নজরুলের ভাটিয়ালী গান আজকের আলোচনা। ভাটিয়ালি মুলত পূর্ববঙ্গে মাঝি মাল্লাদের গান। একমাল্লাই ছোট নৌকায় বসে মাঝি একাকী গান গায়। নদীর কলতানের সঙ্গে বাতাসের সুরে সুর মিলিয়ে মাঝি খুলে দেয় তার মনের দ্বার গান ধরে তার অচিন প্রিয়ার উদ্দেশ্যে। নৌকা চলে ভাটির টানে, তাই মুখের গানের গতিও হয় মন্থর। পূর্ববঙ্গে যেহেতু জলপথই ছিল প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম, তাই দিনের পর দিন জলের ওপর নৌকার ওপরই মাঝির জীবন কেটে যায়।

নজরুলের ভাটিয়ালী গান
নদীর কলতান, বাতাসের মোলায়েম স্পর্শ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সব মিলে উদাস করে দিন শেষে ভাটির টানে চলতি মাঝির মন। ফেলে আসা ঘরের কথা স্মরণ করে তাসের বুখে ভর করে ছড়িয়ে পড়ে তাদের গান- যে গানের সুরে ও কথায় ধরা দেয় নদীর জলের সঙ্গে জীবনের প্রবহমানতার প্রভাব, – তার দুঃখ যন্ত্রণা। – এমনিই ভাটিয়ালী যখন কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি হয়ে ধরা দেয়, তখন বিষয়ের কিছু বৈচিত্র্য লক্ষিত হয়।
কবি নদীর এ কূল ভেঙে ও কুল গড়ার কথা বলেন, বলেন অনিত্য মানুষের জীবনের কথা (‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’)। যে গহীন জলের নদীতে মাঝির সারা জনম কেটে যায়, তার কাছে যেন মাঝির মুখে কবির কাতর জিজ্ঞাসা :
‘আমার ঘর ভাঙিলে ঘর পাবো ভাই
ভালে কেন মন,
হারালে আর পাওয়া না যায়
মনের মতন।
জোয়ারে মন ফেরে না আর
ও সে ভাটিতে হারায় যদি।’ (‘আমার গহনি জলের নদী’)

নদীর জলের ভাটির টানে মনেও আসে হারিয়ে যাবার যন্ত্রণা। ১৯২৯ সালে কবির চট্টগ্রাম সফর ফলে জন্ম নিয়েছিল ‘সিন্ধু হিন্দোল’ ও ‘চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি এবং ভাটিয়ালীর সুরে লেখা ‘সাম্পানের গান’। এখানেও কবি আরোপ করলেন ভাটিয়ালীর উদাস মাঝির মনের কথা। কবির সৃষ্ট সাম্পানওয়ালা নদীতে ভাসতে আসে প্রাণের টানে, অর্থ উপার্জনের তাগিদে নয়, কারণ তার সাম্পান ভাঙা- শুধু ‘আপনাররে’ নিয়ে এপার ওপার করাতেই তার জীবনের লক্ষ্য লুকায়ে ।
“আমায় দেউলিয়া করেছে রে ভাই
যে নদীর জল
আসলে এ নদী বাস্তবের নদী নয়, তা মানুষটির জীবননদী। নদীর জল শুকরিয় – গেলে আবার আসে ফিরে কিন্তু,
মানুষ গেলে ফিরে নাকি দিলে মাথার কিরে
আমি ভালোবেসে গেলাম ভেসে রে।
হলাম দেশান্তরী বন্ধু ভাঙা আমার তরী।
( আমার সাম্পান যাত্রী না লয়)

