নজরুলের অসুস্থতা ও চিকিৎসা

নজরুলের অসুস্থতার জন্যে কি কি কারণ দায়ী, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে, “অনিয়ম, বিশ্রামহীনতা, অতিরিক্ত চা-জর্দা পান, অতিরিক্ত মস্তিষ্ক পরিচালনা, পুর-শোক, স্ত্রীর নিদারুণ ব্যাধির জন্য মানসিক বেদনা, প্রচুর অর্থব্যয় এবং চেষ্টা করেও নিষ্ফল হওয়া, শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ সংকট প্রভৃতি নজরুলের মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণ”-এ কথা নির্দ্বিধায়াই বলা যায়।

 

নজরুলের অসুস্থতা ও চিকিৎসা

 

নজরুলের অসুস্থতা ও চিকিৎসা

নজরুলের অসুস্থতার কারণ এবং এর স্বরূপ সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে কবির দীর্ঘদিনের চিকিৎসক ডা: ডি. কে. রায় (দ্বিজেন্দ্র কুমার রায়) এম, ডি, এম, আর, সি, পি, এক প্রবন্ধে লিখেছেন

“আমি দিনের পর দিন নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তেই এলাম যে, এই অসাধারণ করিব রোগও অসাধারণ। কবির বর্তমান বয়স ৭১ বৎসর। এই বয়সের অনুপাতে তাঁর সাধারণ স্বাস্থ্য বেশ ভাল। কিন্তু মানসিক অবস্থা একেবারেই ভাল নয়। তিনি মাঝে মাঝে মৃগী convulsion তে ভোগেন এবং মাঝে মাঝে। রক্তচাপও বেশ বৃদ্ধি পায়। মানসিক অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যও মাঝে মাঝে বেশ বেড়ে যায় ।…..তিনি চমৎকার হেঁটে বেড়ান এবং এ-ঘর থেকে ও-ঘরে ভালভাবে যাতায়াত করেন। কবির ব্রেনে কোন Germ নেই। আমি কবিকে বহুবার নানাভাবে পরীক্ষা করে দেখেছি, কবির দেহে বা রক্তে এই বিশেষ রোগের কোন লক্ষন নেই।

 

নজরুলের অসুস্থতা ও চিকিৎসা

 

তবে কবি কি রোগে ভুগছেন এই প্রশ্ন জনসাধারনের মনে স্বাভবতই জাগে । তিনি যে রোগে ভুগছেন সেই রোগের নাম (প্রিসেনাইল ডিমেনসিয়া)। এই রোগে কবির ব্রেনের সামনের অংশ নষ্ট হয়েছে। দু’তিনটি রোগের মিশ্রণে রোগটির উৎপত্তি। তবে এই রোগের কারণ Medical Science -এ আজও বের হয়নি।”

[দুরারোগ্য প্রত্যাশা, ডা: ডি-কে রায়, কথাসাহিত্য, কলকাতা, ১৩৭৭]

উল্লেখ্য, কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ ডি-কে রায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও কবি-পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ১৯৭২ সালে কবিকে যখন কলকাতা থেকে বাংলাদেশে আনা হয়, তখনও ডা: ডি কে রায়, পশ্চিম বঙ্গ সরকারের তরফ থেকে কবির ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসাবে তাঁর নাঙ্গ ঢাকা আসেন এবং ধানমন্ডীর ‘কবিভবনে’ বেশ কয়েকমাস সপরিবারের অবস্থান করেন। উল্লেখ্য, ডা: রায়ের স্ত্রী উর্মিলা রায়ও একজন বিশিষ্ট্য চিকিৎসাবিদ।

১৩৮৩ সালের ৮ই আশ্বিন (২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭৬) সংখ্যা দৈনিক ‘আনন্দ বাজার পত্রিকায়’ পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক নিয়োজিত কবি নজরুলের সরকারী চিকিৎসক উক্ত ডা: দ্বিজেন্দ্র কুমার রায় (ডা: ডি, কে, রায়) ‘সম্পাদক সমীপেষু’ বিভাগে লেখেন । “তবে কী রোগে কবি ভুগছেন এই প্রশ্ন জনসাধারনের মনে স্বভাবতই জাগে।

 

নজরুলের অসুস্থতা ও চিকিৎসা

 

তিনি যেরোগে ভুগছেন, সেই রোগটির নাম প্রি-সেনাইল ডিমেনসিয়া। প্রিসেনাই কথার অর্থ বার্ধক্য। পৌঢ় অবস্থায় এই বিশেষ রোগটির সূত্রপাত হয় বলে এটিকে প্রি-সেনাইল ডিজইস বলা হয়।

“এই রোগে ব্রেনের সামনের অংশটা আস্তে আস্তে শুকিয়ে যায় এবং রোগীর স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি এবং চিন্তা-শক্তি ক্রমশঃ লোপ পেতে থাকে। এ রোগের উৎপত্তির কারণ আজ পর্যন্ত অজ্ঞাত। আমি দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে গবেষণা করেছি। দু’জন বিখ্যাত চিকিৎসক প্রথমে এই রোগের লক্ষণগুলি প্রকাশ করেন তাঁদের নাম।

 

google news logo

 

ডা: পিডস্ এবং ডা: অ্যালজেমার। পিডস্ ডিজউস এবং অ্যালজেমা ডিজইস্-এর মধ্যে পার্থক্য করতে গেলে ব্রেনে বায়োপসির দরকার। সেটাই কবির ক্ষেত্রে কখনো সম্ভব হয়নি। কেবলমাত্র ব্রেইন টিউমার আছে কিনা দেখবার জন্য লন্ডন হাসপাতালে ডেনটিক্যুলোগ্রাম করা হয়। এয়ার এনসেদ্যালোগ্রাফি করে দেখা হয়েছিল যে, কবির মস্তিষ্কের পুরোভাগ বা ফ্রন্টাল লোব দুটি সংকুচিত হয়ে গেছে। কোন টিউমার ব্রেনে ছিল না। তবে শ্যামসিকস অপারেশনের বিরুদ্ধে সে সময়ে অনেকেই রায় দেন, আমিও দিয়েছিলাম। তাঁর মস্তিষ্কে শেষ পর্যন্ত এই অপারেশন করা হয়নি।”

নজরুলের অসুস্থতা ও চিকিৎসা

১৯৫২-৫৩ সালে লন্ডন ও ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসাবিদদের নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসার পরও কাজী নজরুল ইসলাম আরোগ্য লাভ করেননি।

Leave a Comment