নজরুলের কাব্য ও গানে অলংকার । নজরুলের ভাবনা

নজরুলের কাব্য ও গানে অলংকারঃ আলঙ্কারিক বামন ছিলেন কাশ্মীরের রাজা জয়াপীড়ের একজন মন্ত্রী (রাজত্বকাল ৭৭৯ খ্রী: থেকে ৮১৩ খ্রী: পর্যন্ত)। তিনি তাঁর “কাব্যালঙ্কার সূত্রবৃত্তি” গ্রন্থটি রচনা করেন সম্ভবত। অষ্টম শতকের শেষ দিকে বা নবম শতকের প্রথম দিকে। অলঙ্কার প্রশ্নে তিনি বলেছেন “কাব্য ও সঙ্গীতের সৌন্দর্যই হল অলঙ্কার।”

 

নজরুলের কাব্য ও গানে অলংকার

 

নজরুলের কাব্য ও গানে অলংকার । নজরুলের ভাবনা

 

সাহিত্যের ক্ষেত্রে অলঙ্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন “সাহিত্য ও আপন চেষ্টাকে সফল করিবার জন্য অলঙ্কারের রূপকের ছন্দের, আভাসের, ইঙ্গিতের আশ্রয় গ্রহণ করে। দর্শন-বিজ্ঞানের মত নিরলংকার *ইলে তাহার চলে না” আধুনিক বাংলা কাব্যের ক্ষেত্রে মাইকেল মধুসুদনের আবির্ভাবে অলঙ্কারের দিক দিয়েও বাংলা কাব্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়। তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যে প্রায় সকল রকম অলংকারের সুন্দর দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়।

বাংলা সাহিত্যের আর কোন কাব্যেই আমরা মেঘনাদবধ কাব্যের মত বিভিন্ন রকমের অলঙ্কারের এমন সমাবেশ লক্ষ্য করি না।

“মধুসুদনের পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের কাব্যে ও গানে, তথা সমগ্র রবীন্দ্র সাহিত্যেই আমরা অজস্র অলঙ্কারের নিপুণ সমবেশ লক্ষ্য করি। অলঙ্কারের দিক দিয়েও তিনি বাংলা সাহিত্যকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন। অলঙ্কারের ক্ষেত্রে নজরুলও প্রশংসনীয় কৃতিত্বের পরিয় দিয়েছেন। তাঁর কাব্য ও গানে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি নিপুণভাবে অলঙ্কার প্রয়োগ করেছেন।

 

নজরুলের কাব্য ও গানে অলংকার

 

কাব্যে অলঙ্কারের প্রয়োগ সম্পর্কে কবিসচেতন থাকেন না। কাব্যসৃষ্টি কালে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অলঙ্কার এসে যায়। ভাষা, ছন্দ ও শব্দ যেমন স্বত:স্ফূতভাবে কবির লেখনী মুখে উপস্থিত হয়, অলংকারও তেমনিভাবে এসে থাকে। চেষ্টাকৃতভাবে অলংকার প্রয়োগ করতে গেলে তা সার্থক হয় না। নজরুলের কাব্য ও গানে অসংখ্য অলঙ্কার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা এই স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ্য করি ।

অলঙ্কার দুই জাতীয়- শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার। শব্দলঙ্কারের মধ্যে নজরুলের কাব্যে অনুপ্রাস অলঙ্কারই সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। অর্থালঙ্কারের মধ্যে তাঁর কাব্যে উপমা, রূপক ও সমাসোক্তি এই তিনটি অলঙ্কারের প্রয়োগ বেশি। আমার মনে হয় এই তিনটি অলঙ্কারের মধ্যে তাঁর কাব্যে সমাসোক্তি অলঙ্কারই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

 

নজরুলের কাব্য ও গানে অলংকার

 

শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের মধে পার্থক্য নির্দেশ করতে গিয়ে বলতে পারি যে শব্দলঙ্কারের ক্ষেত্রে অলঙ্কারজ্ঞাপক শব্দের পরিবর্তন করা হলে অলঙ্কার অক্ষুণ্ণ থাকে না, কিন্তু অর্থালঙ্কারের ক্ষেত্রে অলঙ্কারজ্ঞাপক শব্দের পরিবর্তন করা হলেও অলঙ্কার অক্ষুণ্ণ থাকে। দৃষ্টান্তের সাহায্যে একথার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছি। ‘গুলবাগিচার র একটা গানে নজরুল লিখেছেন-

“পাষাণের বুকে নদী বয়,
যে পাষাণ সে পাষাণ রয়। “

এখানে প্রথম ছত্রে ‘পাষাণ’ শব্দটি প্রস্তর অর্থে ও দ্বিতীয় ছত্রে ‘পাষাণ’ শব্দটি নিষ্ঠুর-হৃদয় মানুষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একই শব্দ দুইবার দুই অর্থে ব্যবহৃত হওয়ায় অলঙ্কার এখানে যমক। এখানকার প্রথম ছত্রের ‘পাষাণ’ শব্দটির পরিবর্তে ‘পাথর’ শব্দটি ব্যবহার করলে অর্থ ঠিক থাকলেও যমক অলঙ্কার অক্ষুণ্ণ থাকে না। এবার নজরুলের ‘সুরসাকী’র একটা গান থেকে দুটি ছত্র উদ্ধৃত করছি-

“গানগুলি মোর আহত পাখীর সম
লুটাইয়া পড়ে তব পায়ে প্রিয়তম।”

 

google news logo

 

এই অংশে গানগুলিকে তুলনার বিষয় করায় গানগুলি উপমেয় ও এর সঙ্গে আহত পাখীর তুলনা করায় আহত পাখী উপমান। লুটিয়ে পড়া সাধারণ ধর্ম ও সম তুলনাবাচক শব্দ। এই পুর্ণোপমা অলঙ্কারে উপমান “আহত পাখী’র পরিবর্তে “আহত বিহগ” ব্যবহার করা হলেও অলঙ্কার অক্ষুণ্ণ থাকে।

Leave a Comment