কাজী নজরুল ইসলামের দেশাত্মবোধক বাংলা গানের সাঙ্গীতিক অবস্থান : বাংলা গানের বিবর্তনের ইতিহাসে পঞ্চ-গীতি কবির গানের অবস্থান ব্যাখ্যা করলে দেখা যায় তারা সবাই দেশাত্মবোধক গান রচনায় ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে গেছেন। বিশেষ করে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম তাদের মধ্যে অন্যতম।

কাজী নজরুল ইসলামের দেশাত্মবোধক বাংলা গানের সাঙ্গীতিক অবস্থান । নজরুলের ভাবনা
পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য নজরুল তার কাব্য এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে সংগ্রামের বাণী প্রচার করে গেছেন। তারই একটি সার্থক রচনা নজরুলের দেশাত্মবোধক গান। আমরা কাজী নজরুলে ইসলামের দেশাত্মবোধক গান পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ করলে সাঙ্গীতিক রূপ উপস্থাপন করার প্রয়াস পাব ।
দেশাত্মবোধক গানের সংজ্ঞা :
দেশের প্রতি ভালোবাসা, মমত্ববোধ, সৌন্দর্য এবং প্রকৃতিগত বর্ণনায় রচিত গীতি বা গানকেই বলা হয় দেশের গান বা দেশাত্মবোধক গান ।
মন্তব্য :
দেশাত্মবোধক চেতনায় কাজী নজরুল ইসলামের গান সম্পর্কে অনেক সঙ্গীতগুণী অনেক মন্তব্য করেছেন। তাদের মধ্যে গৌরী শংকর মিত্র তাঁর “বাংলা গানের বিবর্তন এবং কাজী নজরুল” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-
“দেশ মাতৃকার মুক্তি তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সর্বক্ষেত্রেই বিশাল জনমানুষের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল নজরুলের দেশাত্মবোধক গান এবং বিদ্রোহী সত্ত্বাকে প্রাধান্য দিয়ে উদ্দীপনামূলক গান।” (বাংলা গানের বিবর্তন এবং কাজী নজরুল)
আবার, নারায়ণ চৌধুরী তাঁর “নজরুল এবং দেশাত্মবোধক” গ্রন্থে বলেছেন- “দেশাত্মবোধক গান মৌলিক চেতনার অনুসারী। কিন্তু প্রকৃতি এবং সৌন্দর্য বর্ণনায় তা অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিকামী মানুষের কথা বলে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কাজী নজরুল।” (নজরুল এবং দেশাত্মবোধক)

ঈশ্বর চন্দ্রগুপ্ত ও দেশাত্মবোধক গান (১৮১২-১৮৫৯) :
ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তকে প্রথম দেশাত্মবোধক গানের প্রবর্তক হিসেবে ধরে নেয়া হয়। বাংলা গানের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় বাণীবদ্ধ সুরের বিবরণ ঘটান। উৎপত্তির পর থেকে দেশাত্মবোধক গান ক্রমান্বয়ে কতগুলো ধাপ অতিক্রম করে আজকের এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলা গান বিবর্তনের সূত্রানুসারে নজরুলের দেশাত্মবোধক গান বৈচিত্র্যমুখী বৈশিষ্ট্যের দাবিদার।
রাম নিধি গুপ্তের দেশাত্মবোধ চেতনা (১৭৪১-১৮৩১) :
রাম নিধি গুপ্ত অর্থাৎ নিধুবাবু বাংলা টপ্পা গানের ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করলেও দেশাত্মবোধক চেতনায় তার অবদান অস্বীকার করার মতো নয়। তাঁর দেশাত্মবোধক গান রচনার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে এক স্বাধীন চেতনাবোধ জাগ্রত হয়ে ওঠে। যেমন : “নানান দেশের নানান ভাষা” তাল : ত্রিতাল, রাগ : খাম্বাজ
রাজা রামমোহন রায় এবং বাংলা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত (১৭৭২-১৮৩৩) :
রাজা রামমোহন রায় ব্রহ্মসঙ্গীত তথা দেশাত্মবোধক গান রচনার একজন ধারক ও বাহক ছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা সংস্কৃতিতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারায় তিনি দেশাত্ববোধক গান রচনার এক শুভ সূচনা করেছিলেন এবং তার সার্থকতাও পেয়েছিলেন। যেমন—“ কি বিদেশে কি স্বদেশ……” তাল : আড়াঠেকা, রাগ : রাগ্রেশী।
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত দেশাত্মবোধক গানের বিষয়বস্তু :
সব ধরনের দেশের গান বা দেশাত্মবোধক গানের বিষয়বস্তু প্রায় একই রকমের। তবে নজরুল রচিত দেশাত্মবোধক গানে দেশীয় সংস্কৃতি, দেশের বাহ্যিক রূপ, প্রকৃতি বিষয়ক বর্ণনা, দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা, দেশের মর্যাদা রক্ষায় উদ্দীপনামূলক কথা ইত্যাদি বিষয় স্থান পেয়েছে। উপমা-উপসর্গ বিষয়ক শব্দও নজরুল তাঁর দেশাত্মবোধক গানে ব্যবহার করেছেন। যাতে করে বৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যে তাঁর রচিত দেশাত্মবোধক গান পরিপূর্ণ হয়।