বাংলার লোকসঙ্গীতে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে দেহতত্ত্ব বিষয়ক গান। দেহতত্ত্বের সাধনাও অলৌকিক ধর্ম সাধনা নয়, এই সাধনার লক্ষ্য কোন অদৃশ্য শক্তি নন, বরং মানুষের প্রত্যক্ষ দেহ- এখানে দেহের অসারতা এব? মধ্যস্থ আত্মার নিত্যত্বকে নানাভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। নজরুল ইসলাম রচিত এরূপ ভাটিয়ালী গানেও কবি চিরাচরিত পথেরই পথিক-
‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে এই ত নদীর খেলা।
সকাল বেলা আমলি রে ভাই ফকির সন্ধ্যাবেলা।
এ নদী শুধুমাত্র প্রাকৃতিক উপাদান নয় ।
এটি ভব নদী যার উপর নির্ভরশীল।
মানবজীবনের ওঠাপড়া। নদী কবির হাতে হয়ে উঠেছে বিশেষ অর্থ বহনকারী মানবজীবন নিয়ন্তা।
কবি নজরুল ইসলামের রচনায় ভাটিয়ালী শুধুমাত্র মাঝির মনের কথা হয়ে প্রকাশ পায়নি, চিরাচরিত পথ থেকে বেরিয়ে ভাটিয়ালীর সুরের বন্দিশে কবি উপস্থিত করলেন নারীমনের যন্ত্রণাকে। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীরার বিষয় এসেছে- রাধা সইকে দিয়ে ননদীকে খবর পাঠিয়েছে (“আমি কুল ছেড়ে চলিলাম ভেসে’ গানটিতে)
“বলিস্ গিয়ে কৃষ্ণ নামের কলসী বেঁধে গলে
ডুবেছে রাই-কলঙ্কিনী কালিদহের জলে।
নারীর একান্ত প্রিয়, সে কখনো স্বামী, কখনো বা বন্ধু তারই বিরহে নারীর হৃদয়ের যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে নজরুল ইসলামের ভাটিয়ালী গানে। গাঙে জোয়ার ফিরে এসেছে কিন্তু প্রিয়তমের নৌকার ছই দেখা যায় না খিড়কী দুয়ারের ফাঁক থেকে। সকলের অলক্ষ্যে সেজেগুঁজে বসে থাকা নারীর চোখের জলে যেন মাঠ থৈ থৈ করে- এ যেন বৃষ্টির জাল নয় (‘গাঙে জোয়ার এলো ফিরে)। তাই অপর একটি ভাটিয়ালী গানে নায়িকা নদীর কাছে মিনতি জানায়।

ভাটিয়ালী বস্তুত তালবিহীন এককসঙ্গীত, কিন্তু নজরুল ইসলাম ভাটিয়ালীকে রূপ দিলেন দ্বৈতসঙ্গীতরূপে। একজন নারী ও একজন পুরুষের এই গান, অনেকটা কথোপকথনের মত এর সঙ্গে পুর্ববঙ্গ গীতিকার মিল পাওয়া যায়।
‘স্ত্রী ॥ কোন্ বিদেশের নাইয়া তুমি আইলা আমার গাও ।
কুল-বধূর সিনান ঘাটে বাঁধলে তোমার নাও
পু ॥ আমি তোমার লাইগ্যা কন্যা বেড়াই ভেসে স্রোতে।
ওগো তোমার রূপের হাট দেখলাম যাইতে এই পথে।’
পরাধীন ভারতের ধূমকেতুর মত আবির্ভাব যে কবির, তাঁর ভাটিয়ালী গানেও পড়েছে দেশাত্মবোধ প্রচারের ছায়া। এ মাঝির হৃদয়ের কথা নয়, এটি কাজী নজরুল ইসলামের ঘুম ভাঙানোর গান।
‘সাতভাই চম্পা জাগো রে ঐ পারুল তোদের ডাকে।
(ভাই) আর কত ঘুমাবি সবুজ পাতা-ঘেরা শাখে
কি যাদু করিল তোদের বিদেশী সৎ মায়ে
রাজার দুলাল ঘুমিয়ে আছিস আঁধার কানন ছায়ে ।
নিজেরা না জাগিলে কবে মুক্তকরবি মাকে
রে ঐ পারুল তোদের ডাকে।
……. গানটির সুরসংযোজনা এবং চলন ভাটিয়ালীর মত হলেও গানটিকে উদ্দেশ্যমূলক রচনার মধ্যে ধরাই যথার্থ বলে মনে হয়।

