর লক্ষণগীত পরিবেশনার জন্যে সৃষ্টি করে যাননি। ১৯৪০-৪১ সালের দিকে তাঁর সৃষ্ট লক্ষণগীত প্রকাশ পায়। যদিও সে সময়ে এগুলোকে আরও সুন্দর করবার সামর্থ শক্তি কোনোটাই তাঁর ছিল না।

 

নজরুলের লক্ষণগীত

 

(৮) শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারা অনুযায়ী নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত :

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়ম বহির্ভূত নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত সাধারণত আমরা দেখছি লক্ষণগীত মানেই শাস্ত্রীয় পরিচয়, পরে সার্গামগীত, সার্গামগীতের পরেই লক্ষণগীতের অবস্থান। কিন্তু নজরুল রচিত লক্ষণগীতে এর কোনোটাই বর্ণিত হয়নি। সে কারণেই নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত সমালোচিত।

যেমন শ্রী সুবোধ সেনের “বাংলা গানের তত্ত্বীয় কথা” নামক গ্রন্থে সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ প্রভাত চট্টোপাধ্যায় “নজরুলের রচনা ও সঙ্গীত” নামক প্রবন্ধে লিখেছেন,”বাংলা গানের আধুনিক পর্বে নজরুলের অতুলনীয় সাফল্য। কিন্তু তাল, রাগ এবং লক্ষণগীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমি একমত নই।”

(৯) পর্যায়ক্রমিক ভিত্তিতে ৬টি লক্ষণগীত রচনায় নজরুলের ঠাট নির্বাচন :

(১) বিলাবল (২) খাম্বাজ (৩) কাফি (৪) আশারবী (৫) ভৈবর (৬) ভৈবরী (৭) কল্যাণ (৮) মারওয়া (৯) পূরবী (১০) টোরী ।

(১০) নজরুল সৃষ্ট দশটি ঠাটের জোড়া বিন্যাস :

(১) বিলবল
খাম্বাজ

(২) কাফি
আশাবরী

(৩) ভৈরব
ভৈরবী

(৪) কল্যাণ
মারওয়া

(৫) পূরবী
টোরী

(১১) ৬টি লক্ষণগীত রচনা ভুক্ত ঠাট :

(১) বিলাবল
খাম্বাজ

(২) কাফি
আশারবী

(৩) কল্যাণ
মারওয়া

 

নজরুলের লক্ষণগীত

 

(১২) জোড়া বিন্যাস পদ্ধতিতে নজরুল সৃষ্ট ঠাটের অন্তর্ভুক্ত রাগের নাম

(১) প্রথম জোড়া-বিলাবল + খাম্বাজ }
সৃষ্ট রাগ- (১) শংকরা জন্য রাগ

(২) রাগেশ্রী – জন্য রাগ।

(২) দ্বিতীয় জোড়া কাফি + আশারবী }

সৃষ্ট রাগ -প্রদীপকি-জন্য রাগ

আশারবী-জনক রাগ।

(৩) তৃতীয় জোড়া- কল্যাণ + মারওয়া
সৃষ্ট রাগ-সুদ্ধ কল্যাণ-জন্য রাগ
বিভাস জন্য রাগ।

(১৩) নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীতের সুরের আঙ্গিক বিশ্লেষণ :

১। শংকরা সব স্বর শুদ্ধ
২। রাগেশ্রী, নিখাদ কোমল
৩। প্রদীপকি গান্ধার ও নিসাদ কোমল
৪। আশারবী ও দ কোমল
৫। শুদ্ধ কল্যাণ মধ্যম কড়ি
৬। মারওয়া রেখার কোমল ও মধ্যম কড়ি।

(১৪) নজরুলের লক্ষণগীত প্রচার :

১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর কোলকাতার আকাশবাণী বেতার থেকে মেল ও মেলন নামক অনুষ্ঠান প্রচার হয়। যা গ্রহণযোগ্যতা কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া সবার কাছেই ছিল।

(১৫) নজরুলের লক্ষণগীত সৃষ্টির সার্বিক মূল্যায়ন

পর্যায়ভিত্তিক সৃষ্টির পর্যায় ক্রমিকধারা অনুসারে নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত একটি প্রামাণিক শাস্ত্রীয় উপস্থাপন। যদিও সঙ্গীত বোদ্ধা ও সঙ্গীতবিশেষজ্ঞরা সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করেছেন বা কেউ করেননি। তবুও সৃষ্টির ধারা অনুসারে মেধার বিন্যাসে জাগতিক রচনা বা সৃষ্টি করে নান্দনিকতা। রাগ যিনি সৃষ্টি করে গেছেন লক্ষণগীত সৃষ্টি তাঁর তুলনায় খুবই নগন্য। সে প্রেক্ষাপটে নজরুল সৃষ্ট লক্ষণগীত রচনায় আলোচনা বা সমালোচনা যাই ঘটুক তার সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রে লক্ষণগীত একটি অংশ।

 

নজরুলের লক্ষণগীত

 

