বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিস্মরণীয় নাম—যিনি কবি, সংগীতকার, গল্পকার, গদ্যকার, নাট্যকার, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ হিসেবে অসামান্য কৃতিত্ব রেখে গেছেন। মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি যে অসংখ্য রচনা উপহার দিয়েছেন, তা বিস্ময়কর। তবে তাঁর এই বিপুল সৃষ্টিলোকের সূচনা হয়েছিল কয়েকটি প্রাথমিক রচনার মধ্য দিয়ে—যেগুলো তাঁর সাহিত্যিক ও সংগীতজীবনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। প্রথম গল্প, প্রথম কবিতা এবং প্রথম গান—এসব রচনা নজরুলের অন্তর্গত প্রতিভার প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় প্রজ্বলিত আলোয়।

কাজী নজরুলের রচিত প্রথম গল্প, কবিতা এবং সঙ্গীতের নাম এবং প্রকাশ কাল
নজরুলের প্রথম গল্পের নাম “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী”, যা প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে মাসিক সওগাত–এর প্রথম বর্ষের সপ্তম সংখ্যায়। গল্পটি তিনি লেখেন করাচি সেনানিবাসে অবস্থানকালে, যখন তিনি ৪৯ বাঙালি রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে জীবনযাপন করছিলেন। সৈনিক জীবনের শৃঙ্খলা, একঘেয়েমি, কঠোরতা এবং সহযোদ্ধাদের বহুসাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তাঁর চিত্তকে বারবার সৃষ্টিশীলতার দিকে আকৃষ্ট করত। সেই পরিবেশেই তিনি গল্পটি রচনা করেন—যেখানে দারিদ্র্য, সংগ্রাম, মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং তরুণ বয়সের দুঃসাহসী অভিযাত্রার এক অনন্য মিশ্রণ ফুটে ওঠে। এই গল্প থেকেই নজরুলের সাহিত্যজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা। পরে তিনি করাচিতে অবস্থানকালেই আরও বেশ কিছু গল্প লেখেন, যা তাঁর সৃজনশীল বিকাশকে ত্বরান্বিত করে।

নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কবিতা হলো “মুক্তি”, যা ১৯১৯ সালে ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই কবিতা নজরুলের বিদ্রোহী মনোভঙ্গির প্রথম কাব্যিক প্রকাশ—যেখানে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আকাঙ্ক্ষা, অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের ডাক, এবং মানবমুক্তির তীব্র আকুলতা ফুটে ওঠে। করাচির সৈনিকজীবন ছিল কঠোর, সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত; হয়তো সেই পরিবেশই তাঁকে ‘মুক্তি’র তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তাড়িত করেছিল। এই কবিতার মধ্য থেকেই আমরা পাই ভবিষ্যতের ‘বিদ্রোহী’, ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’–এর ইঙ্গিত। তাঁর কাব্যসৃষ্টির প্রথম ধাপেই দেখা যায় প্রতিবাদী চেতনার যে স্ফুরণ, তা পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা করে।
সংগীতজ্ঞ হিসেবে নজরুলের প্রথম দিককার রচনাও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নজরুলের প্রথম গান নিয়ে সাহিত্যজগতে খানিক মতভেদ থাকলেও বেশিরভাগ গবেষক মনে করেন তাঁর প্রথম সৃষ্ট সঙ্গীতের বাণী হলো “প্রভাত বীণা তব বাজে”। তবে অন্য এক মতানুসারে ১৯২০ সালে সওগাত–এর দ্বিতীয় বর্ষের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত “উদ্বোধন” গানটিও তাঁর প্রথম গান হিসেবে বিবেচিত হয়। সৈনিকজীবনে করাচিতে তিনি প্রায়ই সহযোদ্ধাদের সঙ্গে বসে সঙ্গীতচর্চা করতেন—রাগ, গজল, কীর্তন এবং লেটো–গানের স্মৃতি তাঁকে সুর–সংগীতের গভীরে টেনে নেয়। করাচির বাঙালি পল্টনে ছিল সুরময় এক পরিবেশ; সেখানে বিভিন্ন ভাষার গান, বাদ্যযন্ত্র এবং সঙ্গীতসাধনার মেলবন্ধনে তৈরি হয় এক গীতল মহল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সম্ভবত তাঁর প্রথম গানগুলো জন্ম নেয়—যে গানগুলো পরবর্তীকালে নজরুলসঙ্গীতের অমর ভান্ডার গঠনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
এই তিনটি প্রথম সৃষ্টি—গল্প, কবিতা ও গান—কাজী নজরুল ইসলামের সৃজনশীল প্রতিভার নবযাত্রার সূচনা চিহ্নিত করে। এগুলোই তাঁর শিল্পীসত্তার প্রথম প্রকাশ, যা পরে বিরাট আকারে প্রসারিত হয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে নতুন আলোয় ভরিয়ে দেয়। একজন সাধারণ সৈনিক কীভাবে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং ‘জাতীয় কবি’—তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে এই প্রথম রচনাগুলোতেই।
