কাজী নজরুলের জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব । নজরুলের ভাবনা

কাজী নজরুলের জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব : কাজী নজরুল ইসলামের জীবৎকালটি (১৮৯৯-১৯৭৬) উপমহাদেরশ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইতিহাসের সংজ্ঞাকে বিশ্লেষণ করলে নজরুলকে নক্ষত্রের সাথে তুলনা করা যায়। জীবনে যে লোকটি শুন্য দারিদ্র্য পরিবার থেকে এ পর্যায়ে এসেছে-ইতিহাসতো তারি জন্যে রচিত হবে এটাই স্বাভাবিক। সচেতন জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ইতিহাসের সাথে নজরুলের খুব গাঢ় সংযোজন ছিল।

 

কাজী নজরুলের জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

 

কাজী নজরুলের জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব । নজরুলের ভাবনা

বঙ্গ-ভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকে এক দশকের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা বুদ্ধিজীবির মানসভূমি থেকে বাস্তব ও প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নেমে এসেছিল। তারপর প্রথম মহাযুদ্ধের অবসান কাল থেকে সারা ভারতব্যাপী ক্রমাগত রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংগঠনের বিস্তার।

ইংরেজ সরকারের ক্রমবর্ধমান দমননীতি ও তার পৌণ পৌণিক প্রতিক্রিয়া, দেশবন্ধু মতিলাল গান্ধী, সূভাসচন্দ্র, জহরলাল প্রভৃতি নেতাদের কর্মকাণ্ড সমগ্র ভারতবাসীকে উদ্দীপিত করেছিল। ফলে ভারতের রাজনৈতিক আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন, অসহযোগ আন্দোলন থেকে ভারত ছাড়ো আন্দোলন পর্যন্ত ।

 

কাজী নজরুলের জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

 

বিভিন্ন ঘটনাবলির প্রভাবে সাম্রাজ্যবাদের ভীত কেঁপে ওঠে। প্রতিষেধক হিসেবে ভারতের সাম্প্রদায়িক বিভেদনীতিকে মদদ দেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা, মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধ, জাতীয়তাবোধের উজ্জীবন, জাতিভেদ নিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, জীবন হানি, দারিদ্র্যতা, ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিবৃত্ত এসবই নজরুল জীবনের পটভূমিকা। নজরুল যখন এ পৃথিবীতে আবির্ভূত হন তখন ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবকাঠামো চরম পর্যায়ে।

নজরুল বরাবরই পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। তাঁর অগ্নিশ্রাবী বানীর মধ্যে রয়েছে “বিদ্রোহের মতো বিদ্রোহ যদি করতে পর, প্রলয় যদি আনতে পর নিদ্রিতশীব জাগবেই মুক্তি ঘটবেই”। এরি মধ্যে কয়েকটি দেশে গনজাগরণ ঘটেছে। চীনে কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম।

জাপান শক্তিধর রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে, ব্রিটেনে ধর্মঘট নিষিদ্ধ হয়েছে, ইবন সৌদের নেতৃত্বে সৌদিআরব রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। প্যারিসে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পীরা সংঘবদ্ধ হয়েছেন, স্পেনে গণতন্ত্র বাঁচাতে ফ্যাসিশক্তির সঙ্গে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ব্রহ্মদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হযেছে। এ অবস্থায় সুভাসচন্দ্র ইংরেজ শাসকদের কবল থেকে অন্তর্ধান করেছেন।

 

কাজী নজরুলের জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

 

রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়ান ঘটেছে এবং নজরুল বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবনের ধারাবাহিকতা ১৯২০ হতে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক অবস্থানে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষকে অনেক কিছু দিয়ে গেছে। তিরিশের দশক থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতির তপ্তক্ষেত্রে থেকে সরে এলেও দেশবাসী রাজনীতির ক্ষেত্রে নজরুলেরই কবিতা ও গানকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করেছেন।

বিদ্রোহী ভাবাবেগকে প্রাধান্য দিয়ে নজরুলের গান ও কবিতা তৎকালীণ সময়ে ভারতীয় জনগণকে বিদ্রোহী সত্ত্বায় একটি বিন্দুতে একত্রিত করেছিলেন, যেমন তার মুক্তি আনন্দময়ীর আগমন, বিদ্রোহী প্রভৃতি কবিতা এবং গানের মধ্যে রয়েছে করার ঐ লৌহ কপাট, শিকলপরা ছল প্রভৃতি। উপরন্তু বিভক্তি রাষ্ট্রের খণ্ডিত একটি অংশে,বিভাগোত্তর পূর্ব পাকিস্তানে নতুন করে নজরুলের মূল্যায়নের উদ্যোগ ঘটেছে। যদিও তার নিরিখটি ছিল ধর্মীয় সংকীর্ণতা।

বাংলাদেশে ও ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নজরুলের রচনা যে হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হয়েছে তা প্রমাণিক। নজরুলের রচনার ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে সমগ্র ভারতবাসীকে একত্রিত করবে-এটাই হওয়া উচিত বটে। মানবিক মূল্যবোধের দৃষ্টিতে কাজী নজরুল ইসলামের রচনার গুরুত্ব অনেক।

 

google news logo

 

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রত্যক্ষ চেহারা যেমনই হউক, তা অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলন হউক বা সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত হত্যার রাজনীতি হোক বা গণতান্ত্রিক মানবাধিকার অর্জনের নৈতিক লড়াই হোক না কেন নজরুরের রচনা (কাব্য ও সঙ্গীত) এ সবের প্রেরণা হতে পেরেছে। পেরেছে মুক্তিকামী মানুষকে পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্ত করতে। কারণ সংগ্রামের মাধ্যমেই দেশমাতৃকায় মুক্তি ঘটবে বলে কবি দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন।

কাজী নজরুলের জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

তাইতো তিনি ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত হয়েছেন বারবার। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ জানাবার কারণে নজরুলকে কারাবাসও করতে হয়েছিল। সুন্দর একটি দেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বিশ্বদরবারে ভারতবর্ষকে স্বাধীন দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করাই নজরুলের বিদ্রোহীমূলক লেখার উপজীব্য বিষয়। অতএব, ভারতীয় উপমহাদেশের শতবর্ষের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথা একই মহাগ্রন্থে পাঠান্তর, একই বৃত্তের উপবৃত্তান্ত ।

Leave a Comment