নজরুলের ভক্তিসঙ্গীত নিয়ে আজকের আলোচনা। প্রেম যখন হল পূজায় রূপান্তরি, সেকানে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে একটা নৈকট্য সৃষ্টি হয় সৃষ্টি হয় পাওয়া না পাওয়ার টানাপোড়েন। কিন্তু সেই স্তরের রূপান্তর ঘটে যথার্থ ভক্তি স্তরে গিয়ে, যেখানে আরাধক ও আরাধ্যেল মধ্যে দূরত্ব যায় বেড়ে। কারণ তখন জীবাত্মা অনুভব করে তার আরধ্যের বিশালত্ব। তাই তাকে প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে আপন হৃদয়ের কথা জানানো ছাড়া অন্য পন্থা থাকে না।

নজরুলের ভক্তিসঙ্গীত
কাজী নজরুল ইসলামের ভক্তিসঙ্গীতগুলিকে বিষয় ভিত্তিকভাবে কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। তাঁর আরাধ্য কখনো ঐশ্বর্যশালী দেবতা, কখনো প্রেমসাধনার আরাধ্য দেবতা, কখনো কন্যারূপিণী মহাশক্তি আবার কখনো বা আমিনা মায়ের কোল আলো করা।
নজরুলের ভক্তিসঙ্গীত এর প্রকার:
১. সর্বৈশ্বর্যশালী পরমেশ্বরের সাধনা কেন্দ্রিক
২. বৈষ্ণব ভাবদুদর্শে প্রভাবিত পঞ্চরস কেন্দ্রিক বিষয়ক
৩. শাক্তপদাবলী (মহাশক্তির আরাধনা শীর্ষক)
8. ইসলামী ভক্তিসঙ্গীত
বিশ্বের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের যিনি নিয়ন্তা যার অস্তিত্ব বিশ্বময় প্রসারিত, সেই বিশ্বনাথের জয় গান করেছেন কবি। কবির কথাতে বলি- “স্রষ্টা যদি কেউ থাকেনও, তিনি আমাদের দুঃখে সুখে নির্বিকার- আমরা তাঁর হাতের খেলা-পুতুল। সৃষ্টি করছেন ভাঙছেন তাঁর খেয়াল মতো, তুমি কাঁদলেও যা হবে, না কাঁদলেও তাই হবে যা হাবার তা হবেই। তাঁর পাপ পুণ্য স্রষ্টারই আদেশ- তাঁর খেলা জমাবার জন্য। মোট কথা, এটা একটা বিরাট খেয়ালি শিশু।” (ওমর খৈয়ামের জীবন দর্শন সম্বন্ধে কবি েিমছিলেন ওমর খৈয়ামের রুবাইয়ত এর অনুবাদ গ্রন্থের ভূমিকা হিসেবে। নজরুল রচনাবলী তৃতীয় খণ্ড ১০০-১০৬ পৃষ্ঠা)।

– এমন জীবন দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে কবি রচনা করেন সর্বময় ব্রহ্মের লীলার এই রূপটি :
“তারকা রবি শশী খেলনা তব হে উদাসী
পড়িয়া আছে তব পায়ের কাছে রাশি রাশি।”
কিন্তু ভক্ত প্রেমিকের কাছে ঈশ্বরের এমন নির্লিপ্ত রূপটি তেমন গ্রহণযোগ্য নয় । তাই কবি নজরুলের চোখে ধরা দেয় পরমপুরুষের জয়গানকারী জগৎ সংসার, তার সমগ্র সৃষ্টির সৌন্দর্য তারা মিলিত হতে চায় জগদীশ্বরের সঙ্গে তবু পারে না- তাই তাঁরই দিকে যেন মনপ্রাণ ধাবিত হয়, এমন প্রার্থণা কবি করেছেন বিশ্ব সংসারের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে (‘অনাদি কাল হ’তে অনন্ত লোক গাহে তোমারি জয়)।
সঙ্গীতের তাল, লয়, ছন্দের বন্দনায় কবি পূজা করেছেন তাঁর নটরাজকে (‘অঙ্গলি লহ মোর সঙ্গীতে’)। সঙ্গীতের মধ্যে তিনি অবলোকন করেছেন ‘সতী হারা উদাসী ভৈরবের কান্না, কখনো বা ধ্যানরত শান্ত শিব বন্দানায় কবি রত হয়েছেন, আহ্বান কেেছন সৃষ্টির আনন্দে লীলাকারী মহাদেবকে। কবির প্রার্থনা
“ললাটের বহ্নি ঢাকো
শশী লেখার তিলক আঁকো
ফণী হোক মণিহার হে ণিাকপাণি ॥”

