কবি নজরুলের প্রতিভাকে সম্মাননা

বাংলা সাহিত্য, সঙ্গীত এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক দীপশিখা, যার আলো ভেদ করে এসেছে মানবতার বাণী, সাম্যের ডাক, মুক্তির চেতনা এবং সৃজনশীলতার এক অনন্য বিস্তার। বাঙালির মানসপটে তাঁর অবস্থান শুধু একজন কবি বা সঙ্গীতকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বিদ্রোহী যুগচেতনার মুখ, মানবপ্রেমের দূত এবং শিল্প–সাহিত্যের মহত্তম রূপকার। তাই তাঁর প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নানা স্মারক, পুরস্কার, একাডেমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

কবি নজরুলের প্রতিভাকে সম্মানিত

 

কবি নজরুলের প্রতিভাকে সম্মানিত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া—যেখানে কবির জন্ম—সেই গ্রামেই গড়ে উঠেছে নজরুল অ্যাকাডেমি, একটি বেসরকারি গবেষণা ও নজরুল–চর্চা কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠান নজরুলের সাহিত্য, সঙ্গীত, দার্শনিক ভাবনা এবং জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে। চুরুলিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজ নজরুলের জন্মভূমির কারণে আরও গভীর মর্যাদায় উদ্ভাসিত। পাশের আসানসোল মহানগরে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, যা নজরুল–সাহিত্য, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা এবং সঙ্গীতচর্চায় বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণই প্রমাণ করে নজরুলের চিন্তা ও চেতনা আজও নতুন প্রজন্মের শিক্ষাব্যবস্থার অনুপ্রেরণা।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, তাঁর স্মরণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গড়ে উঠেছে আরও বহু স্থাপনা। দুর্গাপুরের লাগোয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির নামকরণ করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা কবির বৈশ্বিক মর্যাদা ও স্বীকৃতির এক অনন্য প্রতীক। আবার কলকাতা মহানগরের অন্যতম প্রধান সড়ক—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশের প্রধান রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম সরণি। কলকাতা মেট্রোর গড়িয়া বাজার স্টেশনটির নতুন নাম কবি নজরুল মেট্রো স্টেশন—যা তাঁর জনপ্রিয়তা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশে নজরুলকে শুধু কবি নয়, জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। তাঁর রচিত বিখ্যাত রণসঙ্গীত “চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল” স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেরণাসঙ্গীত এবং সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক মার্চ–পাস্ট সুর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সংস্কৃতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবতা—সবকিছুর সমন্বিত প্রতীক হিসেবে নজরুল বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য ও অম্লান।

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই নজরুল তাঁর প্রতিভার জন্য পেয়েছেন বহু সম্মাননা। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে—এটি ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর অল্প আগে তাঁকে প্রদান করা হয় একুশে পদক, যা দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। একই বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের নাগরিকত্বও প্রদান করে, যা নজরুলের প্রতি জাতির ভালোবাসার উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

ভারতে নজরুলের প্রতিভার স্বীকৃতি আরও আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে, যা তাঁর দ্বিজাতীয় স্বীকৃতির শক্ত অবস্থানকে তুলে ধরে। বাংলা সংস্কৃতির মহান প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৯ সালে তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট প্রদান করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালেও তাঁকে আবারও সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো—নজরুলের এই গৌরবময় আন্তর্জাতিক এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিগুলি এমন এক কবিকে কেন্দ্র করে, যিনি জীবনের শেষ তিন দশক ছিলেন অসুস্থ, বাকরহিত, অথচ তাঁর সৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে অনন্তকাল ধরে গেয়ে চলেছে বিদ্রোহ, প্রেম, মানবতা ও স্বাধীনতার গান।

সংক্ষেপে বলা যায়, নজরুলের প্রতিভাকে সম্মানিত করা শুধু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক বা বিমানবন্দরের নামকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর প্রতিভা আজও বাঙালির সংস্কৃতি, ভাষা, চেতনা, সঙ্গীত এবং সাহিত্যকে নির্মাণ করছে নতুন করে—প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাঁর প্রাপ্ত সম্মাননাগুলি তাই ইতিহাসের পাতায় এক মহিমান্বিত কাব্যের মতো চিরস্থায়ী হয়ে আছে।

Leave a Comment