কাজী নজরুলের দেশাত্মবোধক গানের প্রেক্ষাপট :
পরাধীন ভারতে জন্মগ্রহণ করার পর থেকে সৃষ্টির লক্ষ্যে মুক্তিকামী মানুষের জন্য নজরুলের কিছু লিখবার বা করবার প্রেরণা তাকে তাড়া করছিল। ব্রিটিশ শাসিত সমাজের পরিপক্কতা অর্জনে সক্ষম ব্যক্তিকে সব সময়ই রাজরোষে পরতে হতো। সেই ভয়কে উপক্ষো করে নজরুল অসুন্দরকে পরিহার করে সুন্দর ও সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। যাতে রূপ দিয়েছে তাঁর রচিত দেশাত্মবোধক গান যে প্রেক্ষাপটে তিনি দেশাত্মবোধক গান রচনা করেছেন তার মধ্যে ছিল পানবিক রূপরেখা, ভারত বর্ষেরসৌন্দর্য্য, চেতনা এবং ব্রিটিশ বিরোধী
কাজী নজরুল রচিত দেশাত্মবোধক গানের ভাবার্থ :
নজরুল রচিত দেশাত্মবোধক গানের ভাবার্থ আবহমান সৌন্দর্যলীলায় পরিপূর্ণ। যেমন—আমরা যদি “একি পরূপ রূপে মা তোমায়……” গানটির ভাবার্থ বিশ্লেষণ A করি তা হলে দেখা যাবে তিনি এপার-ওপার বাংলার প্রচলিত ছয়টি ঋতুরই প্রকৃতিগত অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে স্থান পেয়েছে মায়ের কথা, পল্লী গাঁয়ের কথা, ভাটিয়ালীর কথা, কীর্তনের কথা, ঋতুভিত্তিক ফলমূলের কথা, পৃথিবীর কথা ইত্যাদি। আবার কখনো কখনো দেখা গিয়েছে দেশাত্মবোধক গানের বাণীর সাথে উদ্দীপনা কিছুটা সম্পৃক্ত। সব কিছু মিলে নজরুলের দেশাত্মবোধক গানের ভাব দেশ মাতৃকার স্বার্থক গুণাবলির অধিকারী।
শব্দ সমন্বয় :
নজরুলের দেশাত্মবোধক গানের শব্দের গাঁথুনি মহত্বপূর্ণ। গানের পর্যায় সঠিক রাখতে তাঁর দেশাত্মবোধক গানের শব্দ বিভিন্নভাবে বাস্তবমুখী। শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে তিনি দেশের মৌলিক ধারাকে সংগৃহীত করেছেন। বাংলা মায়ের রূপ বর্ণনায়, প্রকৃতিগত অবস্থানের সৌন্দর্য বর্ণনায় তিনি নান্দনিকতার ছোঁয়া এনে দিয়েছেন তাঁর দেশাত্মবোধক গানের শব্দ সংযোজনে।

অবয়ব প্রসঙ্গ :
দেশাত্মবোধক গান যেহেতু একটি লঘু সঙ্গীতের অংশ সে কারণে নজরুলের দেশাত্মবোধক গানের অবয়ব লঘু সঙ্গীতের মতো প্রথমে স্থায়ী, তারপর অন্তরা, তারপর সঞ্চারী এবং সবশেষে আভোগ এই চারটি বিভাগই তার গানে রূপায়িত ।
রাগ-রাগিনীর ব্যবহার :
দেশাত্মবোধক গানের রচনা এবং সুর সৃষ্টিতে নজরুল রাগের তেমন প্রাধান্য দেননি ৷ শুধু সুরের বৈচিত্র্যতার জন্য বিভিন্ন অবস্থানের সুর সংগ্রহ করে তাঁর গানকে নান্দনিক রূপ দিতে সমর্থ হয়েছেন।
তালের ব্যবহার :
নজরুলের দেশাত্মবোধক গানে তাল হিসেবে দাদ্রা, কাহারবা ও তেওড়া তালের প্রচলনই সর্বাধিক । বাণীবিন্যাস এবং সুর সংযোজন সম্পন্ন করার স্বার্থে অনেক ক্ষেত্রে তিনি তালের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন ।
নজরুলের দেশাত্মবোধক গানের পর্যায়ভিত্তিক আলোচনা :
ক) দেশ বন্দনামূলক রচনা :
প্রকৃতিগত অবস্থান, আমাদের সংস্কৃতি, দেশের সৌন্দর্য দেশের মাহাত্ম ইত্যাদি মূলত নজরুলের দেশাত্মবোধক গানের, বিশেষত দেশ বন্দানামূলক রচনার বাহ্যিক প্রকাশ। এই গানগুলোতে দেশকে কখনো মায়ের সাথে তুলনা আবার কখনো বা ছয়টি ঋতুর বর্ণনা দিয়ে দেশের মাহাত্মকে সমুজ্জ্বল করেছেন। যেমন— “শ্যামলা বরণ বাংলা মায়ের রূপ দেখে যা আয়রে আয়” তাল : দ্রুত দাদ্রা, রেকর্ড নম্বর ৭০২৩
খ) পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামমূলক গান :
কাজী নজরুল ইসলাম যখন পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন তখন ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনের পদতলে দলিত। তাই, পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষা ও তাকে বাস্তব রূপ দেয়ার ইচ্ছা নজরুলের মধ্যে সার্বক্ষণিক দণ্ডায়মান ছিল। যার ফলশ্রুতিতে নজরুলের প্রতিভার স্বাক্ষর স্বরূপ রচিত হয়েছে অনেক কাব্য এবং অনেক সঙ্গীত। সেই রচনার মাধ্যেমে উদ্দীপনা পেয়ে জাতি মুক্ত করেছিল মাতৃভূমি, পেয়েছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। সংগ্রামী সেই গান ছিল নিম্নরূপ- “কারার ওই লৌহ কপাট …….” তাল : দ্রুত দাদ্রা, রেকর্ড নম্বর ৭৫০৬