সাধনার সব পথই এসে মিলিত হয় একটি স্থানে। তবে শৈবরীতির সাধন পদ্ধতির চেয়ে নজরুল ইসলামের গানে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় ভাবে রূপ পেয়েছে বৈষ্ণবীয় রীতির ঈশ্বর সাধনা। তা কবির লেখনীতে হয়ে উঠেছে ভক্তের বড় আপনার বস্তু । সেই কারণেই শিব বন্দনা করতে গিয়েও কবি তাঁর আরাধ্য দেবতাকে আহ্বান করেছেন গিরিধারী নটবরূপে- অর্থাৎ স্নিগ্ধ ও মনোহর রূপে।
“সম্বর সম্বর মহিমা তব
হে ব্রজেশভৈরব আমি ব্রজ বালা”।
-এই আরাধ্যের রূপ শুধু স্নিগ্ধ নয়, অনেক আপনার জন তিনি। শিব ভজনা করতে গিয়েরও প্রকট হয়েছে প্রেমিক কবির বৈষ্ণবসত্তা, যা পরমেশ্বরকে দূরের ‘বিরাট শিশু’ না ভেবে ভাবে প্রেমময় পুরুষ হিসেবে। তার সঙ্গে মিলিত হওয়াই বৈষ্ণব সাধনার মূল কথা। কবি নজরুল ইসলমের কৃষ্ণভক্তি বিষয়ক গানগুলিতে বৈষ্ণব পঞ্চরসের যে সমাহার, তারই বিভিন্ন প্রকাশ লক্ষিত হয়। কৃষ্ণসাধনার যে বিভিন্ন পদ্ধতি তা কবি একটি গানের মধ্যে ব্যাখ্যা করেছেন- এখানে পাঁচটি রসের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ এই গানটিতে
“আমার নয়নে কৃষ্ণ নয়ন তারা/ হৃদয়ে মোর রাধাপ্যারী
আমার প্রেম প্রীতি ভালোবাসা/ শ্যাম-সোহাগী গোপ-নারী “

কৃষ্ণ কেন্দ্রিক কামনা বাসনা ও প্রার্থণার পরিণতি হল আপনার মাঝে আকাঙ্ক্ষিতের অনুভব। আপনার মাঝেই কবিও মিলিত হয়েছেন তাঁর আরাধ্য শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তিনি যে তাঁর অন্তরেই অধিষ্ঠান করেন। এমন প্রিয়মিলনের অনেক সুখ, সেখানে বাইরের সংসার বাধার সৃষ্টি করতে পারে না। কবির প্রতিটি ইন্দ্রিয়ই এখানে গিরিধারীর সেবায় রত
“আমার হৃদয় মন্দিরে রে ঘুমায় গিরিধারী
জাগে আমার জাগ্রত প্রেম দুয়ার তাঁর দ্বারী ॥
কানু আমার বুকে ঘুমায়, ভক্তি জেগে চামর দুলায়…..আধেক রাতে নিরালাতে জাগবে হরি, ধরবে হাতে
ধ্যান করে গো সেই আশাতে এ প্রাণ রাধা-প্যারী
এমন মিলনেও শান্তি নেই, কোথায় যেন এক কারুন সুর হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রাখে- এ যেন সত্যিকারের পুরোপুরি পাওয়া নয়- সত্যিই বুঝি জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন সম্ভব নয় বুকের বঁধুরে বুকে বেঁধে ঝুরে বিধুরা কিশোরী” এই বুঝি জীবাত্মার একমাত্র গতি। তাই কবি তাঁর পূজার থালাকে সাজিয়েছেন ব্যথার শতদলে, আহ্বান জানিয়েছেন আরাধ্যকে।
‘যে নয়নের জ্যোতি নিলে কাঁদিয়ে প’লে প’লে
মঙ্গল ঘট ভরেছি নাথ সেই নয়নের জলে।
(‘ওগো পূজার থালায় আছে আমার ব্যথার শতদল’)
বৈষ্ণব প্রেমলীলার অধ্যাত্ম তত্ত্বের দ্বারা কবি নজরুল ইসলামের প্রেম ও পূজা এবং ভক্তিগীতি বিষয়ক সঙ্গীতগুলি বিশেষভাবে প্রভাবিত তাই গানগুলিতে লক্ষিত হয় বৈষ্ণব প্রেম সাধনার পঞ্চরসের সমাহার। তেমনি আবার ঈশ্বরের লীলামুখ দর্শন করেই তিনি পরম বৈষ্ণবের মত জন্ম জন্মান্তর কাটিয়ে দিতে চাননি। অনেক গানই পাই কবির মুক্তিকামনার প্রার্থনা,- যা পরবর্তীকালে বিদ্যাপতির প্রার্থনার পদগুলি থেকে বৈষ্ণবপদে যুক্ত হয়েছে ।

