১৯২৬ সালের জানুয়ারিতে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত কৃষক–শ্রমিক সম্মেলন ছিল তৎকালীন পূর্ববাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। কৃষক ও শ্রমিক সমাজের ওপর বহুবিধ নিপীড়ন, জমিদারি শোষণ এবং ঔপনিবেশিক দাসত্বের বিরুদ্ধে যে গণজাগরণ তখন সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ছিল—এই সম্মেলন ছিল তারই একটি সাংগঠনিক রূপ। সমাজের পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত ও শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল নজরুলের মানবতাবাদী দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাই তাঁকে আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় রাখা হয়েছিল একেবারে সামনের সারিতে। যদিও তিনি শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে পারেননি, তবু তাঁর পাঠানো বাণী সম্মেলনে উপস্থিত মানুষের হৃদয়ে গভীর আবেগ ও উৎসাহ জাগিয়েছিল।

ময়মনসিংহের কৃষক শ্রমিক সম্মেলনে নজরুলের বক্তব্য
নজরুলের ময়মনসিংহের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু সাহিত্যিক নয়, ব্যক্তিগত আবেগে নিবিড়ভাবে জড়িত। তাঁর সৎভাই কাজেম আলী দারোগা ময়মনসিংহের ত্রিশালে বদলি হলে ১৯১৪ সালের শুরুতে কিশোর নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে আসেন কাজীর সিমলা গ্রামে। এখানকার দরিরামপুর হাইস্কুলেই নজরুল সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরিবারিক দারিদ্র্য সত্ত্বেও তিনি নিজের মেধা ও চরিত্রগুণে বিনাবেতনে পড়াশোনার সুযোগ পান। বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর অস্থির ও স্বাধীনচেতা স্বভাব তাঁকে হঠাৎ করেই চুরুলিয়ায় ফিরিয়ে নেয়। তবু তাঁর জীবনে ময়মনসিংহের স্মৃতি অম্লান হয়ে থাকে—এখানকার প্রকৃতি, মানুষ, দরিরামপুর স্কুল এবং কিশোর বয়সের অভিজ্ঞতা তাঁর মনোজগতে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

এই আবেগই প্রতিফলিত হয় কৃষক–শ্রমিক সম্মেলনে পাঠানো তাঁর বাণীতে। তিনি লিখেছিলেন,
“এই মামনসিংহ আমার কাছে নতুন নয়… এইখানে থাকিয়া আমি কিছুদিন লেখাপড়া করিয়া গিয়াছি। আজও আমার মনে সেইসব প্রিয় স্মৃতি উজ্জ্বল…”
এই বক্তব্যে শুধু অতীত স্মৃতির কোমলতা নয়, মানুষের প্রতি তাঁর অনন্ত ভালোবাসা—যা তাঁর কবিতা, গান ও সামাজিক অবস্থানে বারবার ফিরে আসে—তারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি আশা করেছিলেন, ময়মনসিংহের পবিত্র মাটি স্পর্শ করে, এখানকার কৃষক–শ্রমিকের সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি নিজেকে আরও শক্তিমান করবেন—
“…উদারহৃদয় ময়মনসিংহ জেলাবাসীর প্রাণের পরশমণির স্পর্শে আমার লৌহপ্রাণকে কাঞ্চনময় করিয়া তুলিব।”
নজরুলের এই বাক্যের প্রতিটি শব্দ কৃষক–শ্রমিক শ্রেণির প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার প্রমাণ। তাঁর দৃষ্টিতে, শ্রমিক ও কৃষকরাই সমাজ ও রাষ্ট্রের আসল নির্মাতা; তাঁদের হাতেই স্বাধীনতা ও অগ্রগতির ভবিষ্যৎ নিহিত। তিনি অনুভব করেছিলেন, ময়মনসিংহের সংগ্রামী মানুষ তার দুঃখকে শক্তিতে, বঞ্চনাকে প্রতিবাদে এবং অন্যায়কে চ্যালেঞ্জে রূপান্তর করতে সক্ষম।
যদিও তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি—
“কিন্তু তাহা হইল না। দুরদৃষ্ট আমার।”
এই আক্ষেপে প্রকাশ পায় তাঁর সত্যিকারের নিঃস্বার্থ মনোভাব। ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, মানুষের হৃদয়ই ছিল তাঁর গন্তব্য। তিনি চাইতেন শ্রমজীবী মানুষের মাঝে গিয়ে তাঁদের মুক্তির ডাক আরও জোরালো করে তুলতে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ময়মনসিংহের কৃষক–শ্রমিক সম্মেলনে নজরুলের বাণী তাঁর মানবতাবাদী দর্শন, সাম্যবাদী চেতনা এবং শোষিত মানুষের প্রতি অপরিসীম সহানুভূতির এক উজ্জ্বল দলিল। তাঁর লেখা শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্য নয়—তার মধ্যে নিহিত রয়েছে যুগান্তকারী রাজনৈতিক বোধ ও সামাজিক মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এ কারণেই কাজী নজরুল ইসলাম আজও সাধারণ মানুষের কবি, সংগ্রামের কবি, মানবতার কবি।
