বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক বিস্ময়কর সৃষ্টিশক্তির নাম। মাত্র ২৩ বছরের সক্রিয় সাহিত্যজীবনেও তিনি সৃষ্টি করেছেন বিপুল পরিমাণ কবিতা, গান, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য ও সঙ্গীতরচনা—যার গভীরতা, বৈচিত্র্য ও মানবিকতা তাঁকে বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর সাহিত্যধারায় রয়েছে সাম্যবাদী বিপ্লবচেতনা, ঔপনিবেশিক দাসত্বের বিরুদ্ধে উচ্চারণ, নারী–পুরুষের সমতার ঘোষণা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধতা এবং মানবমুক্তির অদম্য আহ্বান। বাঙালির মানসগঠনে নজরুলের প্রভাব এতটাই গভীর যে তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাঁর রচিত “চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল” বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গৃহীত, যা স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

নজরুলের চেয়ার কয়টি ও কি কি
নজরুলের সাহিত্য, সঙ্গীত ও চেতনা নিয়ে দেশে–বিদেশে গবেষণা ক্রমশ বিস্তার লাভ করায় তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কয়েকটি একাডেমিক গবেষণা–চেয়ার। এই চেয়ারগুলো মূলত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নজরুল–গবেষণার উন্নয়ন, পাঠ্যক্রমে তাঁর সাহিত্য অন্তর্ভুক্তি, গবেষকদের সহায়তা, সেমিনার–সিম্পোজিয়াম আয়োজন এবং নজরুলচর্চার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নজরুলের অসামান্য অবদানকে জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে চারটি নজরুল চেয়ার—যা তাঁর সৃষ্টিকে মূল্যায়ন, সংরক্ষণ ও গবেষণার মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

চারটি নজরুল চেয়ার হলো—
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল চেয়ার – বাংলাদেশে নজরুল–গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত। এখানে নজরুলের সাহিত্য, সঙ্গীত, জীবনদর্শন, অসাম্প্রদায়িকতা এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালিত হয়।
২. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল চেয়ার – সাহিত্যতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ, সংগীতবিদ্যা এবং আধুনিকতার প্রেক্ষিতে নজরুলকে নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রয়াসে সক্রিয়।
৩. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল চেয়ার – পূর্বাঞ্চলীয় সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক, রাগ–ভিত্তিক সঙ্গীত এবং নজরুলের প্রগতিশীলতার ব্যাখ্যা এখানে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
৪. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল চেয়ার – নজরুলের ভাষারীতি, কাব্যনন্দন, গান ও গীতিকাব্যের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
এই চারটি চেয়ার নজরুলকে কেন্দ্র করে একাডেমিক চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে এবং তাঁর সাহিত্যিক–সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করছে। ফলে নজরুল শুধু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নয়—বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের জ্ঞানচর্চায়ও একটি স্থায়ী আসন লাভ করেছেন।

নজরুলের প্রতি জাতীয় স্বীকৃতির অংশ হিসেবে তাঁকে দেওয়া হয়েছে বহু সম্মান। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট (১৯৭৪) প্রদান করে—যা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে দেয়া হয় দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক, যা তাঁর জাতীয় মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একজন কবি নন—তিনি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, স্বাধীনতার চেতনা ও মানবিক দর্শনের এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত চারটি নজরুল চেয়ার তাঁর সাহিত্য–সঙ্গীত–দর্শনের গভীরতা ও স্থায়ী মূল্যকে প্রমাণ করে, যা আগামী প্রজন্মকে নজরুল চেতনার আলোয় এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
