বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মহীরুহ কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) সাধারণত তাঁর কবিতার জন্য প্রসিদ্ধ হলেও তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই বহুমাত্রিক স্রষ্টা। তাঁর প্রতিভার বিস্তার বাংলা কবিতা, গান, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, চলচ্চিত্র, গ্রামোফোন–সংগীত এবং মঞ্চনাট্য—সবক্ষেত্রেই সমান পূর্ণতায় প্রকাশ পেয়েছে। নজরুল নিজেকে শুধু কবিতায় সীমিত রাখেননি; বরং নাট্যশিল্পের জগতে তিনি এনেছিলেন নতুন ধারা, নতুন রীতি ও নতুন প্রাণ। নাটকে তাঁর প্রতিভা কিছুটা আড়ালে থাকলেও তা বাংলা নাট্য–ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে সমাজচেতনা, মানবমুক্তি, নারী–পুরুষের সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও স্বাধিকার—এই বিষয়গুলো তাঁর নাটকের কেন্দ্রে ছিল।

নজরুলের নাটকের তালিকা । নজরুলের ভাবনা
নজরুলের নাট্যকারজীবনের সূচনা কিশোর বয়সেই, আসানসোলের লেটোদলের পালা–নাট্য রচনার মধ্য দিয়ে। লেটো গান ছিল লোকজ নাট্যধারার একটি বহর, যেখানে অভিনয়, সংলাপ, গান ও নৃত্য একই সূত্রে গাঁথা। এখানেই নজরুল নাট্যরচনার প্রথম অনুশীলন করেন—যার মধ্যে রয়েছে মেঘনাদবধ, শকুনিবধ, ঠগপুরের সঙ, দাতাকর্ণ, রাজপুত্র, আকবর বাদশা, কবি কালিদাস ইত্যাদি। কিশোর নজরুলের এসব পালা–রচনা পরবর্তীকালে তাঁর নাট্যচিন্তার ভিত্তিভূমি তৈরি করে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন বাংলা নাট্যজগৎ যাত্রা, প্রহসন ও আধুনিক নাট্যচর্চার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন নজরুল তাঁর গীতিনাট্য, গীতালেখ্য, নাটিকা ও রেকর্ড–নাটকের মাধ্যমে নাট্যশিল্পকে এক নতুন উদ্দেশ্য ও দিশা দেখান।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি প্রচুর নাট্যধর্মী রচনা করেন—যার অনেকগুলো বেতার, মঞ্চ কিংবা গ্রামোফোন কোম্পানির অনুরোধে রচিত। তাঁর অসুস্থ হওয়া (১৯৪২) পর্যন্ত এই সৃষ্টিপ্রবাহ অব্যাহত ছিল। যদিও পূর্ণাঙ্গ নাটকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, তবুও তাঁর গীতিনাট্য, রেকর্ড–নাটক, গীতিআলেখ্য ও নাটিকা শতাধিক। এই নাটকগুলোতে নজরুল সমকালীন সমাজকে নতুন চোখে দেখার আহ্বান জানান। তাঁর নাটক শুধু মনোরঞ্জনের জন্য নয়; বরং সমাজবদলের সক্রিয় হাতিয়ার হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

নজরুলের সব নাট্যরচনা একত্রে সঙ্কলিত হয়েছে ‘নজরুল নাট্যসমগ্র’–এ, যা তাঁর নাট্য–প্রতিভার একটি নির্ভরযোগ্য দলিল। নাটকগুলোতে তিনি তুলে ধরেছেন দেশপ্রেম, সাম্যবাদের বোধ, নারীর সামাজিক অবস্থান, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ধর্মের মানবিক দিক, প্রেম–দর্শন এবং সংস্কারবিরোধী চিন্তার ঝাঁঝালো উচ্চারণ। বিশেষত তাঁর নাটকে নারীচরিত্র শক্তিশালী, সংগ্রামী ও স্বাধীনচেতা—যা তৎকালীন বাংলা নাটকে খুব কম দেখা যায়। নজরুল দেখিয়েছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে শুধু পুরুষ নয়; নারীও সমানভাবে অংশগ্রহণ করলে জাতি শক্তিশালী হতে পারে।
নিচে তাঁর রচিত গুরুত্বপূর্ণ নাটকের তালিকা দেওয়া হলো—
১. আলেয়া – রহস্য, প্রেম ও মানবমনের দ্বন্দ্বে নির্মিত গীতিনাট্য
২. মধুমালা – রূপকথা–ধর্মী কাহিনি, যা প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৪৫ সালে
৩. বিদ্যাপতি – মৈথিল কবি বিদ্যাপতির জীবন ও সাহিত্যকীর্তি অবলম্বনে
৪. বিষ্ণুপ্রিয়া – চৈতন্যদেবের পত্নীর জীবনসংঘাত ও অধ্যাত্মচেতনার প্রতিফলন
৫. বিজয়া – বেতারে প্রচারিত গীতিনাট্য, দেশাত্মবোধের বার্তা বহন করে
৬. শ্রীমন্ত – সমাজের বৈষম্য ও জনজীবনের দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে
৭. মদিনা – ইসলামী ইতিহাসভিত্তিক নাটক, মানবতা ও ধর্মীয় সমতার ভাবনা প্রকাশ করে
৮. সুরথ উদ্ধার – পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে রচিত দার্শনিক গীতিনাট্য
৯. জাগো সুন্দর চির কিশোর – মানবমুক্তির পথে জাগরণের আহ্বান
১০. বাসন্তিকা – ঋতুবৈচিত্র্য, প্রেম ও শিল্প–ভাবনার সমন্বয়
১১. ভূতের ভয় – ব্যঙ্গ ও হাস্যরসে নির্মিত নাট্যরচনা
নজরুলের এসব নাটকে সমাজের দুঃস্থ, নির্যাতিত, বিস্মৃত মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। তিনি নাটকের মাধ্যমে স্বাধীনতাসংগ্রামের চেতনাকে জাগ্রত করেছেন, শোষিত–বঞ্চিত মানুষের মুক্তির পক্ষে সরব হয়েছেন, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের বিরুদ্ধে যুক্তি ও মানবতার আলো জ্বালিয়েছেন। তাঁর নাটক দেখিয়েছে—সমাজের উন্নতি, জাতির পুনর্জাগরণ এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব, যখন নারী–পুরুষ উভয়েই সমানভাবে সংগ্রামের পথে শামিল হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের নাট্যরচনা বাংলা নাট্যঐতিহ্যের এক মূল্যবান সম্পদ। তিনি নাটককে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে ব্যবহার করেছেন মানুষের হৃদয় ও সমাজের বিবেককে জাগিয়ে তোলার জন্য। তাঁর নাট্যজগৎ তাই প্রমাণ করে—নজরুল ছিলেন সত্যিকারের বিদ্রোহী শিল্পী, যিনি কলম, গান ও নাটকের মাধ্যমে মানবতার মুক্তির আবেদন জানিয়েছেন।
