নজরুলের বিবাহ

কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে প্রেম ও বিবাহ ছিল রোমাঞ্চ, ভুলবোঝাবুঝি, সামাজিক বাস্তবতা এবং গভীর মানবিক অনুভূতির এক জটিল মিশেল। তাঁর সাহিত্য–সঙ্গীতের মতোই ব্যক্তিজীবনও ছিল উচ্ছ্বাস, সংঘাত ও দুঃসাহসের রঙে রঙিন। ১৯২১ সালের শুরুর দিকে নজরুল যখন মুসলিম সাহিত্য–সমিতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, তখনই তাঁর পরিচয় হয় গ্রন্থপ্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে। এই পরিচয়ের সূত্রে নজরুল প্রথমবার যান কুমিল্লায়, যেখানে তাঁকে আতিথ্য দেন কুমিল্লার বিশিষ্টা নারী বিরজাসুন্দরী দেবী। এই গৃহেই নজরুল প্রথম পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সঙ্গে, যিনি পরবর্তীকালে তাঁর জীবনসঙ্গিনী হন। কুমিল্লা শহর তাঁর সাহিত্য–সঙ্গীত–জীবন যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি তাঁর পারিবারিক জীবনের ভিত্তিও গড়ে দিয়েছে।

নজরুলের বিয়ে

 

নজরুলের বিয়ে । নজরুলের ভাবনা

তবে এর আগে তাঁর জীবনে আসে একটি আকস্মিক, অস্থির ও অনেকের মতে হাস্যকর নাটকীয় প্রথম বিবাহ। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে আলী আকবর খানের আহ্বানে নজরুল আবার কুমিল্লা জেলার দৌলতপুর গ্রামে বেড়াতে যান। সেখানেই তিনি পরিচিত হন আলী আকবরের ভাগ্নি নার্গিস আরা খানমের সঙ্গে। পরিচয় দ্রুতই প্রণয়ে পরিণত হতে থাকে, এবং শেষমেশ ১৯২১ সালের ১৭ জুন শুক্রবার তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও পরে প্রকাশ পায়, আলী আকবর খান নজরুলকে ঘরজামাই হিসেবে রেখে নিজের প্রকাশনা ব্যবসা বাড়ানোর স্বার্থেই এই বিয়ের আয়োজন করেছিলেন।

 

 

নজরুলের বিয়ে

 

বিয়ের আসরে বসে নজরুল যখন বুঝতে পারেন যে তাঁকে ‘ঘরজামাই’ করে বাঁধা রাখার আয়োজন চলছে, তখনই বিদ্রোহী সত্তা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। বিয়ের চুক্তিপত্রে সই না করে তিনি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং পরদিন, ১৮ জুন, ঝড়–বৃষ্টির মধ্যেই দৌলতপুর ত্যাগ করেন। সেই রাতেই তিনি রওনা দেন কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়ির দিকে—যেখানে তিনি আগে থেকেই নিজের সৃজনশীল স্বাধীনতা ও মানবিক ভালবাসার মর্যাদা পেয়েছিলেন। এই ঘটনার মধ্যেই স্পষ্ট প্রতিফলিত হয় নজরুলের স্বভাবসিদ্ধ মুক্তচেতা মন—যে মন কোনো রকম শর্ত, বাঁধন বা স্বার্থকে কবুল করতে পারে না।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

এরপর দুই বছরের ব্যবধানে আবার নতুন অধ্যায় শুরু হয় নজরুলের জীবনে। তিনি ধীরে ধীরে প্রমীলা দেবীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যা ছিল পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সমবেদনা ও আদর্শ–চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অবশেষে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল, কলকাতার ৬ নম্বর হাজী লেনে, মিসেস এম রহমানের উদ্যোগে নজরুল ও প্রমীলা সেনগুপ্তের বিবাহ সম্পন্ন হয়। প্রমীলার জন্মসূত্রে ছিলেন বাঙালি হিন্দু, কিন্তু তিনি বিয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নাম হয় সাহেবা খাতুন বা অনেকে যাকে ডাকতেন ‘বসুন্ধরা’। তাঁদের দাম্পত্যজীবন ছিল ডাঙা–ঝড়ের মধ্যেও গভীর প্রেমের এক সুন্দর নির্যাস, যার প্রতিফলন দেখা যায় নজরুলের বহু কবিতা ও গানে—বিশেষ করে শ্যামাসঙ্গীত, রাগপ্রধান গান ও কিছু প্রেম–বাণীতে।

প্রমীলা ছিলেন নজরুলের জীবনের এক স্থায়ী শক্তির উৎস। তাঁর অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট বা আর্থিক বিপর্যয়ে নজরুল ছিলেন অবিচল ভালোবাসার প্রতীক। তাঁদের চার সন্তানের জন্ম হয়, যদিও দু’জন অল্প বয়সেই মারা যান। দাম্পত্যজীবনের নানা দুঃখ–দুর্দশা সত্ত্বেও তাঁরা ছিলেন একে অপরের শক্তি ও আশ্রয়।

সব মিলিয়ে নজরুলের বিবাহজীবন ছিল সংগ্রাম, স্বাধীনতা, প্রেম, বিদ্রোহ, মানবিকতা ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য মিশ্রণ। তাঁর প্রথম বিবাহের নাটকীয় ব্যর্থতা যেমন তাঁর বিদ্রোহী মনোভাবকে প্রকাশ করেছে, তেমনি প্রমীলা দেবীর সঙ্গে দাম্পত্য তাঁর মনন–সৃজনশীলতাকে গভীর করেছে। তাঁদের সম্পর্ক ছিল বাংলার সাহিত্যে এক জীবন্ত প্রেমগাঁথা—যেখানে প্রেম মানে স্বাধীনতা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগ।

Leave a Comment