নজরুলের লক্ষণগীত

রাগের নাম : রাগেশ্রী
নজরুল সৃষ্ট : লক্ষণগীত
ঠাট, খাম্বাজ/ তাল: ত্রিতাল
স্থায়ী: কার অনুরাগে শ্রীমুখ উজ্জ্বল।
কার সঙ্গে মধুনিশি চঞ্চল ।।
অন্তরা : তব আঁখি মনোহর যুগল নিশাদ স্বর
প্রখর সে আঁখি কেন সকরুন ছল ছল ।।
সঞ্চারী : যে পায়ের নূপুর শুনি কুহু পঞ্চম বোলে
হে নিপট চপল সে পা কেন নাহি চলে।
আভোগ : কোণ ধ্বনি দিল বধু স্বর গরল মধু
কেন সুধা মাগি রসনিধি হইলে বিফল।

বাণীর ব্যাখ্যা :

১। অনুরাগে শ্রীমুখ:রাগের নাম অর্থাৎ “অনুরাগে” এর অনু এবং শ্রীমুখ এর মুখ অংশটুকু বাদ দিলে আলোচ্য রাগের নাম রাগেশ্রী পাওয়া যায়।

২। সঙ্গে মধুনিশি এই অংশে রাগেশ্রী রাগের দুটি বিষয় বর্ণিত আছে।

প্রথমত, রাগের আরোহন স, গ, ম, ধ, ণ, র্স এবং দ্বিতীয়ত, মধুনিশি অর্থাৎ রাগেন রাগ রাত্রিকালে গেয় (দ্বিতীয় প্রহর) আরোহনে রেখার ও পঞ্চম বর্জিত সুর।

৩। চঞ্চল : প্রকৃতি চঞ্চল।

৪ । তবু আঁখি মনোহর রাগটি মনোরঞ্জক

৫। যুগল নিশান স্বর। রামেশীতে উভয় নিষাদ বা নিখান ব্যবহৃত হয়। আরোহনে শুদ্ধ অবরোহনে কোমল ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ ঠাট রাগ খাম্বাজ অনুরূপ।

৬। সকরুণ ছলছল : রাগ-রস অর্থাৎ রাগেশ্রী “করুণ-রসাত্মক” রাগ।

৭। পায়ের অর্থাৎ পাত্রের, অর্থাৎ পঞ্চম স্বরকে বুঝানো হয়েছে ।

৮। পঞ্চম পঞ্চম মারওয়া ঠাটের জন্য রাগ। অর্থাৎ পঞ্চম রাগে পঞ্চ স্বর ব্যবহৃত হয়।

৯। পা কেন নাহি চলে রাগেশ্রী রাগে পঞ্চম অর্থাৎ পা বর্জিত স্বর।

১০। ধ্বনি – অর্থাৎ সা এবং ধা একত্রে সধা রাগেশ্রী রাগের পকড়ের একটি অংশ। অর্থাৎ নধা প্রয়োগে রাগের রূপ সৃষ্টি হয়।

১১। স্বর স্বরল মধু – এই অংশে রাগেশ্রী রাগের কয়েকটি রূপ প্রকাশ পায়। প্রথমত, “স্বর” অর্থাৎ সা ও রা। গরল অর্থাৎ সা ও গা এবং মধু অর্থাৎ সা ও ধা একত্রে বিন্যাস করলে “সারা গা রা মা ধা” হয়। এই রাগে প্রয়োজনে রেখাব প্রয়োজনে খাম্বাজ ঠাটের দূর্গা হতে পার্থক্য রাখা সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, স্বর এর সা। গরল এর গা এবং মধু এর মা অর্থাৎ প্রত্যেক শব্দের অদ্যক্ষর নিলে সা গা মা হয়। তৃতীয়ত, মধু অর্থাৎ মা ও ধা এ দুটি স্বরের সঙ্গতিতে রাগেশ্রী রাগের রূপ খুবই সুন্দর হয়।

১২। সুধা মাগি রসনিধি – অর্থাৎ সা ধা মা গা রে সা না ধা-এই স্বর বিন্যাসে রাগেশ্রী রাগের অবরোহন পরিস্ফুট।

 

google news logo

 

শাস্ত্রীয় লক্ষণ :

রাগ, রাগেশ্রী (জন্য রাগ)

স্বর পরিচয় – নিখাদ কোমল, বাকি সব শুদ্ধ স্বর।

ঠাট, খাম্বাজ (উভয় নিখাদ ব্যবহার মূলে)

বর্জিতস্বর। আরোহণে রে ও পা এবং অবরোহোনে পা বর্জিত

আরোহন: সা, গা, মা, ধা, না, সা

অবরোহন: র্সা, না, ধা, মা, পা, মা, রা, সা

বাদীস্বর: মধ্যম

সমবানীস্বর : ষড়জ

অঙ্গ : পূর্বাঙ্গ

সময় : রাত্রিকাল (প্রহর উল্লেখ হয়নি)

ন্যাস স্বর : সা গা, ও মা

রাগ-রস : করুণ রসাত্মক

প্রকৃতি : চঞ্চল।

Leave a Comment