গ) শোসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মূলক গান :
ব্রিটিশ শাসনের বিলম্বিত রূপ থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ মুক্তি পেলেও এক শ্রেণীর জনগোষ্ঠী কোনো-না-কোনোভাবে দেশের জাগ্রত মানুষকে শোষণ করত। যার অবসান এখনও ঘটেনি। তারই বিরুদ্ধে নজরুলের সোচ্চার প্রতিবাদ। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের জন্য তিনি অনেক দেশাত্মবোধক চেতনা ও উদ্দীপনামূলক গান রচনা করেছেন। যেমন-
“জাগো অনশন বন্দী উঠো রে জাগো……” তাল : কাহারবা,
ঘ) নারী জাগরণ মূলক গান :
১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হলেও এদশের নারীরা তখন থেকেই অবহেলিত। জীবন ধারার সার্বিক প্রেক্ষাপটে তারা ছিল অনেক ক্ষেত্রে নিন্দনীয়। সব কিছুর বাঁধন ছিন্ন করে নারী জাগরণের ক্ষেত্রে ভূমিকা কাজী নজরুল ইসলাম পালন করেছিলেন অগ্রণী ভূমিকা। তাইতো তাঁর লেখনীতে এবং সুরে ঝংকার উঠেছিল- “জাগো নারী জাগো বহ্নি শিখা….” তাল : কাহরবা
ঙ) মুসলিম জাতির জাগরণী গান :
নারী-পুরুষের সমন্বয় সঠিক রেখে কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম জাতীয় জাগরণের ক্ষেত্রে অগ্নি-শ্রাবনী বাণী তাঁর গানে লিপিবদ্ধ করেন : সাম্য এবং মৈত্রী এ দু’টিই জীবনের মুক্তির একমাত্র পাথেয় হিসেবে তিনি তাঁর গানে বর্ণনা করেন। নারীকে মুক্তি দিয়ে তিনি নরসম অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মানুষের গড়া প্রাচীর ভেদ করে নজরুল মহাবিশ্বে মুসলিম জাতির জাগরণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাইতো তাঁর লিখনীতে এসেছে- “ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি” তাল : দ্রুত দাদ্রা
চ) দেশাত্মবোধক ব্যাঙ্গগীতি :
নজরুল দেশ মুক্তির নামে দল গঠন করে, প্রতিরোধ সৃষ্টি করে, যারা ভারতবর্ষকে বিকৃত করতে চেয়েছিল তাদের অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে দেশাত্মবোধক ব্যাঙ্গগীতি রচনা করেছিলেন। যেমন- “লীগ অব নেশন…….”:
ছ) সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চেতনায় নজরুলের দেশাত্মবোধক গান :
ব্রিটিশ শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছিল বটে কিন্তু এর সাথে রোপন করে গিয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার বীজ। যাকে উৎপাটনের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম সংগ্রাম করে গেছেন বিভিন্নভাবে। উদাত্ত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন-
“জানিস নাকি বিশ্বপিতা ভগবানের কোন সে জাত
কোন ছেলে তার লাগলে ছোঁয়া
অসূচি হোন জগন্নাথ
নারায়ণের জাত যদি নাই
তোদের কেন জাতের বালাই?”
এই লেখার মধ্য দিয়েই প্রতীয়মান হয় যে, নজরুল সার্বিকভাবেই একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ছিলেন।
উপসংহার :
উল্লেখিত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, নজরুলের দেশাত্মবোধক গান রচনা ভারতবর্ষকে দিয়েছে মুক্তি এবং বাংলা গানের ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধশালী ।

